ক্যানসারের বিরুদ্ধে বড় জয়, দামে ধাক্কা

যা জানা জরুরি
- অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন আশার খবর।
- মুখে খাওয়ার ওষুধ ‘রাসনকিউ’-এর পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় রোগীদের বেঁচে থাকার মধ্যম সময় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
- কিন্তু সেই সাফল্যের সঙ্গেই সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন—এই চিকিৎসা কতটা নাগালের মধ্যে?
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় নতুন আশার খবর। মুখে খাওয়ার ওষুধ ‘রাসনকিউ’-এর পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় রোগীদের বেঁচে থাকার মধ্যম সময় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু সেই সাফল্যের সঙ্গেই সামনে এসেছে বড় প্রশ্ন—এই চিকিৎসা কতটা নাগালের মধ্যে?
কারণ আমেরিকায় ওষুধটির ঘোষিত বার্ষিক দাম ৪ লক্ষ ৭৭ হাজার ৬০০ ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় কয়েক কোটি টাকা। অর্থাৎ চিকিৎসাবিজ্ঞানে বড় অগ্রগতি এলেও তার নাগাল পাওয়ার পথে অর্থই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় বাধা।
ওষুধটির মূল নাম ডারাক্সনরাসিব। প্রস্তুতকারক মার্কিন সংস্থা রেভলিউশন মেডিসিনস। আমেরিকার খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ ২৬ আগস্ট ওষুধটির অনুমোদন দিয়েছে। তবে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত সব রোগীর জন্য এই অনুমোদন প্রযোজ্য নয়।
যাঁদের অগ্ন্যাশয়ের অ্যাডেনোকার্সিনোমা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং যাঁরা আগে অন্তত এক দফা চিকিৎসা নিয়েছেন, তাঁদের নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর জন্য এই ওষুধ অনুমোদিত হয়েছে। বিশেষত, একাধিক ওষুধের সম্মিলিত চিকিৎসা নেওয়ার উপযুক্ত নন—এমন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যাবে।
পরীক্ষায় কতটা সাফল্য?
অনুমোদনের ভিত্তি ‘রাসোলিউট ৩০২’ নামে তৃতীয় পর্যায়ের একটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা। আগে চিকিৎসা নেওয়া এবং শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত ৫০০ জন রোগী এতে অংশ নেন।
দৈবচয়নের মাধ্যমে ২৪৮ জনকে ডারাক্সনরাসিব এবং ২৫২ জনকে প্রচলিত কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। ফলাফলে দেখা যায়, নতুন ওষুধ পাওয়া রোগীদের বেঁচে থাকার মধ্যম সময় ছিল ১৩.২ মাস। কেমোথেরাপি পাওয়া দলের ক্ষেত্রে তা ছিল ৬.৭ মাস।
এখানে ‘মধ্যম সময়’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক রোগীর আয়ু দ্বিগুণ হবে। বরং সংশ্লিষ্ট দলের অর্ধেক রোগী ওই সময়ের বেশি এবং অর্ধেক তার কম সময় বেঁচেছিলেন। ওষুধটি ক্যানসার সারিয়ে দেবে—এমন নিশ্চয়তাও এই ফল দেয় না।
তবে দুই দলের মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় মাসের ব্যবধান অগ্ন্যাশয়ের মতো কঠিন ক্যানসারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
শুধু বেঁচে থাকার সময় নয়, রোগের অগ্রগতিও নতুন ওষুধে তুলনামূলক ভাবে বেশি সময় থেমে ছিল। ডারাক্সনরাসিব পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে রোগ না-বাড়ার মধ্যম সময় ছিল ৭.২ মাস, যেখানে কেমোথেরাপি পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে তা ৩.৬ মাস।
পর্যবেক্ষণকালে মৃত্যুর আপেক্ষিক ঝুঁকির পরিসংখ্যানগত পরিমাপও প্রায় ৬০ শতাংশ কম ছিল। তবে এর অর্থ ৬০ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গিয়েছেন—এমন নয়। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ।
ক্যানসার কোষকে থামায় কী ভাবে?
ডারাক্সনরাসিবের লক্ষ্য ‘রাস’ পরিবারের প্রোটিন। স্বাভাবিক অবস্থায় এই প্রোটিন কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজনের সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে। প্রয়োজনমতো রাস সক্রিয় হয় এবং পরে আবার নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ফিরে যায়।
কিন্তু নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তনের ফলে এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিগড়ে যেতে পারে। তখন কোষকে বাড়তে ও বিভাজিত হতে বলা সংকেত কার্যত আটকে যায় ‘চালু’ অবস্থায়। অগ্ন্যাশয়ের সবচেয়ে প্রচলিত ধরনের ক্যানসারের প্রায় ৯২ শতাংশে রাস-সংক্রান্ত পরিবর্তন পাওয়া যায়।
ডারাক্সনরাসিব এই অতিসক্রিয় সংকেত ব্যবস্থাতেই আঘাত করে। প্রথমে ওষুধটি কোষের ভিতরে থাকা সাইক্লোফিলিন এ নামের একটি প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়। পরে এই জুটি সক্রিয় রাসের সঙ্গে মিলে একটি ত্রিমাত্রিক গঠন তৈরি করে। এর ফলে রাস আর পরবর্তী প্রোটিনগুলিকে কোষের বৃদ্ধির নির্দেশ পাঠাতে পারে না।
সহজ ভাষায়, ক্যানসার কোষকে ক্রমাগত বাড়তে বলছে যে ‘সিগন্যাল’, ওষুধটি সেই বার্তার পথেই বাধা তৈরি করে।
বড়ি মানেই ঝুঁকিমুক্ত নয়
প্রতিদিন মুখে খেতে হয়—এটি ওষুধটির অন্যতম সুবিধা। কিন্তু বড়ি বলে এটিকে হালকা বা ঝুঁকিহীন চিকিৎসা ভাবার কারণ নেই।
এফডিএ ত্বক ও নরম কলার ক্ষতি, মুখে প্রদাহ, ডায়ারিয়া, পরিপাকনালিতে ছিদ্র এবং ফুসফুসে প্রদাহের মতো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে। গর্ভস্থ শিশুর ক্ষতির আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে ওষুধের মাত্রা বদলানো বা চিকিৎসা বন্ধ করার সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে।
প্রস্তুতকারকের দাবি, পরীক্ষায় প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় ডারাক্সনরাসিবের সহনশীলতা অনুকূল ছিল এবং রোগীদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার ক্ষেত্রেও সুবিধা দেখা গিয়েছে। তবে প্রতিটি রোগীর শরীর চিকিৎসায় একই ভাবে সাড়া দেয় না। শুধু রোগী কত দিন বাঁচছেন তা নয়, সেই সময়টা কতটা স্বস্তিতে কাটছে—সেটিও চিকিৎসার সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
আশার দাম কত?
নতুন ওষুধের কার্যকারিতার খবর যতটা আশাব্যঞ্জক, দাম ততটাই চোখ কপালে তোলার মতো।
আমেরিকায় ৩০ দিনের ডারাক্সনরাসিবের ঘোষিত দাম ৩৯,৮০০ ডলার। অর্থাৎ ১২ মাসে ঘোষিত মূল্য দাঁড়ায় ৪,৭৭,৬০০ ডলার। তবে এটি তালিকাভুক্ত দাম। বিমা, ছাড়, আর্থিক সহায়তা এবং রোগীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতির পরে নিজের পকেট থেকে কত টাকা দিতে হবে, তা আলাদা হতে পারে। চিকিৎসা কত দিন চলবে, তার উপরও মোট ব্যয় নির্ভর করবে।
প্রস্তুতকারক সংস্থা বিমা সংক্রান্ত সহায়তা, আর্থিক সাহায্য এবং চিকিৎসা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার কর্মসূচির কথা জানিয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধা বাস্তবে কত মানুষের কাছে পৌঁছবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
কারণ নতুন ওষুধ আবিষ্কার করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্য। কিন্তু সেই ওষুধ রোগীর নাগালের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরও একটি বড় পরীক্ষা।
ভারতের ক্ষেত্রেও একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। প্রস্তুতকারকের ২৬ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, ডারাক্সনরাসিব তখন কেবল আমেরিকাতেই অনুমোদিত ছিল। তাই মার্কিন এফডিএ-র অনুমোদনকে ভারতে ওষুধটির অনুমোদন বা সহজলভ্যতার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না।
অতএব, এই খবরটি অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন দরজা খোলার গল্প—সর্বজনীন নিরাময়ের ঘোষণা নয়। এখন আসল পরীক্ষা হবে দীর্ঘমেয়াদি ফল, নিরাপদ ব্যবহার এবং সবচেয়ে বড় কথা—এই আশার চিকিৎসা কতটা মানুষের নাগালে পৌঁছতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



