ছাত্র-বিক্ষোভের চাপে শেষ পর্যন্ত পিছু হটল বিহার সরকার। শিক্ষক নিয়োগের চতুর্থ পর্ব বা টিআরই-৪-এর পরীক্ষা প্রাথমিক ও মূল—দুই ধাপে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে রাজ্যের শিক্ষা দফতর। পরিবর্তে একটিমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পরে চলতি আন্দোলন প্রত্যাহারে সর্বসম্মতভাবে রাজি হয়েছেন ১৩ জন ছাত্র প্রতিনিধির একটি দল।

বিহারের শিক্ষা দফতরের সচিবের পৌরোহিত্যে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, টিআরই-৪ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পৃথক প্রাথমিক ও মূল পরীক্ষার বদলে একটিমাত্র পরীক্ষা নেওয়ার দাবি সরকার গ্রহণ করেছে।

আন্দোলনকারীরা ‘এক প্রার্থী, এক ফল’ নীতি চালুরও দাবি জানিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, কোনও প্রার্থী একাধিক স্তরের মেধাতালিকায় সফল হলে একটি পদ বেছে নেওয়ার পরে তাঁর নাম অন্য তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। তাতে একজন প্রার্থী কেবল একটি পদেই যোগ দিতে পারবেন এবং খালি হওয়া অন্য পদগুলিতে পরবর্তী যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

এক সরকারি আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘এক প্রার্থী, এক ফল’ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রচলিত বিধি মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

হাই কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটি

ছাত্র প্রতিনিধিদের লিখিত দাবিপত্রে টিআরই-৪ ছাড়াও একাধিক নিয়োগ পরীক্ষার প্রসঙ্গ ছিল। সেগুলির মধ্যে রয়েছে ৭০তম বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা, বিহার স্টাফ সিলেকশন কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষা, পুলিশ সাব-ইনস্পেক্টর নিয়োগ পরীক্ষা এবং বিহার যোগ্যতা পরীক্ষা।

সরকার জানিয়েছে, এই পরীক্ষাগুলি সম্পর্কে অভিযোগ ও প্রস্তাব খতিয়ে দেখতে পটনা হাই কোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হবে। অভিযোগকারীদের জমা দেওয়া তথ্যপ্রমাণ ও পরামর্শ পরীক্ষা করে কমিটি সুপারিশ দেবে। সেই সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১,৭৯৯টি সাব-ইনস্পেক্টর পদে নিয়োগ পরীক্ষার পরবর্তী প্রক্রিয়াও ওই কমিটির প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিহার স্টাফ সিলেকশন কমিশনকে যত দ্রুত সম্ভব নিয়োগ পরীক্ষার পঞ্জি প্রকাশ করতে এবং নির্ধারিত সময়সূচি মেনে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতেও বলা হয়েছে।

গ্রন্থাগারিক নিয়োগ শুরু করার আশ্বাস

রাজ্যের বিভিন্ন দফতরে শূন্যপদের ভিত্তিতে গ্রন্থাগারিক নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বৈঠকে আধিকারিকেরা আশ্বাস দিয়েছেন।

সরকারি নিয়োগে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য পৃথক সংরক্ষণ অথবা তাঁদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার দাবিও খতিয়ে দেখবে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি। রাজ্য সরকারের প্রচলিত বিধান মেনেই বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

ভূমিপুত্র নীতি নিয়ে আইনি পরামর্শ

বিহারের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যত বেশি সম্ভব স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি চালু করার দাবিও তুলেছিলেন আন্দোলনকারীরা। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আইনজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে এই বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ করবে সরকার।

নিয়োগ পরীক্ষায় প্রার্থীদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিটিও বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটির কাছে পাঠানো হবে।

সব নিয়োগ সংস্থার পরীক্ষার পঞ্জি প্রকাশ এবং তা কঠোরভাবে মেনে চলার বিষয়েও বৈঠকে ঐকমত্য হয়েছে। বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আদলে অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, ওএমআর শিট এবং উত্তরপত্র প্রকাশে স্বচ্ছতা আনার প্রস্তাবও বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটি বিবেচনা করবে।

সরকারি আধিকারিক জানিয়েছেন, বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা এবং সহকারী শিক্ষা উন্নয়ন আধিকারিক ও স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত কয়েকটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করছে বিহার পুলিশের অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখা। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

১৮ আগস্ট থেকে চলছিল আন্দোলন

বৈঠকে উপস্থিত সকলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন। আলোচনা ও সিদ্ধান্তের পরে ছাত্র প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতভাবে আন্দোলন প্রত্যাহারের কথা জানান।

টিআরই-৪ পরীক্ষার প্রস্তাবিত দুই স্তরের পদ্ধতির বিরুদ্ধে ১৮ আগস্ট থেকে পটনার গর্দানিবাগে অবস্থান-বিক্ষোভ চালাচ্ছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা। বৃহস্পতিবার সকালে কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষামন্ত্রীর বাসভবনে পৌঁছে গেলে সেখানে বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

এর আগে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। কয়েকশো ছাত্র গান্ধী ময়দান থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে মিছিল করে এগিয়ে যান। তাঁরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে দেওয়ার পরে জলকামান ব্যবহার করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করা হয়। বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটকও করেছিল পুলিশ।

আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল, টিআরই-৪-এর জন্য প্রাথমিক ও মূল পরীক্ষা আলাদা করে না নিয়ে এক ধাপে পরীক্ষা নেওয়া। পাশাপাশি ৭০তম বিপিএসসি পরীক্ষা, বিএসএসসি নিয়োগ, স্থানীয়দের অগ্রাধিকার, বয়সসীমা বৃদ্ধি, গ্রন্থাগারিক নিয়োগ এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়েও একাধিক দাবি তুলেছিলেন আন্দোলনকারীরা।