হাইলাইটস
- কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ ঘোষণার পর ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
- লিভারপুলের হিলসবোরো ট্র্যাজেডির স্মরণসভায় জনরোষের মুখে পড়ার ঘটনাকে তিনি নিজের রাজনৈতিক জীবনের মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত বলে মনে করেন।
- গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে পরিবহণ ও আঞ্চলিক উন্নয়নে সাফল্যের জন্য তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
- কোভিড মহামারির সময় বরিস জনসনের সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান।
- লেবার পার্টির বাম ও মধ্যপন্থী—দুই শিবিরের কাছেই গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে তাঁকে।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী Keir Starmer পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম Andy Burnham। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, লেবার পার্টির এই অভিজ্ঞ নেতা এবং গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়রই হতে পারেন যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
আজকের বার্নহ্যামকে বোঝার জন্য ফিরে যেতে হয় ২০০৯ সালে। লিভারপুলের বিখ্যাত Anfield স্টেডিয়ামে হিলসবোরো বিপর্যয়ের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় তিনি ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী Gordon Brown-এর মন্ত্রিসভার সদস্য। বক্তব্য রাখতে উঠে তিনি দর্শকদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে পড়েন। হিলসবোরো বিপর্যয়ে নিহত ৯৭ সমর্থকের পরিবারের জন্য বিচার না হওয়ার ক্ষোভে জনতা তাঁকে বাধা দেয়।পরবর্তীকালে বার্নহ্যাম বলেন, সেদিনই তাঁর মনে হয়েছিল যে ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনীতি সাধারণ মানুষের বাস্তব অনুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘‘সেদিন থেকেই ওয়েস্টমিনস্টারের প্রতি আমার মোহভঙ্গ শুরু হয়।’’এই ঘটনাই তাঁকে ধীরে ধীরে ‘জনতার রাজনীতি’র দিকে নিয়ে যায়। রাজনৈতিক জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তিনি নিজেকে লন্ডনকেন্দ্রিক অভিজাত রাজনীতির বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেন।অ্যান্ডি বার্নহ্যামের জন্ম লিভারপুলের উপকণ্ঠে। বাবা ছিলেন টেলিফোন প্রকৌশলী এবং মা চিকিৎসকের সহকারী। শ্রমজীবী মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা বার্নহ্যাম কিশোর বয়সেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। বিবিসির বিখ্যাত ধারাবাহিক Boys from the Blackstuff দেখে বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি লেবার পার্টির সদস্য হন।শিক্ষাজীবনে তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ইংরেজি সাহিত্য পড়ার জন্য সুযোগ পান University of Cambridge-এ। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ভবিষ্যৎ স্ত্রী মেরি-ফ্রান্স ভ্যান হিলের।স্নাতকোত্তর শেষে সাংবাদিকতা ও গবেষণার কাজে যুক্ত থাকার পর তিনি লেবার রাজনীতিতে পূর্ণ সময়ের কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ২০০১ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের লি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে টনি ব্লেয়ার এবং গর্ডন ব্রাউনের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। অর্থ, সংস্কৃতি এবং স্বাস্থ্য—বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে জমা হয়।
দুইবার তিনি লেবার পার্টির নেতৃত্বের জন্য লড়াই করেন। ২০১০ সালে পরাজিত হন Ed Miliband-এর কাছে। ২০১৫ সালে আবারও চেষ্টা করেন, কিন্তু হেরে যান Jeremy Corbyn-এর কাছে।তবে এখানেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা থেমে যায়নি। বরং দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সময়েও তিনি তুলনামূলকভাবে সংযত ভূমিকা পালন করেন। করবিনের ছায়া মন্ত্রিসভায় কাজ করেন এবং ব্রেক্সিট-পরবর্তী অস্থিরতার সময়েও নিজেকে দলের ঐক্যের পক্ষে তুলে ধরেন।২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হন বার্নহ্যাম। এরপর তাঁর রাজনৈতিক ভাগ্য আমূল বদলে যায়। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তিনি দেখাতে শুরু করেন যে আঞ্চলিক নেতৃত্বও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।বিশেষ করে গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেয়। বহু বছর পর ম্যানচেস্টারের বাস পরিষেবা আবার জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিচালিত হতে শুরু করে। পরিবহণ, আবাসন, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ‘উত্তরের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।কোভিড মহামারির সময় তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী Boris Johnson-এর সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ম্যানচেস্টারের জন্য আর্থিক সহায়তা এবং স্থানীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে তিনি আপসহীন অবস্থান নেন।সেই সময় ব্রিটেনের বহু নাগরিক তাঁকে এমন একজন নেতা হিসেবে দেখতে শুরু করেন যিনি লন্ডনের ক্ষমতার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলতে পারেন। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে ‘King of the North’ বা ‘উত্তরের রাজা’ বলে অভিহিত করতে শুরু করেন।সমালোচকেরা অবশ্য তাঁকে ‘ক্যাপ্টেন ফ্লিপ-ফ্লপ’ বলেও আক্রমণ করেন। তাঁদের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছে। কখনও মধ্যপন্থী, কখনও সমাজতান্ত্রিক, আবার কখনও ব্যবসাবান্ধব বক্তব্য দিয়েছেন তিনি।কিন্তু সমর্থকদের মতে, এটি আদর্শগত দুর্বলতা নয়; বরং মানুষের মতামত শোনার এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। বর্তমান সময়ে যখন ব্রিটেনের রাজনীতি গভীরভাবে বিভক্ত, তখন এই নমনীয়তাকেই অনেকেই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করছেন।আজ লেবার পার্টির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ডানপন্থী অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির উত্থান এবং একই সঙ্গে বামপন্থী ভোটারদের আস্থা ধরে রাখা। বার্নহ্যাম এমন একজন নেতা, যিনি দুই দিকের ভোটারদের কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারেন বলে দলের অনেকেই বিশ্বাস করেন।তাঁর রাজনৈতিক বার্তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়—লন্ডনের বাইরে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া। শিল্পাঞ্চল, ছোট শহর এবং অবহেলিত অঞ্চলের মানুষের ক্ষোভ ও প্রত্যাশাকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরেছেন।ফলে ব্রিটেন যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন অ্যান্ডি বার্নহ্যামের উত্থান কেবল একজন নেতার ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি আঞ্চলিক রাজনীতির শক্তি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ এবং ওয়েস্টমিনস্টারের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহেরও প্রতীক।যদি সবকিছু প্রত্যাশামতো এগোয়, তাহলে লিভারপুলের এক সাধারণ পরিবারের ছেলে, যিনি একদিন অ্যানফিল্ডে জনরোষের মুখে পড়ে নিজের রাজনৈতিক দর্শন বদলে ফেলেছিলেন, তিনিই খুব শিগগির বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী গণতন্ত্রের নেতৃত্বে বসতে পারেন। তাঁর সামনে তখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—‘জনতার নেতা’ হিসেবে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তিকে বাস্তব শাসনক্ষমতায় রূপান্তরিত করা।