রোগ বদলায় সমাজও

যা জানা জরুরি
- কিন্তু রোগের প্রভাব কি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের চেম্বারের দরজাতেই থেমে যায়?
- রোগ মানুষের শরীরের পাশাপাশি বদলে দিতে পারে তার কাজ, বিশ্বাস, কেনাকাটা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—এমনকি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণাও।
- ইতিহাসবিদ সুসান ওয়াইজ বাউয়ারের নতুন বই ‘দ্য গ্রেট শ্যাডো’ সেই বিস্তৃত ইতিহাসেরই অনুসন্ধান।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
অসুখ হলে আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই। কিন্তু রোগের প্রভাব কি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের চেম্বারের দরজাতেই থেমে যায়? ইতিহাস বলে, একেবারেই নয়। রোগ মানুষের শরীরের পাশাপাশি বদলে দিতে পারে তার কাজ, বিশ্বাস, কেনাকাটা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—এমনকি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণাও। ইতিহাসবিদ সুসান ওয়াইজ বাউয়ারের নতুন বই ‘দ্য গ্রেট শ্যাডো’ সেই বিস্তৃত ইতিহাসেরই অনুসন্ধান। সভ্যতার পরিচিত কাহিনিকে তিনি দেখেছেন মানুষের অসুস্থ হওয়া, ভয় পাওয়া এবং সুস্থ থাকার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
বইটি নিয়ে আলোচনা করেছে হিন্দুস্থান টাইমস। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—‘তৃতীয় রোগতাত্ত্বিক রূপান্তর’। কিছু গবেষকের মতে, আমরা এমন এক সময়ে পৌঁছেছি যখন নতুন রোগ অপরিচিত ভৌগোলিক অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, আবার একসময় কোনও অঞ্চল থেকে নির্মূল হয়ে যাওয়া রোগও ফিরে আসছে। দ্রুত আন্তর্জাতিক যাতায়াত, বিশ্ববাণিজ্য, ঘনবসতি, জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধ ক্ষমতা, টিকাবিরোধিতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন এই নতুন বাস্তবতার পটভূমি তৈরি করছে।
একে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা হিসেবে দেখলে ছবির অর্ধেকই দেখা হয়। মানুষ বিপদ কী ভাবে বোঝে, কাকে বিশ্বাস করে, নিরাপত্তার জন্য কার দিকে তাকায়—রোগ সেই প্রশ্নগুলিকেও সামনে আনে। সংক্রমণ তাই শুধু শরীরের নয়, আস্থারও পরীক্ষা। একজনের অসুস্থতা খুব দ্রুত পরিবারের উদ্বেগে, কর্মক্ষেত্রের সমস্যায় এবং বৃহত্তর সমাজের টানাপোড়েনে পরিণত হতে পারে।
বাউয়ারের প্রকাশিত উদ্ধৃতাংশে শরীরকে দেখা হয়েছে অন্তর্জগৎ ও বাইরের পৃথিবীর সংযোগস্থল হিসেবে। সুস্থ থাকলে শরীরের অস্তিত্ব প্রায় ভুলেই যাই আমরা। চিন্তা, আবেগ বা বিশ্বাসকে মনে হয় শরীরের বাইরে স্বাধীন কোনও জগৎ। কিন্তু হঠাৎ জ্বর, ব্যথা কিংবা দুর্বলতা সেই ধারণা ভেঙে দেয়। গতকাল যে ভবিষ্যৎকে নিশ্চিত মনে হয়েছিল, অসুস্থতার পর সেটিই হয়ে ওঠে অনিশ্চিত।
এই অনুভূতির শিকড় যে কত পুরনো, তা বোঝাতে বাউয়ার ফিরে গিয়েছেন প্রাচীন কাহিনিতেও। গিলগামেশের সঙ্গী এনকিদুর অসুস্থতা এক দুর্ধর্ষ বীরকেও অসহায় করে দেয়। সেখানে রোগ নিছক শারীরিক বিপর্যয় নয়; বরং নিজের ক্ষমতার সীমা প্রথমবার উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতা। কেন বিপদ আসে? কেন তা ঠেকানো যায় না? কী করলে মানুষ নিরাপদ থাকবে? অসুস্থতা যুগে যুগে এই একই প্রশ্নগুলিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
বইটির প্রকাশকের বর্ণনা অনুযায়ী, বাউয়ার তাঁর দীর্ঘ ঐতিহাসিক গবেষণার সঙ্গে个人িক বিবরণও ব্যবহার করেছেন। প্রাচীন যুগ থেকে সাম্প্রতিক অতীত পর্যন্ত অসুস্থ মানুষের অভিজ্ঞতাই তাঁর অনুসন্ধানের কেন্দ্রে। আর সেখান থেকেই উঠে আসে আপাত বিচিত্র কিছু সম্পর্ক—সুস্থ থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে শুরু করে ঘরের মেঝে পরিষ্কার রাখা কিংবা বাতাস সুগন্ধি করার পণ্য ব্যবহারের মতো দৈনন্দিন অভ্যাসও কী ভাবে রোগ সম্পর্কে মানুষের ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছে।
কৃষি, পশুপালন এবং স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠার ইতিহাসও তাই রোগের ইতিহাস থেকে আলাদা নয়। মানুষ যত বেশি এক জায়গায় বসতি গড়েছে, যত ঘনিষ্ঠ হয়েছে, তত বড় হয়েছে পারস্পরিক সংযোগের জাল। গ্রামের তুলনায় শহরে একজন মানুষ অনেক বেশি মানুষের সংস্পর্শে আসে। সভ্যতার এই ঘনিষ্ঠতা যেমন বাণিজ্য, জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়েছে, তেমনই সংক্রমণের জন্যও খুলে দিয়েছে নতুন দরজা।
তবে বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মানুষের ভয় এবং বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেওয়া। টিকা প্রত্যাখ্যানকারী, অভিবাসীদের রোগের বাহক মনে করা মানুষ কিংবা মহামারির সময়ে কেবল দৈব সুরক্ষার উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের কাছে শুধু পরিসংখ্যান বা বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরলেই যে তাঁদের মনোভাব বদলাবে, তা নয়। তাঁদের বিশ্বাস কোথা থেকে তৈরি হয়েছে, অতীতের অভিজ্ঞতা কী এবং ভয়টি আসলে কোথায়—সেটিও বোঝা দরকার। অর্থাৎ, জনস্বাস্থ্যের লড়াইয়ে বিজ্ঞানের পাশাপাশি সহমর্মিতারও প্রয়োজন রয়েছে।
এখানেই রোগের ইতিহাস একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় আমাদের: সুস্থ থাকা কি নিছক ব্যক্তিগত অর্জন, নাকি একটি সম্মিলিত ব্যবস্থার ফল?
একজন অসুস্থ মানুষকে সাহায্য করার বদলে যদি সমাজ তাঁকেই দায়ী করে, তাঁর যন্ত্রণা যেমন বাড়ে, তেমনই দুর্বল হয় পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত। রোগ নিয়ে আমরা কী ভাষা ব্যবহার করছি, অসুস্থ মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করছি—তাই নিছক সৌজন্যের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সমাজের সংকট মোকাবিলার ক্ষমতাও।
বাউয়ারের কাজের আলোয় রোগের ইতিহাস পড়া আসলে মানুষের অনিশ্চয়তার ইতিহাস পড়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের অভূতপূর্ব ক্ষমতা দিয়েছে, কিন্তু বিপন্নতার অভিজ্ঞতাকে পৃথিবী থেকে মুছে দিতে পারেনি।
আগামী দিনের মহামারি বা নতুন রোগের মোকাবিলায় তাই শুধু আরও ওষুধ, টিকা বা হাসপাতালই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য জ্ঞান, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং একে অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধ।
কারণ সুস্থ থাকা ব্যক্তিগত স্বস্তি হতে পারে, কিন্তু সুস্থ থাকার নিরাপদ পৃথিবী কখনও একার হাতে তৈরি হয় না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



