চশমা, না কি ক্যামেরা?

যা জানা জরুরি
- কিন্তু সেই কথোপকথনের মাঝেই ক্যামেরা চালু রয়েছে কি না, তা কি আপনি বুঝতে পারবেন?
- মেটার ক্যামেরাযুক্ত চশমা ঘিরে মূল প্রশ্নটা এখানেই।
- দিল্লির খান মার্কেটে গোপনে ছবি তোলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ফের সামনে এসেছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ‘সম্মতি’র প্রশ্ন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সামনের মানুষটির চোখে সাধারণ চশমা। কথাবার্তাও চলছে স্বাভাবিক ছন্দে। কিন্তু সেই কথোপকথনের মাঝেই ক্যামেরা চালু রয়েছে কি না, তা কি আপনি বুঝতে পারবেন?
মেটার ক্যামেরাযুক্ত চশমা ঘিরে মূল প্রশ্নটা এখানেই। দিল্লির খান মার্কেটে গোপনে ছবি তোলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ফের সামনে এসেছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ‘সম্মতি’র প্রশ্ন। দেখতে সাধারণ চশমার মতো হলেও এই যন্ত্র ছবি ও ভিডিয়ো ধারণ করতে পারে, আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নানা কাজও করতে পারে। প্রযুক্তি যত সহজ হচ্ছে, আশপাশের মানুষের অজান্তে তাঁদের ছবি বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ এবং পরে তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তত বাড়ছে।
খান মার্কেটে কী ঘটেছিল?
দিল্লির এক বাসিন্দার অভিযোগ, খান মার্কেটের একটি ক্যাফেতে তাঁর সঙ্গে কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করে পরে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করা হয়। তাঁর হয়ে আইনজীবী অপার গুপ্ত ২৪ আগস্ট মেটা এবং সংশ্লিষ্ট ভিডিয়ো নির্মাতাকে আইনি নোটিস পাঠান।
নোটিসে ভিডিয়ো সরিয়ে নেওয়া, নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা, সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সংরক্ষণ ও প্রকাশ এবং ২ কোটি ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলি এখনও আদালতে প্রমাণিত নয়। আইনি নোটিস পাঠানোও অভিযুক্তের দায় প্রতিষ্ঠা করে না।
নোটিস অনুযায়ী, ২৪ জুলাই সন্ধ্যায় ক্যাফেতে এক অপরিচিত ব্যক্তি অভিযোগকারীকে অনভিপ্রেত প্রশ্ন ও মন্তব্য করে বিরক্ত করেন। বিষয়টি তিনি ক্যাফের কর্মীদের জানান এবং পরে বসার জায়গাও বদলে নেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, ওই ঘটনার ভিডিয়ো চশমায় থাকা ক্যামেরায় ধারণ করা হচ্ছে।
পরে সেই ভিডিয়ো অনলাইনে প্রকাশিত হলে তা কয়েক লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায় বলে অভিযোগ। বিদ্রুপমূলক মন্তব্যের কারণে তিনি অপমানিত ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হন বলেও নোটিসে দাবি করা হয়েছে। ইনস্টাগ্রামে অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও প্রতিকার মেলেনি—এমন অভিযোগও রয়েছে।
চশমায় আসলে কী আছে?
রে-ব্যান মেটা স্মার্ট গ্লাসকে শুধু ক্যামেরাযুক্ত চশমা বললে অবশ্য কম বলা হয়। এতে রয়েছে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, ক্ষুদ্র স্পিকার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহায়তা। ফোন হাতে না নিয়েই ছবি ও ভিডিয়ো তোলা, গান শোনা, ফোনে কথা বলা কিংবা কণ্ঠস্বরের নির্দেশে বিভিন্ন কাজ করা যায়।
মেটার তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রজন্মের মডেলে ১২ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা রয়েছে, যা উচ্চমানের ছবি এবং ৩কে মানের ভিডিয়ো ধারণ করতে পারে। ব্যাটারি সম্পূর্ণ চার্জে সর্বাধিক আট ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে, যদিও প্রকৃত সময় ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী বদলাবে। চশমা ব্যবহারের জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ স্মার্টফোন, মেটার অ্যাপ এবং মেটা অ্যাকাউন্টও প্রয়োজন।
তবে সব মডেলের বৈশিষ্ট্য এক নয়। তাই একটি সংস্করণের সুবিধা অন্য সব মডেলের ক্ষেত্রেও রয়েছে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
সবচেয়ে বড় পার্থক্য—চোখে পড়ে না
সাধারণ স্মার্টফোন দিয়ে কেউ ছবি তুললে বিষয়টি বোঝা তুলনামূলক সহজ। ফোন বের করা, ক্যামেরা তাক করা—সবকিছুর মধ্যেই একটি দৃশ্যমান সংকেত থাকে। স্মার্ট চশমার ক্ষেত্রে সেই দৃশ্যমানতা অনেকটাই কম।
ব্যবহারকারী শুধু সামনে তাকিয়েই ছবি বা ভিডিয়ো ধারণ করতে পারেন। ফলে স্বাভাবিক কথোপকথনের মধ্যেই ক্যামেরা চালু হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাই গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে।
ক্যামেরা চলছে কি না বুঝবেন কী ভাবে?
চশমার সামনের ছোট সাদা নির্দেশক আলোটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মেটার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্থিরচিত্র তোলার সময় আলোটি অল্প সময়ের জন্য জ্বলে ওঠে। ভিডিয়ো ধারণের সময় তা জ্বলতে থাকে। আশপাশের মানুষকে ক্যামেরা সক্রিয় থাকার সংকেত দেওয়াই এই আলোর উদ্দেশ্য।
মেটার দাবি, এই নির্দেশক আলো বন্ধ করার সাধারণ কোনও সুইচ নেই। আলো ঢেকে দেওয়া বা ক্যামেরার সঙ্গে কারসাজির চেষ্টা শনাক্ত হলে ক্যামেরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার মতো সুরক্ষাব্যবস্থাও রয়েছে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—ছবি তোলা আর সঙ্গে সঙ্গে তা প্রকাশ্যে চলে যাওয়া এক কথা নয়। মেটার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবহারকারী প্রথমে চশমায় ছবি বা ভিডিয়ো ধারণ করেন, পরে তা ফোনে স্থানান্তর করেন এবং কোথায় বা কার সঙ্গে সেটি শেয়ার করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেন।
তবু এখানেই প্রশ্ন থেকে যায়: সংকেত দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই সংকেত কি সামনে থাকা প্রত্যেক মানুষ বুঝতে পারছেন?
গোপনীয়তার ঝুঁকি কোথায়?
ডিজিটাল অধিকার সংগঠন ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন সতর্ক করেছে, সাধারণ চশমার মতো দেখতে হওয়ায় ক্যামেরাযুক্ত এই ধরনের যন্ত্র আশপাশের মানুষের নজর এড়িয়ে যেতে পারে। অনিচ্ছাকৃত ভাবে ধারণ হয়ে যেতে পারে ফোনের গোপন নম্বর, ব্যাঙ্কের তথ্য বা ব্যক্তিগত কোনও পরিস্থিতিও।
অর্থাৎ ঝুঁকি শুধু ইচ্ছাকৃত গোপন রেকর্ডিংয়ে নয়। অসাবধানতাতেও ব্যক্তিগত তথ্য ক্যামেরাবন্দি হয়ে যেতে পারে।
সন্দেহ হলে কী করবেন?
পরিস্থিতি নিরাপদ থাকলে প্রথমেই সরাসরি জানতে চাওয়া যায়, ছবি বা ভিডিয়ো ধারণ করা হচ্ছে কি না। নিজের আপত্তিও স্পষ্ট ভাবে জানানো যেতে পারে। ক্যাফে, দোকান বা কর্মস্থলের মতো জায়গায় প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের সাহায্য নেওয়া যায়।
তবে কারও চশমা কেড়ে নেওয়া বা শারীরিক ভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা না করাই নিরাপদ।
নিজের আপত্তিকর কোনও ছবি বা ভিডিয়ো অনলাইনে দেখতে পেলে প্রমাণ সংরক্ষণ করাও জরুরি। ভিডিয়োর লিঙ্ক, অ্যাকাউন্টের নাম, প্রকাশের সময়, মন্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পোস্টের স্ক্রিনশট রেখে দিলে পরে অভিযোগ জানানো সহজ হয়। একই সঙ্গে কী নিয়ে আপত্তি—অজান্তে ধারণ, হয়রানি, অপমান, হুমকি না কি ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ—সেটিও স্পষ্ট করে জানানো উচিত।
তবে ক্যামেরাযুক্ত চশমার প্রতিটি ব্যবহারকে হয়রানি হিসেবেও দেখা যায় না। ভ্রমণের দৃশ্য ধারণ করা, নিজের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা রেকর্ড করা কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া এক বিষয়; আর কাউকে তাঁর অজান্তে ধারণ করে তা দিয়ে জনপ্রিয়তা বা প্রচার পাওয়ার চেষ্টা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়।
খান মার্কেটের ঘটনাটি তাই শুধু একটি ভিডিয়ো নিয়ে বিতর্ক নয়। ক্যামেরা যখন ফোনের মতো হাতে ধরা যন্ত্র না থেকে পোশাকেরই অংশ হয়ে যায়, তখন ‘ক্যামেরা চলছে’ বোঝানোর সংকেত কতটা কার্যকর এবং অন্যের সম্মতি কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে—সেই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চশমার ছোট্ট আলো হয়তো প্রযুক্তিগত সতর্কবার্তা দিতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীরই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



