Table of Contents
হাইলাইটস:
- ২১ দিনের অনশনের পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় সোনম ওয়াংচুককে
- ভগত সিং, গান্ধী, পট্টি শ্রীরামুলু থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—অনশন বহুবার বদলেছে ভারতের রাজনীতির গতিপথ
- কারও অনশন এনেছে ঐতিহাসিক চুক্তি, কারও আত্মবলিদানে তৈরি হয়েছে নতুন রাজ্য
- আন্না হাজারের আন্দোলন থেকে জন্ম নিয়েছে আম আদমি পার্টি, বদলেছে জাতীয় রাজনীতির সমীকরণ
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের প্রতিবাদ-রাজনীতিতে অনশন একটি সুপ্রাচীন এবং শক্তিশালী অহিংস অস্ত্র। সেই ঐতিহ্যের সাম্প্রতিকতম অধ্যায় লিখছেন পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। দিল্লির যন্তর-মন্তরে ২১ দিনের অনশনের পর শনিবার পুলিশ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ৫৯ বছর বয়সি ওয়াংচুক ২৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের অনশনে বসেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার, নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এর আগেও ২০২৪ সালে লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনার দাবিতে তিনি ২১ দিনের অনশন করেছিলেন। এবারও তিনি জানিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেই অনশন চালিয়ে যাবেন।
ওয়াংচুকের এই আন্দোলন ভারতের সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ, যেখানে অনশন শুধু ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ নয়, বরং রাজনৈতিক ও নৈতিক চাপ তৈরির এক কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ভগত সিং ও যতীন দাসের ঐতিহাসিক অনশন
১৯২৯ সালের জুনে লাহোর জেলে ভগত সিং, যতীন দাস, রাজগুরু ও সুখদেব অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। তাঁদের দাবি ছিল রাজনৈতিক বন্দির মর্যাদা, মানবিক কারাব্যবস্থা এবং সংবাদপত্র ও বই পড়ার অধিকার।
অনশনের ৬৪তম দিনে যতীন দাসের মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ যখন ট্রেনে লাহোর থেকে কলকাতায় আনা হয়, তখন প্রতিটি স্টেশনে জনতার ঢল নামে। ইতিহাসবিদ বিপন চন্দ্রের মতে, কলকাতায় শেষযাত্রায় প্রায় ছয় লক্ষ মানুষ অংশ নেন।
সহযোদ্ধার মৃত্যুর পরও ভগত সিং অনশন চালিয়ে যান। টানা ১১৬ দিন পর ব্রিটিশ সরকার কারাগারের পরিবেশ উন্নত করতে বাধ্য হয়।
পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর বিরুদ্ধে গান্ধীর অনশন
১৯৩২ সালে ব্রিটিশ সরকারের ‘কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড’-এ তফসিলি জাতির জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর প্রস্তাব দেওয়া হয়। ড. বি. আর. আম্বেদকর এই ব্যবস্থার পক্ষে থাকলেও মহাত্মা গান্ধী এর বিরোধিতা করেন।
ইয়েরওয়াড়া জেলে বন্দি অবস্থায় ২০ সেপ্টেম্বর তিনি অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। তাঁর মতে, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী হিন্দু সমাজকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত করবে। এর পরিবর্তে অস্পৃশ্যতার অবসানই হওয়া উচিত।
গান্ধীর অনশন দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। মাত্র ছয় দিনের মধ্যে ‘পুনা চুক্তি’ হয়। পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর পরিবর্তে যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী বজায় রেখে তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা বাড়ানো হয়। আজও সেই ব্যবস্থাই কার্যকর।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে গান্ধীর অনশন
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতার বেলেঘাটায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে গান্ধী ২ সেপ্টেম্বর অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন।
এই অনশনের প্রভাব ছিল বিস্ময়কর। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁর সামনে অস্ত্র সমর্পণ করতে শুরু করেন। মাত্র তিন দিনের মধ্যেই দাঙ্গা থেমে যায়। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন মন্তব্য করেছিলেন, “পাঞ্জাবে ৫০ হাজার সেনা যা পারেনি, এক নিরস্ত্র মানুষ তা করে দেখিয়েছেন।”
পট্টি শ্রীরামুলুর আত্মবলিদান ও অন্ধ্র প্রদেশের জন্ম
তেলুগুভাষী মানুষের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবিতে ১৯৫২ সালের ১৯ অক্টোবর অনশনে বসেন গান্ধীবাদী নেতা পট্টি শ্রীরামুলু।
প্রায় ৫৮ দিনের অনশনের পর ১৫ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর অন্ধ্র জুড়ে তীব্র আন্দোলন ও হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র দু’দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পৃথক অন্ধ্র রাজ্য গঠনের ঘোষণা দেন। শ্রীরামুলুর আত্মবলিদান পরবর্তীকালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের পথও প্রশস্ত করে।
ইরম শর্মিলার ১৬ বছরের অনশন
২০০০ সালের নভেম্বরে মণিপুরের মালোম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন (AFSPA) প্রত্যাহারের দাবিতে অনশন শুরু করেন ইরম শর্মিলা।
তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে আটক রেখে নাকের নল দিয়ে জোর করে খাবার দেওয়া হয়। প্রায় ১৬ বছর বা ৫০০ সপ্তাহ ধরে চলা এই অনশন বিশ্বের দীর্ঘতম অনশনগুলির অন্যতম হিসেবে পরিচিত।
পরে তিনি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে লড়লেও মাত্র ৯০টি ভোট পান।
সিঙ্গুর আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের ন্যানো কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে অনশন শুরু করেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
টানা ২৫ দিনের অনশনে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালামের অনুরোধে তিনি অনশন ভাঙেন।
সিঙ্গুর ও পরবর্তী নন্দীগ্রাম আন্দোলনই ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসানের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
আন্না হাজারের অনশন ও নতুন রাজনৈতিক যুগ
২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল আইনের দাবিতে তিন দফা অনশন করেন আন্না হাজারে।
প্রথম অনশন মাত্র তিন দিনের মধ্যেই তৎকালীন ইউপিএ সরকারকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করে।
রামলীলা ময়দানে দ্বিতীয় অনশন সারা দেশে গণআন্দোলনের রূপ নেয়। সংসদ জন লোকপাল বিল নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়।
তৃতীয় অনশনের পর ২০১৩ সালে লোকপাল ও লোকায়ুক্ত আইন পাস হয়।
এই আন্দোলনের মধ্যেই অরবিন্দ কেজরিওয়াল নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন এবং পরে আম আদমি পার্টি গঠন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্না আন্দোলনই কংগ্রেসের দীর্ঘ রাজনৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা ঘটায়।
গঙ্গা বাঁচাতে প্রাণ বিসর্জন
গঙ্গা দূষণ ও অবৈধ খননের বিরুদ্ধে দুই সন্ন্যাসীর অনশনও ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতী ২০১১ সালে ১১৫ দিনের অনশনের পর মারা যান।
এরপর প্রাক্তন আইআইটি কানপুরের অধ্যাপক জি. ডি. আগরওয়াল, যিনি পরে স্বামী জ্ঞান স্বরূপ সনন্দ নামে পরিচিত হন, গঙ্গা রক্ষার দাবিতে ১১১ দিন অনশন করে ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
অনশন: ভারতের রাজনৈতিক বিবেকের এক অনন্য ভাষা
ভারতের ইতিহাসে অনশন কখনও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কখনও সামাজিক সংস্কারের হাতিয়ার, কখনও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন, আবার কখনও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গঠনের মাধ্যম হয়েছে।
সোনম ওয়াংচুকের বর্তমান অনশন সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই নতুন অধ্যায়। তাঁর আন্দোলনের পরিণতি এখনও অনিশ্চিত হলেও ইতিহাস বলছে, ভারতে বহুবার অনশন শুধু সরকারের ওপর নৈতিক চাপই সৃষ্টি করেনি, বরং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনেরও পথ খুলে দিয়েছে।