হাইলাইটস:

  • প্রায় ১০০০ কোটি বছর আগে ‘গাইয়া সসেজ’ নামে পরিচিত একটি বামন ছায়াপথের সঙ্গে আকাশগঙ্গার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
  • গবেষকদের সুপারকম্পিউটার-ভিত্তিক মডেল বলছে, সেই সংঘর্ষে আকাশগঙ্গার চাকতি ৯০ ডিগ্রিরও বেশি কাত হয়ে বর্তমান অবস্থানে আসে।
  • এই সংঘর্ষেই আকাশগঙ্গার কেন্দ্রের স্ফীত অংশ (বাল্জ) ও তারকামণ্ডলীয় হ্যালোর বর্তমান গঠন অনেকটাই নির্ধারিত হয়েছে বলে ধারণা।

বাংলাস্ফিয়ার: প্রায় ১০০০ কোটি বছর আগে একটি বিশাল মহাজাগতিক সংঘর্ষে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথ (মিল্কিওয়ে) প্রায় পাশ ফিরে গিয়েছিল বলে নতুন গবেষণায় দাবি করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, ‘গাইয়া সসেজ’ নামে পরিচিত একটি বামন ছায়াপথ সরাসরি আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে আঘাত হানার পরই এই নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।

যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সুপারকম্পিউটারে তৈরি মহাজাগতিক মডেল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এই মুখোমুখি সংঘর্ষে আকাশগঙ্গার চাকতির (ডিস্ক) অবস্থান ৯০ ডিগ্রিরও বেশি ঘুরে যায়। তবে এই পরিবর্তন মুহূর্তে নয়, কয়েকশো কোটি বছরের পরিবর্তে কয়েকশো মিলিয়ন বছর—অর্থাৎ কয়েকশো মিলিয়ন বছরের ধীর প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়।

গবেষণার প্রধান কিরিল বাত্রাকভ বলেন, এই ধরনের ‘ডিস্ক ফ্লিপ’ বা চাকতির অবস্থান বদল ঘটতে অন্তত কয়েকশো মিলিয়ন বছর লেগে থাকতে পারে।

গবেষকেরা মূলত আকাশগঙ্গার ‘তারকামণ্ডলীয় হ্যালো’ বা বাইরের বিস্তৃত গোলাকার অঞ্চলের তারাগুলির অস্বাভাবিক ধীর গতির কারণ অনুসন্ধান করছিলেন। এই হ্যালোতে থাকা অধিকাংশ তারাই আসলে ছোট ছোট ছায়াপথ থেকে এসেছে, যেগুলি অতীতে আকাশগঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ‘গাইয়া’ উপগ্রহের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আকাশগঙ্গার চাকতির তারাগুলি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২২০ কিলোমিটার বেগে ছায়াপথের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু হ্যালোর তারাগুলির গতি অনেক কম—গড়ে প্রতি সেকেন্ডে মাত্র ২৫ কিলোমিটার।

এই পার্থক্যের কারণ জানতে গবেষকেরা আকাশগঙ্গার মতো ছায়াপথের বিবর্তনের একাধিক কম্পিউটার-ভিত্তিক মডেল তৈরি করেন। সেখানে দেখা যায়, গাইয়া সসেজের মতো আকারের একটি বামন ছায়াপথ যদি সরাসরি ধাক্কা মারে, তাহলে সংঘর্ষের পর চাকতির অবস্থান বদলে যেতে পারে এবং হ্যালোর তারাগুলির ঘূর্ণনও অনেক ধীর হয়ে পড়ে।

গবেষণার ফলাফল এ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমি মিটিংয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

‘গাইয়া সসেজ’-এর অস্তিত্ব প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০১৮ সালে। তখন গাইয়া মহাকাশ অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, আকাশগঙ্গার কিছু তারা অস্বাভাবিক দীর্ঘায়িত, সসেজের মতো কক্ষপথে ঘুরছে। সেই অদ্ভুত কক্ষপথ থেকেই বোঝা যায়, বহু আগে একটি বামন ছায়াপথ সরাসরি আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে ঢুকে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। সেই কারণেই তার নাম দেওয়া হয় ‘গাইয়া সসেজ’।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে আকাশগঙ্গার ইতিহাসে শেষ বড় সংযুক্তিকরণ (মেজর মার্জার) এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলির একটি বলে মনে করেন। এই সংঘর্ষই ছায়াপথের কেন্দ্রীয় স্ফীত অংশ বা ‘বাল্জ’ গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে এবং হ্যালোর বর্তমান কাঠামোও অনেকাংশে নির্ধারণ করেছে।

‘বামন ছায়াপথ’ বলা হলেও গাইয়া সসেজে নক্ষত্র, গ্যাস এবং অদৃশ্য পদার্থ (ডার্ক ম্যাটার) মিলিয়ে সূর্যের ভরের ১,০০০ কোটিরও বেশি সমপরিমাণ পদার্থ ছিল।

ভবিষ্যতে আকাশগঙ্গার পরবর্তী বড় সংঘর্ষ ঘটতে পারে আরও কয়েকশো কোটি বছর পরে, যখন নিকটবর্তী ‘লার্জ ম্যাজেলানিক ক্লাউড’ আকাশগঙ্গার সঙ্গে একীভূত হবে। তবে বর্তমানে ‘স্যাজিটেরিয়াস’ বামন ছায়াপথের সঙ্গে যে ধীরগতির সংযুক্তিকরণ চলছে, তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে অনেক কম হবে বলে গবেষকদের ধারণা। কারণ গাইয়া সসেজের তুলনায় স্যাজিটেরিয়াস অনেক ছোট, আর অতীতের তুলনায় আকাশগঙ্গাও এখন অনেক বেশি বৃহৎ ও শক্তিশালী।