হাইলাইটস

  • স্বাধীনতার পর থেকে মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে কখনও পৌঁছয়নি।
  • লোকসভায় নির্বাচিত ৯,৫৩৩ জন সাংসদের মধ্যে মাত্র ৫৩৯ জন মুসলিম; অর্থাৎ ৫.৭%।
  • মুসলিম বিধায়কদের ৫৭% এসেছেন পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর ও কেরল থেকে।
  • একসময় কংগ্রেস ছিল মুসলিম প্রতিনিধিত্বের প্রধান বাহক, পরে আঞ্চলিক দলগুলি সেই জায়গা নেয়।
  • বিজেপির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা ও নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের ধারা বদলেছে।
  • মুসলিম ভোট ক্রমশ কংগ্রেস ও শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলির দিকে একত্রিত হচ্ছে।

মুসলিম প্রতিনিধিত্বের দীর্ঘ ইতিহাস

ভারতের জনসংখ্যায় মুসলিমদের অংশ ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী ১৪.২ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ। কিন্তু এই জনসংখ্যাগত উপস্থিতি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে প্রতিফলিত হয়নি। হিন্দুস্তান টাইমসের ‘নাম্বার থিওরি’ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৫২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নির্বাচিত লোকসভা সাংসদদের মধ্যে মুসলিমদের অংশ মাত্র ৫.৭ শতাংশ এবং বিধায়কদের ক্ষেত্রে ৬.৭ শতাংশ।

অর্থাৎ স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে মুসলিমরা ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিকভাবে কম প্রতিনিধিত্ব পেয়েছেন।

কংগ্রেসের যুগ: প্রতিনিধিত্বের প্রধান বাহন

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিম প্রতিনিধিদের বড় অংশই নির্বাচিত হতেন Indian National Congress-এর টিকিটে। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় আধিপত্যের যুগে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক ও মুসলিম প্রার্থী—দুই-ই দলের রাজনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। গবেষকরা মনে করেন, দেশভাগের অভিঘাত সত্ত্বেও কংগ্রেস মুসলিমদের রাজনৈতিক মূলধারায় রাখার চেষ্টা করেছিল।

তবে সেই প্রতিনিধিত্বও জনসংখ্যার অনুপাতে ছিল না। বহু নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি মুসলিম প্রার্থী দিতে অনীহা দেখিয়েছে, কারণ তারা আশঙ্কা করত যে অন্য ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

আঞ্চলিক দলের উত্থান

আশির দশকের শেষ থেকে কংগ্রেসের প্রভাব কমতে শুরু করলে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের নতুন কেন্দ্র হয়ে ওঠে আঞ্চলিক দলগুলি।

উত্তরপ্রদেশে Samajwadi Party, বিহারে Rashtriya Janata Dal, পশ্চিমবঙ্গে All India Trinamool Congress, কেরলে Indian Union Muslim League—এই দলগুলি মুসলিম প্রার্থী মনোনয়নে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী ছিল।

ফলে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের মানচিত্রও বদলে যায়। বর্তমানে লোকসভার সমস্ত মুসলিম সাংসদের ৫২ শতাংশ এসেছেন মাত্র তিনটি রাজ্য—উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার থেকে।

বিজেপির উত্থান ও নতুন বাস্তবতা

২০১৪ সালের নির্বাচনে Bharatiya Janata Party একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পর মুসলিম প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নতুনভাবে আলোচনায় আসে। ২০১৪ সালে লোকসভায় মুসলিম সাংসদের অংশ নেমে যায় সর্বনিম্ন ৪.২ শতাংশে।

বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই খুব সীমিত সংখ্যক মুসলিম প্রার্থী দেয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটি একজন মুসলিম প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমর্থকদের যুক্তি, বিজেপি ধর্মের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করে না; সমালোচকদের বক্তব্য, এর ফলে দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব আরও কমে যাচ্ছে।

মুসলিম দলগুলির সীমাবদ্ধতা

ভারতে মুসলিম স্বার্থকে কেন্দ্র করে কয়েকটি রাজনৈতিক দল সক্রিয় রয়েছে। যেমন All India Majlis-e-Ittehadul Muslimeen (AIMIM), All India United Democratic Front (AIUDF) এবং Indian Union Muslim League (IUML)।

কিন্তু এদের প্রভাব সাধারণত আঞ্চলিক। কেরলে IUML তুলনামূলকভাবে সফল হলেও AIMIM বা AIUDF জাতীয় স্তরে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অনেক মুসলিম ভোটার মনে করছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে হলে বৃহত্তর বিরোধী দল বা শক্তিশালী আঞ্চলিক দলের পক্ষে ভোট দেওয়া বেশি বাস্তবসম্মত।

সংখ্যার আড়ালের রাজনীতি

মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কম হওয়ার পেছনে শুধু রাজনৈতিক দলগুলির মনোনয়ন নীতি দায়ী নয়। গবেষকরা আরও কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন।

প্রথমত, মুসলিমরা দেশের অধিকাংশ আসনে সংখ্যালঘু। মাত্র অল্প কয়েকটি লোকসভা কেন্দ্রে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে শুধুমাত্র মুসলিম ভোটের জোরে জেতা সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, ভারতের সংবিধানে তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতির জন্য সংরক্ষিত আসন থাকলেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য কোনও রাজনৈতিক সংরক্ষণ নেই।

তৃতীয়ত, ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়লে রাজনৈতিক দলগুলি অনেক সময় মুসলিম প্রার্থী দিতে আরও সতর্ক হয়ে ওঠে।

নতুন প্রবণতা: ভোটের মেরুকরণ

সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম ভোট ক্রমশ কংগ্রেস ও বিজেপিবিরোধী শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলির দিকে একত্রিত হচ্ছে। অন্যদিকে হিন্দু ভোটের বড় অংশ বিজেপির দিকে সংহত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে এক নতুন ধরনের ধর্মভিত্তিক মেরুকরণের ইঙ্গিত।

ফলে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এখন কেবল সংখ্যালঘু রাজনীতির প্রশ্ন নয়; এটি ভারতের গণতন্ত্রে প্রতিনিধিত্ব, অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

সংখ্যার ভাষায় বলা যায়, ভারতের মুসলিমরা ভোটার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এখনও স্পষ্টভাবে কম প্রতিনিধিত্বশীল। আর এই ব্যবধানই আগামী দিনের রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়গুলির একটি হয়ে থাকতে পারে।