‘আরএসএস হিন্দুদের প্রতিনিধি নয়’, নিউ ইয়র্কে ভাগবতের সভা ঘিরে তীব্র বিতর্ক

যা জানা জরুরি
- নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবতের সভা ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
- আমেরিকাভিত্তিক হিন্দু, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নাগরিক অধিকার রক্ষাকারী মোট ৬১টি সংগঠন সভাটির বিরোধিতা করে খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে।
- তাদের বক্তব্য, আরএসএস কিংবা তার হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ আমেরিকায় বসবাসকারী সমস্ত হিন্দুর প্রতিনিধিত্ব করে না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবতের সভা ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমেরিকাভিত্তিক হিন্দু, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নাগরিক অধিকার রক্ষাকারী মোট ৬১টি সংগঠন সভাটির বিরোধিতা করে খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে। তাদের বক্তব্য, আরএসএস কিংবা তার হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ আমেরিকায় বসবাসকারী সমস্ত হিন্দুর প্রতিনিধিত্ব করে না।
২৯ আগস্ট ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের ইনফোসিস থিয়েটারে ‘ইউনিভার্সাল ওয়াননেস সেলিব্রেশন’ বা ‘বিশ্বজনীন একাত্মতা উদ্যাপন’ নামে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আমেরিকান হিন্দুজ ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ বা ‘এহেড’। আয়োজকদের দাবি, বিভিন্ন হিন্দু-আমেরিকান সংগঠনের সমর্থনে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশের উদ্দেশ্য অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা দেওয়া। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের সমাবেশ হওয়ার কথা।
কিন্তু বক্তা হিসেবে ভাগবতের উপস্থিতির বিরোধিতা করেছে ‘হিন্দুজ ফর হিউম্যান রাইটস’। সংগঠনের কার্যনির্বাহী পরিচালক সুনীতা বিশ্বনাথ জানিয়েছেন, ৬১টি আন্তধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠন একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করে সভার প্রতিবাদ জানিয়েছে। শনিবার তাদের বহু সমর্থক অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে উপস্থিত হবেন। তাঁদের বার্তা হবে—‘আরএসএস এবং তাদের হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।’
হিন্দুজ ফর হিউম্যান রাইটসের উপ-কার্যনির্বাহী পরিচালক শ্রাব্য তাদেপল্লির অভিযোগ, মোহন ভাগবত হিন্দুদের প্রতিনিধি নন; তিনি এমন একটি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসা, বর্জন ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা নিয়েছে। মঙ্গলবার নিউইয়র্কের সিটি হলের বাইরে সাংবাদিক বৈঠক করে সভাটি বাতিল করার দাবি জানায় হিন্দুজ ফর হিউম্যান রাইটস, ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিল এবং ইন্টারফেইথ সেন্টার অব নিউইয়র্ক-সহ কয়েকটি সংগঠন।
বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। শহরের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং প্রথম মুসলিম মেয়র মামদানি বলেছেন, তিনি এই সমাবেশ সমর্থন করেন না। তবে এটি বেসরকারি অনুষ্ঠান হওয়ায় নিউইয়র্ক পুরসভার সেটি বাতিল করার আইনি এক্তিয়ার আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছেন।
মামদানির কথায়, তাঁর পরিবার তাঁকে যে ভারতের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে, তা বহুত্ববাদী সমাজ ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের ভারত—যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও সমান আপনত্ব স্বীকৃত। সেই জায়গায় কোনও দেশের ‘বর্জনমূলক ধারণা’র উপর প্রতিষ্ঠিত আন্দোলনের উত্থান অত্যন্ত উদ্বেগের। তাই এমন আন্দোলনের তিনি গভীর বিরোধী।
প্রতিবাদের আবহে হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন অনুষ্ঠানটিতে যোগ দিতে যাওয়া মানুষদের জন্য নিরাপত্তা-পরামর্শ জারি করেছে। সংগঠনটি উপস্থিত ব্যক্তিদের সতর্ক থাকতে, চারপাশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হতে এবং বিরোধীদের সঙ্গে কথাবার্তায় সংযম বজায় রাখতে বলেছে। উস্কানিমূলক মন্তব্য হলেও সংঘর্ষে না জড়িয়ে নিরাপত্তাকর্মী বা পুলিশের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মেয়র মামদানির কাছে সভায় যোগদানকারীদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছে সংগঠনটি।
হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের অভিযোগ, কিছু আন্দোলনকারী অনুষ্ঠানটি ব্যাহত অথবা বাতিল করানোর চেষ্টা করছেন। তবে সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে, প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের অধিকারকেও সম্মান জানাতে হবে। ফলে একই হিন্দু-আমেরিকান সমাজের মধ্যে ভাগবতের সফর নিয়ে গভীর মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে—এক পক্ষ আরএসএসকে হিন্দু সমাজের সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরছে, অন্য পক্ষ বলছে, হিন্দুত্ব একটি রাজনৈতিক মতবাদ এবং তাকে হিন্দুধর্মের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না।
এরই মধ্যে আমেরিকার আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশন ভাগবতের সফর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিশনের চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ আরএসএসের সদস্য এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনে জড়িত ভারতীয় আধিকারিকদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ, এমনকি ভাগবতের ভিসা প্রত্যাহার বিবেচনা করার জন্য আমেরিকা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তবে কমিশনের সুপারিশ বাধ্যতামূলক নয় এবং ওয়াশিংটন এখনও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। ভারত এর আগে কমিশনের পর্যবেক্ষণকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
আরএসএসও সংখ্যালঘুবিরোধী অসহিষ্ণুতার অভিযোগ অস্বীকার করে। সংগঠনটির বক্তব্য, তারা হিন্দুকেন্দ্রিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি আন্দোলন, যার লক্ষ্য হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং ভারতকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেওয়া। ফলে ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের সভা এখন আর নিছক প্রবাসী ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নেই; আমেরিকার মাটিতে হিন্দু পরিচয়, হিন্দুত্বের রাজনীতি এবং ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্র নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



