তাপস রায়: সংরক্ষণবিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করলেন জে পি নাড্ডা। জাতপাতের পরিবর্তে আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। বিজেপির অন্দরে এই আলোচনাকে দেখা হচ্ছে ক্ষুব্ধ উচ্চবর্ণের মানুষকে শান্ত করার চেষ্টা হিসেবে। বিশেষত উত্তরপ্রদেশে দলের এই দীর্ঘদিনের সমর্থকগোষ্ঠীর একাংশ মুখ ফিরিয়ে নিলে নির্বাচনে তার বড় মাশুল দিতে হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে দলের নেতাদের।

এক্সে নাড্ডা জানিয়েছেন, ‘সংরক্ষণ হটাও আন্দোলন’-এর হর্ষ দুবে, রণবাহাদুর সিংহ চৌহান এবং মৃত্যুঞ্জয় পাঠকের সঙ্গে তাঁর ‘সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা’ হয়েছে।

তিনি লেখেন, ‘‘২১ অগস্ট যন্তর মন্তরে যে আন্দোলন হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আন্দোলনের প্রতিনিধিদলের সদস্য হর্ষ দুবে, রণবাহাদুর সিংহ চৌহান এবং মৃত্যুঞ্জয় পাঠকের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। এই বিষয়ে শীঘ্রই আবার আমাদের বৈঠক হবে।’’

দুবে জানিয়েছেন, বুধবারও নাড্ডার সঙ্গে তাঁদের বৈঠক হয়েছিল। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে তিনি বলেন, ‘‘এটাই ছিল প্রথম বৈঠক। বুধবার ও বৃহস্পতিবার—দু’দিন ধরে আলোচনা হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক বৈঠক করে আমাদের সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’’

মেডিক্যালে ভর্তির প্রবেশিকা নিটের পরীক্ষার্থী দুবে এবং তাঁর আত্মীয়, ব্যবসায়ী অভিষেক অগ্নিহোত্রী ২১ অগস্ট যন্তর মন্তরের সংরক্ষণবিরোধী বিক্ষোভের সামনের সারিতে ছিলেন।

উত্তরপ্রদেশের কনৌজ জেলার বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিক চৌহান বলেন, ‘‘আমরা দাবি জানিয়েছি, সংরক্ষণ হতে হবে আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে। মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, সরকার আমাদের দাবি বিবেচনা করবে। তাঁর উপরে আমাদের আস্থা আছে। আশা করছি, সরকার আমাদের দাবি নিয়ে পদক্ষেপ করবে। আজ মন্ত্রীর সঙ্গে দু’ঘণ্টা এবং বুধবার তিন ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে।’’

তবে তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘দাবি পূরণ না হলে আমরা আবার যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করব। তখন আরও বেশি মানুষ আসবেন।’’

চৌহানের বক্তব্য, তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির অধিকার কেড়ে নেওয়া এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য নয়। তিনি বলেন, ‘‘তাঁরা আমাদের ভাই। সংরক্ষণ নির্ভর করা উচিত আর্থিক অবস্থার উপরে। ‘ক্রিমি লেয়ার’ তুলে দেওয়া উচিত।’’

উচ্চবর্ণের ক্ষোভ সামলানোর চেষ্টা

বিজেপির অন্দরে সংরক্ষণবিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্তকে উচ্চবর্ণের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি একাধিক বিষয়ে দলের উপরে এই অংশের অসন্তোষ বেড়েছে। বিশেষত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতপাতের বৈষম্য ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আনা সমতা বিধি নিয়ে তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। ওই বিধির কার্যকারিতা আপাতত স্থগিত রয়েছে।

১৯৮৯ সাল থেকে উচ্চবর্ণ বিজেপির অন্যতম প্রধান সমর্থকগোষ্ঠী। ওই বিধির সম্ভাব্য ‘অপব্যবহার’ নিয়ে তাঁদের আশঙ্কা ছিল। তাঁদের ধারণা হয়েছিল, তাঁদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বিজেপি নেতাদের কথায়, বিষয়টি উচ্চবর্ণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। সম্প্রতি জাতগণনা নিয়ে আলোচনা সেই অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে।

দলের এক অন্দরমহলের ব্যক্তির বক্তব্য, প্রথমে পাঠকের সঙ্গে এবং তার পরে নাড্ডার সঙ্গে বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল ‘‘তাঁদের শান্ত করা, দল যে তাঁদের কথা শুনবে সেই আশ্বাস দেওয়া এবং তাঁদের উদ্বেগের সুরাহা করা হবে—এই বিশ্বাস তৈরি করা’’।

উত্তরপ্রদেশের এক বিজেপি নেতা বলেন, ‘‘বিজেপির শীর্ষ নেতারা অতীতে বহু বার আশ্বাস দিয়েছেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থায় কোনও পরিবর্তন হবে না। সেই অবস্থান থেকে সরে আসা অসম্ভব। অন্য দিকে, এই গোষ্ঠীর বক্তব্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের সমর্থন পাচ্ছে। দেশের নানা জায়গায়, বিশেষত উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং বিহারে তাদের আওয়াজ জোরালো হচ্ছে। দলকে তাদের শান্ত করতেই হবে। নইলে তারা বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।’’

তবে শুধু বৈঠক করলেই আন্দোলনকারীরা সন্তুষ্ট হবেন না বলে মনে করেন ওই নেতা। তাঁর কথায়, ‘‘বৈঠক করে কিছু দিনের জন্য শান্তি বজায় রাখা যায়। কিন্তু তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আন্দোলনের নেতারা সংরক্ষণ নীতি এবং তার প্রভাব সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা চাইছেন।’’

ভোটের অঙ্কে কেন উদ্বেগ

বিজেপি সূত্রের বক্তব্য, এই অংশের উদ্বেগের সুরাহা করা দলের কাছে ‘‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’’ পাবে। কারণ, ‘‘আগামী নির্বাচনে এঁদের সামান্য অংশও, এমনকি ২–৩ শতাংশও যদি ভোট দিতে না গিয়ে বাড়িতে বসে থাকেন, তা হলে উত্তরপ্রদেশে দলের নির্বাচনী সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’’

উত্তরপ্রদেশের বিজেপি নেতাদের হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যের ভোটদাতাদের ২০ শতাংশেরও বেশি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়-সহ বিভিন্ন উচ্চবর্ণের মানুষ।

দলের এক নেতা বলেন, ‘‘এঁরা জেন জেডের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। কারণ, এই গোষ্ঠী পূর্বাঞ্চল এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে বিজেপির নির্বাচনী সম্ভাবনায় বড় আঘাত করতে পারে।’’

দলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের নির্বাচনে পূর্বাঞ্চল থেকে নির্বাচিত ১৬৩ জন বিধায়কের মধ্যে ৫২ জনই ব্রাহ্মণ, ভূমিহার, রাজপুত, কায়স্থ এবং বৈশ্যের মতো উচ্চবর্ণের সম্প্রদায়ভুক্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরপ্রদেশের ৪০৩ সদস্যের বিধানসভায় বিজেপি ২৫৭টি আসন জিতেছিল।