হাইলাইটস:

  • শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য ৪০,০০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্যাকেজ।
  • এক লক্ষ নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ঘোষণা।
  • নতুন শিল্পনীতি আনার ঘোষণা, যেখানে থাকবে সিঙ্গল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা।
  • শিল্পের জন্য জমি সংগ্রহ ও বরাদ্দ প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ।
  • বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ।
  • কল্যাণী এলাকায় দ্বিতীয় বিমানবন্দর এবং তিনটি নতুন এয়ারফিল্ডের প্রস্তাব।
  • বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২২,০০০ কোটি টাকার নতুন তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা।
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মিশন চালুর ঘোষণা।
  • শিল্পবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ জোর।

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক নিঃসন্দেহে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের অর্থনীতি নিয়ে যে সমালোচনা ছিল—বিনিয়োগের ঘাটতি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনীহা এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা—সেই পরিস্থিতি বদলানোর বার্তা দিয়েছে এবারের বাজেট। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের বাজেটে কল্যাণমূলক প্রকল্পের পাশাপাশি শিল্প ও পরিকাঠামোকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বড় ঘোষণা হল শিল্প ও কর্মসংস্থানমুখী ৪০,০০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মসূচি। সরকারের দাবি, এই অর্থ শিল্প অবকাঠামো, নতুন প্রকল্প এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে ব্যয় করা হবে। একই সঙ্গে এক লক্ষ নতুন চাকরি তৈরির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন শিল্পনীতি

বাজেটের আগে থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সরকার একটি নতুন শিল্পনীতি আনতে চলেছে। সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা গিয়েছে বাজেটে। নতুন শিল্পনীতির মূল লক্ষ্য হল বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা করা। এর আওতায় সিঙ্গল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা চালু করা হবে, যাতে শিল্পপতিদের বিভিন্ন দফতরে ঘুরতে না হয়।

সরকার জানিয়েছে, শিল্প স্থাপনের জন্য জমি পাওয়ার প্রক্রিয়াকেও সহজ করা হবে। সিঙ্গুর ইস্যুর পর পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের পথে জমি ছিল সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা। নতুন নীতিতে সেই সমস্যার সমাধানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিনিয়োগ টানার কৌশল

বাজেটে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শিল্পমহলের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল কর-ছাড়, দ্রুত অনুমোদন, উন্নত অবকাঠামো এবং সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ। সরকার জানিয়েছে, নতুন শিল্পনীতি এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেবে।  শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, রাজ্যে টাটা গোষ্ঠীকে ফিরিয়ে আনা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সরকারের ধারণা, টাটাদের প্রত্যাবর্তন হলে দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং পশ্চিমবঙ্গের শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তি শক্তিশালী হবে।

বিমানবন্দর ও পরিবহণ অবকাঠামো

শিল্পায়নের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণেই বাজেটে কল্যাণীতে একটি গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রায় এক হাজার একর জমিতে এই বিমানবন্দর তৈরি হবে। পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনটি নতুন এয়ারফিল্ড নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে।

সরকারের মতে, নতুন বিমানবন্দর ও আকাশপথের পরিকাঠামো শিল্প, রপ্তানি, পর্যটন এবং লজিস্টিক পরিষেবার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। বিশেষ করে নদিয়া, উত্তরবঙ্গ এবং জঙ্গলমহলের মতো অঞ্চলে নতুন শিল্প বিনিয়োগের পথ খুলতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতে বৃহৎ বিনিয়োগ

শিল্পায়নের অন্যতম পূর্বশর্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। সেই লক্ষ্যেই রাজ্য সরকার ২২,০০০ কোটি টাকার দুটি নতুন তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। সাঁতালডিহ এবং বক্রেশ্বরে এই প্রকল্পগুলি গড়ে উঠবে।

সরকারি জমিতে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এই কেন্দ্রগুলি তৈরি হবে। এর ফলে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, নির্মাণ পর্যায় এবং পরবর্তী সময়ে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এআই ও নতুন প্রযুক্তি

বাজেটে একটি ‘এআই মিশন’-এর কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও বিস্তারিত রূপরেখা এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল পরিষেবা খাতে নতুন বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে তথ্যপ্রযুক্তি এবং এআই-ভিত্তিক পরিষেবার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প

পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯৩ লক্ষ ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প সংস্থা রয়েছে। রাজ্যের শিল্প কাঠামোর মূল ভিত্তিই এই খাত। অতীতে সিঙ্গুরে কৃষি-শিল্প পার্ক তৈরির মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং বর্তমান সরকারও এমএসএমই খাতকে শিল্পায়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে।

সরকারের ধারণা, বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তি এবং বাজার সংযোগ দেওয়া গেলে জেলায় জেলায় কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন

পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বাজেটকে শিল্পায়নের দিক থেকে একটি নীতিগত মোড়বদলের বাজেট বলা যায়। গত এক দশকে যেখানে রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মূলত সামাজিক সুরক্ষা ও নগদ সহায়তা প্রকল্প, সেখানে এবারের বাজেটে শিল্প, অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানকে সমান্তরাল অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তবে বাজেট ঘোষণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বাস্তবায়ন। জমি, পরিবেশ ছাড়পত্র, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—এই চারটি ক্ষেত্রে সরকার কতটা সফল হয়, তার উপরই নির্ভর করবে শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ। কিন্তু অন্তত নীতিগত স্তরে বিজেপি সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গকে আবার শিল্প বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতেই তারা বাজেটের প্রধান জোর দিয়েছে।