ভারতের রাজনীতিতে উত্তরপ্রদেশের গুরুত্ব শুধু তার বিপুল জনসংখ্যা বা ৪০৩ আসনের বিধানসভার জন্য নয়। দেশের বৃহত্তম এই রাজ্যটি দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে এসেছে। সেই কারণেই ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে নিছক একটি রাজ্যের ক্ষমতা দখলের লড়াই হিসেবে দেখা যাবে না। সাম্প্রতিক জেন জি আন্দোলনের পর এটিই হতে চলেছে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষা।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির অপ্রত্যাশিত ধাক্কা, তরুণদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং অখিলেশ যাদবের ‘পিডিএ’ কৌশল রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। তবে বিজেপির শক্তিশালী সংগঠন, বিপুল সম্পদ এবং মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নিজস্ব জনপ্রিয়তা বিবেচনায় রাখলে ২০২৭-এর লড়াই অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

২০২৪-এর ধাক্কা

২০১৪ এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশ ছিল বিজেপির জাতীয় সাফল্যের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু ২০২৪ সালে সেই সমীকরণ বড় ধাক্কা খায়। রাজ্যের ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে সমাজবাদী পার্টি ৩৭টি এবং কংগ্রেস ছ’টি আসন জেতে। বিপরীতে বিজেপি নেমে আসে ৩৩টি আসনে। শরিকদের নিয়ে এনডিএ পায় ৩৬টি আসন, আর ইন্ডিয়া জোট ৪৩টি।

ভোটের ব্যবধানও ছিল অত্যন্ত সামান্য। এনডিএ পেয়েছিল প্রায় ৪৩.৬৯ শতাংশ এবং ইন্ডিয়া জোট ৪৩.৫২ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ দুই শিবিরের মধ্যে ব্যবধান ছিল এক শতাংশেরও অনেক কম। এই ফল দেখিয়ে দেয়, উত্তরপ্রদেশে বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্য আর প্রশ্নাতীত নয়।

তবে ২০২৪ সালের ফল থেকেই বিজেপির পতন অনিবার্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ভুল হবে। লোকসভা নির্বাচনের পরে অনুষ্ঠিত একাধিক বিধানসভা নির্বাচন ও উপনির্বাচনে বিজেপি এবং তার সহযোগীরা রাজনৈতিক জমি পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা দেখিয়েছে। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্ণায়ক জয়ও তার নির্বাচনী প্রত্যাবর্তনের ক্ষমতার বড় প্রমাণ। উত্তরপ্রদেশেও ২০২৪ সালের বিধানসভা উপনির্বাচনগুলিতে দলটি তুলনামূলক ভাবে ভাল ফল করে বুঝিয়ে দিয়েছিল, তার সাংগঠনিক ভিত্তি এখনও অটুট।

তরুণ ভোটারের ক্ষোভ

২০২৭ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে উত্তরপ্রদেশের বিপুল তরুণ ভোটার সমাজ। নির্বাচন কমিশনের ‘অ্যাটলাস ২০২৪’ অনুসারে, ২০২৪ সালের ২০ মে পর্যন্ত রাজ্যের মোট ভোটারের ২১.১৯ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন ভোটারের মধ্যে অন্তত একজন তরুণ। এই অংশের অবস্থান বদলে গেলে বহু আসনের ফল উল্টে যেতে পারে।

সাম্প্রতিক জেন জি আন্দোলন দেখিয়েছে যে কর্মসংস্থান, নিয়োগ পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষার মান এবং আর্থিক সুযোগের মতো বিষয়গুলি তরুণদের রাজনৈতিক ভাবে সংগঠিত করতে পারে। এই সমস্যাগুলি জাতপাত ও দলীয় আনুগত্যের পুরনো বিভাজনও কিছু ক্ষেত্রে অতিক্রম করতে সক্ষম।

উত্তরপ্রদেশে সরকারি চাকরির পরীক্ষার অনিয়ম, নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা এবং বেকারত্ব নিয়ে ক্ষোভ নতুন নয়। কিন্তু আগে সেই অসন্তোষ বিচ্ছিন্ন পরীক্ষার্থী বা চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন সামাজিক মাধ্যম এবং বিভিন্ন ছাত্র-যুব মঞ্চের মাধ্যমে তা দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক ভাষা পাচ্ছে। আন্দোলনরত তরুণেরা নিজেদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বঞ্চিত নাগরিক হিসেবেও দেখতে শুরু করলে শাসক দলের পক্ষে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে।

অখিলেশ যাদব এই অসন্তোষকে কতটা সমাজবাদী পার্টির পক্ষে নিয়ে যেতে পারবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন। শুধু সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেই বিরোধী দলের পক্ষে ভোট পড়ে না। তরুণদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প কর্মসংস্থান নীতি, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা এবং পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখা হাজির করতে হবে।

পিডিএ কৌশলের আসল পরীক্ষা

তরুণদের ক্ষোভকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি অখিলেশের বড় পরীক্ষা তাঁর ‘পিডিএ’—পিছড়া, দলিত ও সংখ্যালঘু—কৌশল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর এই সামাজিক জোট সমাজবাদী পার্টির রাজনীতির কেন্দ্রীয় ভিত্তি হয়ে উঠেছে।

২০২৭ সালে পিডিএ-র সাফল্য শুধু মুসলিম ও যাদব ভোট সংহত রাখার উপর নির্ভর করবে না। এই দুই সম্প্রদায় বহু বছর ধরেই সমাজবাদী পার্টির মূল ভোটভিত্তি। আসল চ্যালেঞ্জ হল, অখিলেশ অ-যাদব অনগ্রসর শ্রেণি এবং দলিতদের কতটা বোঝাতে পারবেন যে সমাজবাদী পার্টিই তাঁদের স্বার্থের প্রকৃত রাজনৈতিক ঠিকানা।

এখানেই নির্বাচনী অঙ্ক জটিল হয়ে ওঠে। অ-যাদব অনগ্রসর শ্রেণি কোনও একক সামাজিক গোষ্ঠী নয়। এর মধ্যে কুর্মি, মৌর্য, শাক্য, কুশওয়াহা, লোধ, সাইনি-সহ বহু সম্প্রদায় রয়েছে। তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক নেতৃত্ব, সামাজিক দাবি এবং রাজনৈতিক আনুগত্যও আলাদা।

দলিত ভোটারদের মধ্যেও একই রকম বৈচিত্র্য রয়েছে। জাটভ, পাশি, কোরি এবং অন্য দলিত জনগোষ্ঠীর ভোট একই দিকে যায় না। বিজেপি গত এক দশকে কল্যাণমূলক প্রকল্প, সামাজিক প্রতিনিধিত্ব এবং হিন্দুত্বের বৃহত্তর পরিচয়ের মাধ্যমে এই দুই সামাজিক অংশের উল্লেখযোগ্য সমর্থন অর্জন করেছে।

বসপার পতন কার লাভ

বহুজন সমাজ পার্টির নির্বাচনী শক্তি কমলেও উত্তরপ্রদেশের দলিত রাজনীতিতে তার উপস্থিতি এখনও উপেক্ষা করার মতো নয়। ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র একটি আসন জিতলেও দলটি প্রায় ১২.৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তা কমে প্রায় ৯.৪ শতাংশ হয় এবং দলটি কোনও আসন পায়নি।

বসপার দুর্বলতার ফলে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই ভোট স্বয়ংক্রিয় ভাবে সমাজবাদী পার্টির কাছে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। জাটভ ভোটের একটি অংশ এখনও মায়াবতীর প্রতি অনুগত। অন্য অংশ বিজেপি, সমাজবাদী পার্টি কিংবা চন্দ্রশেখর আজাদের আজাদ সমাজ পার্টির দিকে যেতে পারে। দলিত ভোটের সবচেয়ে বড় অংশ কে পাবে, তা ২০২৭ সালের ফল নির্ধারণের অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন দেখিয়েছিল, সমাজবাদী পার্টির সামাজিক ভিত্তি যাদব-মুসলিম সমীকরণের বাইরে সম্প্রসারিত হওয়া সম্ভব। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের সাফল্য বিধানসভায় পুনরাবৃত্তি করতে হলে তিন বছর ধরে সংগঠন ধরে রাখতে হবে। আসন ধরে ধরে উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন, অ-যাদব অনগ্রসর ও দলিত নেতাদের দৃশ্যমান প্রতিনিধিত্ব এবং স্থানীয় স্তরে দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি।

বিজেপি এখনও দুর্ধর্ষ নির্বাচনী শক্তি

তরুণদের ক্ষোভ, পিডিএ কৌশলের সাফল্য এবং সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষায় দুই প্রধান শিবিরের ব্যবধান কমে আসা—কোনওটাই প্রমাণ করে না যে বিজেপি দুর্বল অবস্থায় ২০২৭ সালের নির্বাচনে নামবে।

বিজেপি এখনও ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী যন্ত্রগুলির একটি। বুথ স্তর পর্যন্ত তার বিস্তৃত সংগঠন, অনুগত কর্মীবাহিনী, বিপুল আর্থিক সামর্থ্য, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সহায়তা এবং নির্বাচনী আখ্যান নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা রয়েছে। বিরোধীদের সামাজিক জোটে দুর্বলতা দেখা দিলে বা প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হলে বিজেপি দ্রুত তার সুবিধা নিতে পারে।

এর সঙ্গে রয়েছে যোগী আদিত্যনাথের ব্যক্তিগত আবেদন। আইনশৃঙ্খলা, ধর্মীয় পরিচয়, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং উন্নয়নের মিশ্র আখ্যানের উপর তাঁর রাজনীতি দাঁড়িয়ে। তাঁর সমর্থকদের কাছে ‘বুলডোজার’ কঠোর প্রশাসনের প্রতীক; সমালোচকদের কাছে তা বাছাই করা দমননীতি। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই যোগী উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র উপস্থিতি।

অখিলেশের সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা

অখিলেশ যাদবের পক্ষে পরিস্থিতি এক দশক আগের তুলনায় অনুকূল। তিনি এখন শুধু যাদব-মুসলিম দলের নেতা নন; ২০২৪ সালের সাফল্য তাঁকে বৃহত্তর সামাজিক জোটের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে তুলে ধরেছে। কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়াও উচ্চবর্ণ, দলিত ও শহুরে ভোটারের একটি অংশের কাছে ইন্ডিয়া জোটের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।

তবে কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টির আসন-বণ্টন, স্থানীয় নেতৃত্বের সংঘাত এবং ভোট স্থানান্তরের কার্যকারিতা গুরুত্বপূর্ণ হবে। লোকসভায় সীমিত আসনে সমঝোতা করা অপেক্ষাকৃত সহজ; ৪০৩টি বিধানসভা আসনে দলীয় আকাঙ্ক্ষা সামলানো অনেক কঠিন।

সব মিলিয়ে, ২০২৭-এর উত্তরপ্রদেশ নির্বাচন কোনও একমুখী ঢেউয়ের নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম। বিজেপির সামনে তরুণদের অসন্তোষ ও সামাজিক জোটে ক্ষয়ের বিপদ রয়েছে। অখিলেশের সামনে সেই ক্ষোভকে স্থায়ী রাজনৈতিক সমর্থনে বদলে দেওয়ার কঠিন কাজ। অতএব, উত্তরপ্রদেশ শুধু বিজেপির জনপ্রিয়তার পরীক্ষা নয়; বিরোধীরা ক্ষোভকে বিকল্পে পরিণত করতে পারে কি না, তারও নির্ণায়ক পরীক্ষা। জেন জি আন্দোলনের পর ভারতের নির্বাচনী রাজনীতির প্রথম বৃহৎ উত্তর সম্ভবত এই রাজ্যই দেবে।