বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়ের হওয়া জনস্বার্থ মামলা গ্রহণ করল কলকাতা হাইকোর্ট। সোমবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির উল্লেখ করা হয়। আদালত মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা।
এই মামলাকে ঘিরে রাজ্যে ধর্মীয় স্থানে লাউডস্পিকার ব্যবহার এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি ফের আদালতের বিচারাধীন হল। মামলাকারীদের বক্তব্য, নির্ধারিত শব্দসীমা মেনে আজানের সময় লাউডস্পিকার ব্যবহারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনও লিখিত নির্দেশ ছাড়াই রাজ্যের মসজিদগুলি থেকে লাউডস্পিকার সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ তথা প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে বলেন, মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি জানান, কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী দানিশ ফারুকির পক্ষ থেকে জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
কল্যাণের দাবি, রাজ্যের প্রায় ৪,০০০ মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরানোর জন্য যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা বেআইনি এবং সেই নির্দেশ লিখিতও নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনের তরফে মৌখিক নির্দেশ দিয়েই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। সেই কারণেই আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
মামলাকারীদের অন্যতম প্রধান যুক্তি হল, কলকাতা হাইকোর্টেরই আগের একটি নির্দেশে নির্ধারিত ডেসিবেল সীমার মধ্যে আজানের সময় লাউডস্পিকার ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিচারপতি ভগবতী প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন একটি ডিভিশন বেঞ্চ অতীতে জানিয়েছিল, শব্দদূষণ সংক্রান্ত বিধি এবং নির্ধারিত শব্দসীমা মেনে আজানের সময় লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যেতে পারে।
সেই পুরনো নির্দেশকে সামনে রেখেই নতুন জনস্বার্থ মামলায় আবেদন করা হয়েছে, মসজিদগুলিতে আজানের সময় নির্ধারিত শব্দসীমার মধ্যে লাউডস্পিকার ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হোক।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের শুভেন্দু অধিকারী সরকারের বিরুদ্ধে জোর করে নীতি কার্যকর করার অভিযোগও তুলেছেন। তাঁর দাবি, প্রশাসনিক চাপ ও ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা বা সরকারের পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে আদালত এখনও কোনও সিদ্ধান্ত দেয়নি। বৃহস্পতিবারের শুনানিতেই রাজ্য সরকারের অবস্থান এবং মামলাকারীদের আইনি যুক্তি বিস্তারিত ভাবে সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই মামলার কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি শুধুমাত্র লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যাবে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হল, ধর্মীয় স্থানে শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও আদালতের নির্দেশ মেনে প্রশাসন কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে এবং কোনও লিখিত সরকারি নির্দেশ ছাড়া রাজ্যজুড়ে এমন পদক্ষেপ করা আইনসঙ্গত কি না।
এর মধ্যেই মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থান থেকে লাউডস্পিকার সরানোর প্রতিবাদে কলকাতায় মিছিলের অনুমতি দিয়েছে হাইকোর্টের আর একটি বেঞ্চ। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের সিঙ্গল বেঞ্চ মঙ্গলবার রাজাবাজার থেকে মৌলালি পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিলের অনুমতি দিয়েছে।
আব্দুল সামাদ নামে এক ব্যক্তি ওই মিছিলের অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। আদালত মিছিলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তও বেঁধে দিয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, মিছিলটি সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে করতে হবে এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৭৫০-র বেশি হতে পারবে না।
ফলে একই বিষয়কে কেন্দ্র করে এখন দু’টি পৃথক বিচারিক প্রক্রিয়া সামনে এসেছে। এক দিকে রাজ্যজুড়ে মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরানোর অভিযোগের বৈধতা পরীক্ষা করবে ডিভিশন বেঞ্চ। অন্য দিকে, সেই পদক্ষেপের প্রতিবাদে কলকাতায় মিছিল করার গণতান্ত্রিক অধিকারকে শর্তসাপেক্ষে স্বীকৃতি দিয়েছে সিঙ্গল বেঞ্চ।
লাউডস্পিকার নিয়ে ভারতে আইনি অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা প্রার্থনার অধিকার সংবিধান স্বীকৃত হলেও শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের অধিকার অবাধ নয়। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের বিধি, সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্ধারিত শব্দসীমা এবং প্রশাসনিক অনুমতির শর্ত মানতে হয়। অর্থাৎ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিকের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে থাকার অধিকার—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রশাসন ও আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন।
এই কারণেই বৃহস্পতিবারের শুনানি তাৎপর্যপূর্ণ। আদালতকে দেখতে হতে পারে, সত্যিই কি রাজ্যজুড়ে মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার সরানোর কোনও মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেই নির্দেশের আইনি ভিত্তি কী এবং পূর্ববর্তী আদালতের নির্দেশের সঙ্গে বর্তমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
একই সঙ্গে মামলাটি রাজনৈতিক ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা ইতিমধ্যেই ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলছে। অন্য দিকে, সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের যুক্তি উঠে আসতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে আদালতের বিবেচ্য হবে প্রশাসনিক পদক্ষেপটির আইনি বৈধতা।
বৃহস্পতিবারের শুনানিতে রাজ্য সরকারের বক্তব্য সামনে এলে পরিষ্কার হতে পারে, লাউডস্পিকার সরানোর জন্য কোনও সরকারি নির্দেশিকা জারি হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তার আইনি ভিত্তি কী। সেই সঙ্গে নির্ধারিত শব্দসীমা মেনে আজানের সময় মসজিদে লাউডস্পিকার ব্যবহারের আগের আদালতি নির্দেশ বর্তমান পরিস্থিতিতে কী ভাবে কার্যকর হবে, তারও উত্তর মিলতে পারে।