সৌরঝড়ের আগে জ্বলে ওঠে ‘সতর্কবাতি’

যা জানা জরুরি
- সূর্যে বড়সড় বিস্ফোরণ ঘটার আগেই কি তার আভাস মেলে?
- ভারতের আদিত্য-এল১ অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন এমনই এক চমকপ্রদ ইঙ্গিত।
- বড় সৌরশিখা বা সোলার ফ্লেয়ার আছড়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টা আগে সূর্যের বায়ুমণ্ডলে দেখা দেয় অসংখ্য ক্ষণস্থায়ী উজ্জ্বল বিন্দু।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সূর্যে বড়সড় বিস্ফোরণ ঘটার আগেই কি তার আভাস মেলে? ভারতের আদিত্য-এল১ অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন এমনই এক চমকপ্রদ ইঙ্গিত। বড় সৌরশিখা বা সোলার ফ্লেয়ার আছড়ে পড়ার কয়েক ঘণ্টা আগে সূর্যের বায়ুমণ্ডলে দেখা দেয় অসংখ্য ক্ষণস্থায়ী উজ্জ্বল বিন্দু। পরে যে অঞ্চল থেকে শক্তিশালী সৌরশিখার বিস্ফোরণ ঘটে, তার আশপাশেই যেন জড়ো হতে থাকে ছোট ছোট এই আলোর ঝলক।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ক্ষণস্থায়ী উজ্জ্বলতাই ভবিষ্যতে সৌরশিখার সম্ভাব্য পূর্বসংকেত হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
গবেষণাটি করেছেন মণিপাল সেন্টার ফর ন্যাচারাল সায়েন্সেস এবং মণিপাল অ্যাকাডেমি অব হায়ার এডুকেশনের গবেষকেরা। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো, মহাকাশ বিভাগ এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘মান্থলি নোটিসেস অব দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’ পত্রিকায়।
গবেষকেরা ২০২৪ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে ঘটে যাওয়া সাতটি মাঝারি থেকে অতি শক্তিশালী সৌরশিখার ঠিক আগের দুই ঘণ্টার কার্যকলাপ খুঁটিয়ে দেখেন। সেই পর্যবেক্ষণে তাঁরা শনাক্ত করেন মোট ১০২টি ছোট ও স্বল্পস্থায়ী উজ্জ্বলতার ঘটনা।
চমকটা এখানেই। অধিকাংশ আলোর ঝলক দেখা গিয়েছে সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্রের বিপরীত মেরুর বিভাজনরেখার কাছাকাছি। শুধু তা-ই নয়, যে সক্রিয় অঞ্চল থেকে পরে মূল সৌরশিখাটি তৈরি হয়েছে, তার আশপাশেও এই ক্ষুদ্র আলোর ঝলক তুলনামূলক ভাবে বেশি দেখা গিয়েছে।
এই নজরদারিতে আদিত্য-এল১-এর তিনটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। সোলার আলট্রাভায়োলেট ইমেজিং টেলিস্কোপ বা ‘সুট’ সূর্যের আলোকমণ্ডল ও বর্ণমণ্ডলের অতিবেগুনি ছবি তুলেছে। বিশেষ করে ম্যাগনেশিয়াম-২ এইচ তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ক্ষণস্থায়ী উজ্জ্বলতাগুলি বেশ স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়ে।
অন্য দিকে, সোলার লো এনার্জি এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার বা ‘সোলেক্স’ এবং হাই এনার্জি এল১ অরবিটিং এক্স-রে স্পেকট্রোমিটার বা ‘হেলিওস’ সূর্যের বহির্বায়ুমণ্ডল থেকে আসা এক্স-রে বিকিরণ পরিমাপ করেছে।
কয়েকটি ক্ষুদ্র উজ্জ্বলতার সময় এক্স-রে বিকিরণেও মিল পাওয়া গিয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এর অর্থ ওই মুহূর্তগুলিতে সূর্যের নিম্ন ও ঊর্ধ্ব বায়ুমণ্ডলে ছোট ছোট চৌম্বকশক্তি-মুক্তির ঘটনা ঘটছিল। এই ধরনের শক্তিমুক্তি বারবার ঘটতে থাকলে সক্রিয় অঞ্চলের চৌম্বকক্ষেত্র ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আর সেই অস্থিতিশীলতার চূড়ান্ত পরিণতিই হতে পারে বড় সৌরশিখা।
তবে বিজ্ঞানীরা এখনই এই আবিষ্কারকে সৌরশিখার নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়ার পদ্ধতি বলে দাবি করছেন না। কারণ গবেষণাটি মাত্র সাতটি সৌরশিখার ঘটনা নিয়ে করা হয়েছে। আরও বেশি সংখ্যক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে, প্রতিবারই কি বড় বিস্ফোরণের আগে একই ধরনের ক্ষুদ্র উজ্জ্বলতা দেখা যায় কি না।
তার পরেও এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কম নয়। কারণ শক্তিশালী সৌরশিখা শুধু সূর্যের ঘটনাই নয়, তার প্রভাব পৌঁছে যেতে পারে পৃথিবী পর্যন্ত। স্যাটেলাইট, বেতার যোগাযোগ, জিপিএস ও অন্যান্য দিকনির্ণয় ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ সঞ্চালন পরিকাঠামো এবং মহাকাশচারীদের নিরাপত্তা—সবই তীব্র সৌরঝড়ের ধাক্কায় বিপন্ন হতে পারে।
তাই বিস্ফোরণের আগে সূর্যের বুকে যদি সত্যিই এমন ‘সতর্কবাতি’ জ্বলে ওঠে, তা শনাক্ত করতে পারা ভবিষ্যতের মহাকাশ-আবহাওয়া পূর্বাভাসে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আর সেই সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের আদিত্য-এল১ এখন গুরুত্বপূর্ণ এক নজরদারি কেন্দ্র—সূর্যের দিকে তাকিয়ে, সূর্যেরই ভাষায় লেখা বিপদের আগাম বার্তা পড়ার চেষ্টা করছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



