চিনে এ বছরের সবচেয়ে শক্তিশালী টাইফুন ‘ডলফিন’ এখন দেশের অভ্যন্তরের দিকে এগোচ্ছে। আর তার জেরে রাজধানী বেজিংয়ে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ বৃষ্টির আশঙ্কা। আবহবিদদের পূর্বাভাস, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় এতটা বৃষ্টি হতে পারে, যা বেজিংয়ের সারা বছরের গড় বৃষ্টিপাতের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি!
মঙ্গলবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে বেজিংয়ের আবহাওয়া দফতর। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ ১৫০ মিলিমিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অথচ বেজিংয়ে বছরে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৫২৮ মিলিমিটার। অর্থাৎ, এক দিনের বৃষ্টিই পৌঁছে যেতে পারে বার্ষিক গড়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই তৎপর প্রশাসন। বেজিংয়ের শহরতলির চারটি জেলায় সর্বোচ্চ স্তরের বন্যা মোকাবিলা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। পাহাড়ি জেলা মেনতোউগোউয়ে জারি হয়েছে সর্বোচ্চ স্তরের বন্যা সতর্কতা। বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনোর পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকা ও নদীর ধার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
৬,০০০ কিলোমিটার পেরিয়ে ‘ডলফিন’
ডলফিনের দাপট যে শুধু বেজিংয়েই সীমাবদ্ধ, তা নয়। প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সপ্তাহান্তে চিনের উপকূলে আছড়ে পড়ে এই ঝড়। তার বিশাল মেঘমালা ইতিমধ্যেই পূর্ব চিনের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রবল বৃষ্টি নামিয়েছে।
সম্ভাব্য বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কায় পূর্ব চিনে ইতিমধ্যেই ১০ লক্ষের বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঝেজিয়াংয়ের উপকূলীয় শহর ওয়েনঝৌতেই সরানো হয়েছে ৯ লক্ষের বেশি মানুষ। তাঁদের জন্য খোলা হয়েছে ১,৫০০-র বেশি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র।
ফুজিয়ান প্রদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রায় ৯৮,৯০০ জনকে। সাংহাইয়েও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরানো হয়েছে ২ লক্ষ ১৫ হাজার ৬০০ মানুষ। সোমবার টাইফুনের প্রভাবে শহরে প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া বইতে দেখা যায়।
হুবেইয়ে অরেঞ্জ অ্যালার্ট
মঙ্গলবার ভোরে ডলফিন মধ্য চিনের হুবেই প্রদেশের উপর দিয়ে এগোতে শুরু করে। প্রায় ৫ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষের এই প্রদেশটি চিনের গাড়ি এবং উচ্চপ্রযুক্তির বৈদ্যুতিন শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ঝুঁকি বুঝে চিনের জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র ভারী বৃষ্টির জন্য ফের ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করেছে। উত্তর-পশ্চিম হুবেইয়ের কিছু এলাকায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় ২৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
শিয়াংইয়াং, হুয়াংগাং ও সুইঝৌ-সহ একাধিক শহরে ‘ইয়েলো অ্যালার্ট’ জারি করেছে প্রাদেশিক প্রশাসন। প্রবল বৃষ্টির জেরে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কাও বাড়ছে।
পরিস্থিতির জেরে একাধিক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইচাংয়ের জনপ্রিয় থ্রি গর্জেস ড্যাম পর্যটন এলাকাও আপাতত বন্ধ। হুবেইয়ে চলতে থাকা ১০৭টি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জলপথ নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যে ২৬টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে কাজ সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
পাশের হেনানেও জারি হয়েছে আকস্মিক বন্যার সতর্কতা। আবহবিদদের আশঙ্কা, ডলফিন উত্তর দিকে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প টেনে নিয়ে যাওয়ায় মধ্য ও উত্তর চিনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারী বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
জাপানেও আর এক টাইফুনের হানা
চিনের পাশাপাশি টাইফুনের চোখরাঙানি রয়েছে জাপানেও। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ‘চান-হোম’ মঙ্গলবারই দেশের মূল ভূখণ্ড অতিক্রম করতে পারে। এর জেরে প্রবল বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া, বন্যা এবং ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।
একদিকে ডলফিনের দাপট, অন্যদিকে চান-হোম—পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অংশে এখন আবহাওয়ার চোখরাঙানি। আর চিনে প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আগামী কয়েক ঘণ্টায় বিপুল বৃষ্টির জল সামলে বন্যা ও ভূমিধসের ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব ঠেকানো।