বাংলাস্ফিয়ার: চোখের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পেলেন তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে তিন সপ্তাহের জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। কলকাতা হাই কোর্ট বিদেশযাত্রার উপর যে বিধিনিষেধ শিথিল করতে রাজি হয়নি, তার বিরুদ্ধে অভিষেকের আবেদন মঞ্জুর করেছে শীর্ষ আদালত। তবে বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্তও মানতে হবে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে অভিষেকের আবেদনটির শুনানি হয়। রাজ্য সরকারের তরফে তাঁর বিদেশযাত্রার বিরোধিতা করা হয়। সরকারের আইনজীবী আদালতে জানান, অভিষেকের বিরুদ্ধে ১৬টি এফআইআর রয়েছে। তাঁকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলে তিনি দেশে না-ও ফিরতে পারেন—এমন আশঙ্কার কথাও আদালতে জানানো হয়।

কিন্তু সেই যুক্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের বক্তব্য, চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়া এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ব্যক্তির অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী শুনানির সময় মন্তব্য করেন, প্রত্যেক ব্যক্তিরই বিদেশে যাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং প্রত্যেকেরই নিজের চিকিৎসা বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

কেন বিদেশযাত্রায় বাধা ছিল

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় একটি কথিত উস্কানিমূলক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে অভিষেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। সেই মামলায় তাঁর গ্রেফতারির উপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার সময় কয়েকটি শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। তার মধ্যেই ছিল বিদেশযাত্রা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ।

চোখের চিকিৎসার জন্য সেই শর্ত সাময়িক ভাবে শিথিল করার আবেদন নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অভিষেক। কিন্তু হাই কোর্ট তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেনি। সেই সিদ্ধান্তকেই সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেন তিনি।

অভিষেকের দীর্ঘদিনের চোখের সমস্যার কথা তাঁর আইনজীবীরা আদালতের সামনে তুলে ধরেন। চিকিৎসার জন্য তিন সপ্তাহ বিদেশে থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানানো হয়। সেই আবেদন বিবেচনা করেই শীর্ষ আদালত বিদেশযাত্রার অনুমতি দেয়।

আপত্তি রাজ্য সরকারের

শুনানিতে রাজ্য সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এস ভি রাজু অভিষেকের আবেদনটির বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, তৃণমূল সাংসদের বিরুদ্ধে মোট ১৬টি মামলা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে বিদেশে যেতে দিলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এমনকি অভিষেক দেশে ফিরবেন কি না, তা নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বেঞ্চ অবশ্য এই আশঙ্কার ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। শুধুমাত্র একাধিক মামলা রয়েছে বলে কোনও ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া থেকে আটকানো কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেই প্রশ্নই কার্যত উঠে আসে শুনানিতে।

সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত অভিষেকের বিদেশযাত্রার অনুমতি দিলেও তা নিঃশর্ত নয়।

কূটনৈতিক পাসপোর্টেই যাত্রা

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, অভিষেককে তাঁর কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করেই বিদেশে যেতে হবে। তিনি কোন দেশে যাবেন, কোথায় থাকবেন এবং তাঁর সফরের সম্পূর্ণ সূচি কী—সেই তথ্য তদন্তকারী সংস্থাকে আগাম জানাতে হবে।

তিন সপ্তাহের জন্যই এই অনুমতি কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ চিকিৎসা শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁকে দেশে ফিরতে হবে। আদালতে অভিষেকের তরফেও এই শর্তগুলি মেনে চলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

শীর্ষ আদালতের এই নির্দেশের তাৎপর্য মূলত ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং বিচারাধীন মামলায় আরোপিত বিধিনিষেধের মধ্যে ভারসাম্যের প্রশ্নে। কোনও অভিযুক্ত বা মামলার মুখোমুখি ব্যক্তি বিদেশে চিকিৎসা করাতে পারবেন কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা একমাত্র বিবেচ্য হতে পারে না—সোমবারের শুনানিতে বেঞ্চের পর্যবেক্ষণে সেই অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে।

চিকিৎসা বেছে নেওয়ার অধিকারকে গুরুত্ব

বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিচারপতি বাগচীর পর্যবেক্ষণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি কোথায় এবং কী ভাবে চিকিৎসা করাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তাঁর রয়েছে। রাষ্ট্রের তদন্তের স্বার্থ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত আরোপ করা যেতে পারে; চিকিৎসার সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়াই একমাত্র পথ নয়।

সেই কারণেই আদালত এক দিকে অভিষেককে তিন সপ্তাহ বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে, অন্য দিকে তাঁর সফরের তথ্য তদন্তকারী সংস্থার কাছে জমা দেওয়া এবং কূটনৈতিক পাসপোর্টে যাত্রার মতো শর্ত রেখেছে।

ফলে কলকাতা হাই কোর্টে যে আবেদন মঞ্জুর হয়নি, সুপ্রিম কোর্টে সেই প্রশ্নে আপাতত স্বস্তি পেলেন তৃণমূল সাংসদ। সরকারের তরফে ১৬টি এফআইআর এবং তাঁর দেশে না ফেরার আশঙ্কা তুলে ধরা হলেও, চিকিৎসার অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ও শর্তসাপেক্ষ বিদেশযাত্রার পথ খুলে দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত।