ভেনেজুয়েলার তেলে আমেরিকার দখল?

যা জানা জরুরি
- ওয়াশিংটন: ভেনেজুয়েলার ৬,৫০০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি প্রমাণিত তেলের উপর আমেরিকা সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে—এমনই দাবি করলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
- শুক্রবার নিজের সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এই বন্দোবস্তকে তিনি ‘বিশ্বের ইতিহাসে বৃহত্তম তেলচুক্তি’ বলে বর্ণনা করেছেন।
- ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তির ফলে আমেরিকার তেলের মজুত কার্যত দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ওয়াশিংটন: ভেনেজুয়েলার ৬,৫০০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি প্রমাণিত তেলের উপর আমেরিকা সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে—এমনই দাবি করলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুক্রবার নিজের সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এই বন্দোবস্তকে তিনি ‘বিশ্বের ইতিহাসে বৃহত্তম তেলচুক্তি’ বলে বর্ণনা করেছেন।
ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তির ফলে আমেরিকার তেলের মজুত কার্যত দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে। উৎপাদন বাড়লে দেশের বাজারে পেট্রলের দামও কমতে পারে বলে তাঁর আশা।
তবে ঘোষণা যতটা চমকপ্রদ, বাস্তবায়নের পথ ততটাই কঠিন।
কী চুক্তি হল?
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁর নির্দেশে বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো এবং যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে আলোচনা চালান। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে এই বন্দোবস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, এর জন্য আমেরিকার করদাতাদের কোনও অর্থ খরচ করতে হবে না।
চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ তৈলক্ষেত্রের উন্নয়ন ও পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। ওই ক্ষেত্রগুলিতে আনুমানিক ৬,৫০০ কোটি ব্যারেল প্রমাণিত তেল রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের এক আধিকারিকের ব্যাখ্যা, একটি নতুন বেসরকারি যৌথ সংস্থা এই তৈলক্ষেত্রগুলি পরিচালনা করবে। সেই সংস্থায় মালিকানা এবং উৎপাদিত তেল উৎপাদনমূল্যে কেনার নিশ্চয়তা—দুই মিলিয়ে আমেরিকা মোট মূল্যের প্রায় ৫৫ শতাংশের উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পাবে। এমনকি ওই সংস্থাকে ১০০ বছর পর্যন্ত ক্ষেত্রগুলি পরিচালনার অধিকার দেওয়া হতে পারে।
আমেরিকার লাভ কোথায়?
ট্রাম্পের যুক্তি, ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলভান্ডারে প্রবেশাধিকার আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে।
উৎপাদন বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে। তার প্রভাব পড়তে পারে আমেরিকার পেট্রলের দামেও। পাশাপাশি, দেশের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম ভান্ডার পূরণ করতেও ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এখানে একটি বড় ‘কিন্তু’ রয়েছে। নতুন তৈলক্ষেত্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদন শুরু করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। অর্থাৎ, চুক্তি আজ হলেও সস্তা পেট্রলের সুফল কাল থেকেই মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ভেনেজুয়েলার লাভ কী?
চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন ডেলসি রদ্রিগেজ। তাঁর দাবি, এর ফলে বহু বছর ধরে অবহেলিত ভেনেজুয়েলার তেল পরিকাঠামো পুনর্গঠন ও আধুনিকীকরণের সুযোগ তৈরি হবে।
তাঁর সরকারের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে। কর বাবদ ভেনেজুয়েলার আয় হতে পারে প্রায় ২০ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের কাছে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের সুযোগ, আর কারাকাসের কাছে অর্থনীতি পুনর্গঠনের সম্ভাবনা—দুই পক্ষই চুক্তির মধ্যে নিজেদের লাভ দেখছে।
তেলের দেশ, তবু উৎপাদন কম কেন?
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভান্ডার রয়েছে ভেনেজুয়েলায়—প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল।
কিন্তু বিপুল মজুত থাকলেই বিপুল উৎপাদন সম্ভব হয় না। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের ঘাটতি, দুর্বল পরিকাঠামো এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের উৎপাদনক্ষমতা অনেকটাই কমে গিয়েছে।
ফলে মাটির নীচে তেল থাকলেও সেটিকে দ্রুত বাজারে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ।
‘নিয়ন্ত্রণ’ কতটা বাস্তব?
এখানেই ট্রাম্পের ঘোষণার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিধান রয়েছে। অতীতে বিদেশি সংস্থার সম্পত্তি অধিগ্রহণের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে রাজনৈতিক ও আইনি ঝুঁকি এখনও যথেষ্ট।
তার উপর ৬,৫০০ কোটি ব্যারেল তেলের উপর ‘কার্যকর নিয়ন্ত্রণ’ পাওয়া আর সেই তেল থেকে বাস্তবে কোটি কোটি ব্যারেল উৎপাদন করা—দুই এক জিনিস নয়।
ট্রাম্পের ঘোষণা তাই নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসল প্রশ্ন হবে, ভেনেজুয়েলার মাটির নীচে থাকা বিপুল তেল কত দ্রুত মাটির উপর উঠে আসবে—আর তার কতটা সত্যিই আমেরিকার জ্বালানি বাজারকে বদলাতে পারবে?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



