বাংলাস্ফিয়ার: মাথাব্যথার ইতিহাস যত পুরোনো, মাইগ্রেনকে বোঝার ইতিহাসও ততটাই দীর্ঘ আর ততটাই বিভ্রান্তিকর। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ মাইগ্রেনের কারণ খুঁজেছে, কিন্তু সঠিক উত্তর পায়নি। প্রাচীন মিশরের চিকিৎসা-সংক্রান্ত দলিল এবার্স প্যাপিরাস (খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০)–এ ‘মাথার এক পাশের অসুখ’-এর উল্লেখ রয়েছে। সেখানে চিকিৎসা হিসেবে মাথার ত্বকে ভাজা ক্যাটফিশ মাছের প্রলেপ লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় শতাব্দীর বিখ্যাত রোমান চিকিৎসক গ্যালেন, যাঁর ব্যবহৃত হেমিক্রানিয়া  শব্দ থেকেই পরে ‘মাইগ্রেন’ শব্দের জন্ম, তিনি আবার রক্ত বের করে দেওয়া বা ব্লাডলেটিং-কেই সমাধান মনে করতেন।

সময়ের সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞান এগোলেও মাইগ্রেন সম্পর্কে ভুল ধারণা দীর্ঘদিন টিকে ছিল। বিংশ শতাব্দীর বড় অংশে চিকিৎসকদের একাংশ মনে করতেন, দমিয়ে রাখা আবেগ বা মানসিক দুর্বলতা থেকেই মাইগ্রেন হয়। যেহেতু মেয়েরা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি মাইগ্রেনে আক্রান্ত হন, তাই তাঁদের ‘অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ’ বা ‘স্নায়বিকভাবে দুর্বল’ বলেও ব্যাখ্যা করা হতো। এমনকি মাত্র দুই দশক আগেও বহু মেডিক্যাল কলেজে শেখানো হতো তথাকথিত ‘ভাসকুলার তত্ত্ব’ অর্থাৎ মস্তিষ্কের রক্তনালি প্রসারিত ও সংকুচিত হওয়ার ফলেই মাইগ্রেন হয়।

কিন্তু গত এক দশকে সেই ধারণা আমূল বদলে গেছে। বিজ্ঞানীরা এখন অনেক স্পষ্টভাবে জানেন, মাইগ্রেন আসলে কী, কেন হয় এবং কীভাবে এর চিকিৎসা করা যায়। একই সঙ্গে এসেছে এমন কিছু ওষুধ, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনার বাইরে ছিল। তবে একটি সমস্যা এখনও রয়ে গেছে—মাইগ্রেনে আক্রান্ত মানুষদের প্রতি সমাজের সহানুভূতির অভাব।

মাথাব্যথা মানেই মাইগ্রেন নয়

সব ধরনের মাথাব্যথা এক রকম নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান মাথাব্যথাকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করে।

প্রাথমিক (Primary) মাথাব্যথা—যেখানে মাথাব্যথার পেছনে কোনও কাঠামোগত রোগ নেই। মাইগ্রেন, টেনশন হেডেক এবং ক্লাস্টার হেডেক এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

দ্বিতীয় ধরণের) মাথাব্যথা—যেখানে মাথাব্যথা অন্য কোনও রোগের লক্ষণ। যেমন স্ট্রোক, মেনিনজাইটিস, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, টিউমার বা অন্য গুরুতর সমস্যা।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অতিরিক্ত মদ্যপানের পর যে হ্যাংওভারজনিত মাথাব্যথা হয়, তা দ্বিতীয় ধরণের। কিন্তু ক্লাস্টার হেডেক—যা অল্প পরিমাণ অ্যালকোহলেও মুহূর্তের মধ্যে শুরু হতে পারে তা প্রাথমিক মাথাব্যথা।

মাইগ্রেনও প্রাথমিক মাথাব্যথা। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই রোগী ও চিকিৎসক উভয়েই একে অন্য ধরনের মাথাব্যথা ভেবে ভুল করেন। ফলে সঠিক চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়।

ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব হেডেক-এর চেয়ার এবং বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞান অধ্যাপক আলেকজান্দ্রা সিনক্লেয়ারের মতে, একজন রোগীর ক্ষেত্রে মাইগ্রেন শনাক্ত করার সবচেয়ে বড় উপায় হল তার উপসর্গের ধরন।

সাধারণত মাঝারি থেকে তীব্র ব্যথা, আলো ও শব্দ সহ্য করতে না পারা, শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করা, বমি বমি ভাব, শরীর না নাড়াতে চাওয়া এবং প্রায়ই মাথার এক পাশে ধুকপুক করা ব্যথা—এই উপসর্গগুলি থাকলে সেটি মাইগ্রেন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আসলে কী হয় মস্তিষ্কের ভেতরে?

আজকের গবেষণা বলছে, মাইগ্রেনের মূল উৎস ট্রাইজেমিনোভাসকুলার সিস্টেম নামে পরিচিত একটি স্নায়ু ও রক্তনালির জটিল নেটওয়ার্ক।

এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ট্রাইজেমিনাল নার্ভ, যা মুখমণ্ডল ও মাথার সবচেয়ে বড় সংবেদনশীল স্নায়ু। স্পর্শ, ব্যথা, তাপমাত্রা অনুভব করা থেকে শুরু করে চোয়াল নাড়ানোর মতো কাজও এই স্নায়ু নিয়ন্ত্রণ করে।

যখন এই ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক সক্রিয়তা তৈরি হয়, তখন স্নায়ুকোষ থেকে সিজিআরপি (Calcitonin Gene-Related Peptide বা CGRP) নামে একটি রাসায়নিক বেরিয়ে আসে। এই রাসায়নিক মস্তিষ্কের ব্যথা-সংক্রান্ত নেটওয়ার্ককে সক্রিয় করে এবং তীব্র মাথাব্যথা সৃষ্টি করে।

অর্থাৎ, মাইগ্রেনের আসল সমস্যা রক্তনালির নয়; এটি মূলত স্নায়ুতন্ত্রের একটি জৈবিক ব্যাধি।

মাইগ্রেনের চারটি ধাপ

অনেকেই ভাবেন, মাইগ্রেন মানেই হঠাৎ মাথাব্যথা শুরু হওয়া। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল।

মাইগ্রেন সাধারণত চারটি ধাপে এগোয়।

প্রথম ধাপ: প্রড্রোম বা সতর্কবার্তা: মাথাব্যথা শুরু হওয়ার ২৪ ঘণ্টা আগেই শরীর নানা সংকেত দিতে পারে। অস্বাভাবিক হাই তোলা, বারবার প্রস্রাবের বেগ, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা হঠাৎ বিশেষ কোনও খাবার, যেমন চকলেট বা চিজ খেতে ইচ্ছা করা এর লক্ষণ হতে পারে।

একসময় মনে করা হতো, চকলেট বা চিজ খাওয়ার কারণেই মাইগ্রেন হয়। এখন মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, উল্টোটা সত্যি। মাইগ্রেন শুরু হওয়ার আগেই মস্তিষ্কের কিছু অংশ সক্রিয় হয়ে এমন খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে। অর্থাৎ খাবার মাইগ্রেনের কারণ নয়; মাইগ্রেনই সেই খাবারের ইচ্ছা তৈরি করে।

দ্বিতীয় ধাপ: অরা (Aura): প্রায় ৩০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়। চোখের সামনে ঝিলমিল করা আলো, দৃষ্টিক্ষেত্রে কালো দাগ, হাত-পা বা মুখে ঝিনঝিনি, এমনকি সাময়িকভাবে কথা বলতে অসুবিধাও হতে পারে।

তৃতীয় ধাপ: মূল মাইগ্রেন: চার ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই সময় তীব্র মাথাব্যথার পাশাপাশি বমি, আলো-শব্দে অস্বস্তি, গন্ধে সংবেদনশীলতা এবং দৈনন্দিন কাজ করার অক্ষমতা দেখা দেয়।

চতুর্থ ধাপ: পোস্টড্রোম: ব্যথা কমে যাওয়ার পরও এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত শরীর ভেঙে থাকা, ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব এবং মানসিক অবসাদ অনুভূত হতে পারে।

কেন মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা রয়ে গেল?

একটি কৌতূহলজনক প্রশ্ন হল—এত কষ্টদায়ক একটি রোগের প্রবণতা বিবর্তনের পথে কেন হারিয়ে গেল না?

কিছু গবেষকের মতে, মস্তিষ্কে কোনও গুরুতর সমস্যা, যেমন সংক্রমণ, আঘাত বা টিউমার হলে মাথাব্যথা শরীরকে সতর্ক করে দেয়। তাই ব্যথা অনুভব করার এই ব্যবস্থা বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আরও একটি মত বলছে, প্রাচীন মানবসমাজে যাঁদের আলো, শব্দ বা নড়াচড়ার প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা ছিল, তাঁরা হয়তো বিপদ দ্রুত টের পেতেন। সেই কারণেই এমন জিন প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকতে পারে।

কেন মহিলাদের মধ্যে বেশি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, মাইগ্রেন পৃথিবীর সবচেয়ে অক্ষমতাজনক রোগগুলির অন্যতম। বিশেষ করে কৈশোর থেকে মেনোপজ পর্যন্ত সময়ে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।

মেয়েরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে আক্রান্ত হন। এর পেছনে রয়েছে হরমোনের ওঠানামা, ব্যথা-সংক্রান্ত রাসায়নিকের প্রতি মস্তিষ্কের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া এবং জিনগত কারণ।

অনেক রোগীর ক্ষেত্রে মাসের অর্ধেকেরও বেশি সময় স্বাভাবিকভাবে কাজ করা সম্ভব হয় না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে মাইগ্রেনকে ‘সামান্য মাথাব্যথা’ বলে অবহেলা করা হয়েছে। ফলে চিকিৎসাও পিছিয়ে থেকেছে।

কী কী বিষয় মাইগ্রেন বাড়ায়?

সব ক্ষেত্রে একই কারণ কাজ না করলেও কয়েকটি বিষয় মাইগ্রেনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

  • পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া বা অতিরিক্ত ঘুম।
  • হঠাৎ ক্যাফেইন বন্ধ করে দেওয়া।
  • শরীরে জলের ঘাটতি।
  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ।
  • হরমোনের পরিবর্তন।

মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। আলো মাইগ্রেনের সময় অসহ্য লাগলেও, দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহার করলেই মাইগ্রেন হবে এমন প্রমাণ এখনও নিশ্চিত নয়।

চিকিৎসায় এসেছে নতুন যুগ

মাইগ্রেন গবেষণার সবচেয়ে বড় অগ্রগতি এসেছে সিজিআরপি আবিষ্কারের পর।

এখন এমন একদল ওষুধ রয়েছে, যাদের বলা হয় গেপান্টস (Gepants)। এগুলি মুখে খাওয়া ট্যাবলেট, যা সিজিআরপি রিসেপ্টরকে আটকে দিয়ে ব্যথার সংকেত কমিয়ে দেয়।

আরও রয়েছে সিজিআরপি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি, বা সংক্ষেপে ম্যাবস (MAbs)। সাধারণত মাসে একবার ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়। এগুলি মাইগ্রেন প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর বলে সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত চার-পাঁচ বছরে এই নতুন ওষুধগুলি মাইগ্রেন চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।

তবে সমস্যা হল, এই চিকিৎসা এখনও ব্যয়বহুল এবং বহু দেশে সহজলভ্য নয়। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, সহজ প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা এবং রোগীদের সচেতনতা—সবই বাড়ানো জরুরি।

‘মাথাব্যথা’ নয়, গুরুত্ব পাওয়ার সময় এসেছে

মাইগ্রেন কোনও দুর্বল মানসিকতার লক্ষণ নয়, কোনও কল্পিত অসুখও নয়। এটি মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রের একটি জটিল জৈবিক রোগ, যার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখন অনেকটাই স্পষ্ট।

হাজার বছর আগে মানুষ ভাজা মাছের প্রলেপ লাগাত, পরে রক্ত বের করে চিকিৎসা করত, আবার কখনও রোগীর চরিত্রকেই দোষ দেওয়া হতো। আজ বিজ্ঞান জানাচ্ছে, সমস্যার উৎস আসলে স্নায়ুতন্ত্রের নির্দিষ্ট রাসায়নিক ও স্নায়বিক প্রক্রিয়া। সেই জ্ঞান থেকেই এসেছে লক্ষ্যভিত্তিক নতুন চিকিৎসা।

অর্থাৎ, মাইগ্রেনের যন্ত্রণা হয়তো এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি, কিন্তু অন্তত এটুকু নিশ্চিত যে এখন আর এটিকে ‘স্রেফ মাথাব্যথা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।