গল্পই খুঁজে নেয় সাংবাদিককে

যা জানা জরুরি
- সাংবাদিকতার সেরা গল্প সব সময় পরিকল্পনা করে খুঁজে নিতে হয় না।
- কখনও একটি পুরনো দরজা, অচেনা কোনও পথ কিংবা সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত মানুষই হঠাৎ খুলে দেয় গল্পের দরজা।
- ‘দ্য হিন্দু’-র সাংবাদিক শ্রীনিবাসনের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এমনই তিনটি আকস্মিক আবিষ্কারের কথা—যেখানে অনুসন্ধানের চেয়ে কৌতূহলই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সাংবাদিকতার সেরা গল্প সব সময় পরিকল্পনা করে খুঁজে নিতে হয় না। কখনও একটি পুরনো দরজা, অচেনা কোনও পথ কিংবা সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত মানুষই হঠাৎ খুলে দেয় গল্পের দরজা। ‘দ্য হিন্দু’-র সাংবাদিক শ্রীনিবাসনের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এমনই তিনটি আকস্মিক আবিষ্কারের কথা—যেখানে অনুসন্ধানের চেয়ে কৌতূহলই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
প্রথম গল্পের কেন্দ্রে সুপারস্টার রজনীকান্ত। ১৯৭৫ সালে কে বালচন্দরের ‘অপূর্ব রাগাঙ্গাল’ ছবির হাত ধরে তামিল সিনেমায় অভিষেক হয়েছিল তাঁর। ছবির একটি দৃশ্যে নবাগত রজনীকান্তকে একটি দরজা ঠেলে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে দেখা যায়। তখন কে জানত, সেই দরজা পেরিয়েই ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রবেশ করতে চলেছেন ভবিষ্যতের এক মহাতারকা!
প্রায় পাঁচ দশক পরে সেই দৃশ্যের বাড়িটিই খুঁজে বের করার নেশা চাপে সাংবাদিকের মাথায়। প্রবীণ কয়েকজন বাসিন্দার দেওয়া সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত চেন্নাইয়ের আডিয়ারের এক নিরিবিলি গলিতে পৌঁছে যান তিনি। দরজাটি বদলে গিয়েছে, কিন্তু বাড়িটি প্রায় একই রকম রয়ে গিয়েছে—যেন ১৯৭৫-এর সেই দৃশ্যটি সময়ের পাতায় আটকে আছে।
বাড়ির মালিকদের অনুমতি নিয়ে সেখানেই তৈরি হয় এক অভিনব পুনর্নির্মাণ। রজনীকান্তের মতো দরজা ঠেলে একই জায়গা দিয়ে ভিতরে ঢোকার ভঙ্গি নকল করেন সাংবাদিক। কিন্তু আসল গল্পটি তখনও তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় উলটো দিকে একটি ছোট দরজা চোখে পড়ে। দেখে মনে হচ্ছিল, কোনও পরিত্যক্ত বাগানের প্রবেশপথ। কৌতূহল সামলাতে না পেরে ভিতরে ঢুকতেই চমক। আডিয়ার নদীর ধার ঘেঁষে বিস্তৃত এক শান্ত, সবুজ পদচারণপথ—শহরের কোলাহল থেকে যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য আলাদা এক পৃথিবী।
চার দশকেরও বেশি সময় চেন্নাইয়ে থেকেও এমন জায়গার কথা আগে জানতেন না সাংবাদিক। পরে প্রিয়জনদেরও সেখানে নিয়ে যান। জায়গাটি নিয়ে লেখেনও, তবে অতিরিক্ত ভিড়ের আশঙ্কায় সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেননি। রজনীকান্তের প্রথম ছবির বাড়ি খুঁজতে গিয়ে এভাবেই আবিষ্কার হয়ে গেল শহরেরই এক লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য।
দ্বিতীয় গল্পটির শুরু আরও সাধারণ ভাবে—এক অলস রবিবারে, মেয়ের আবদারে মেরিনা সৈকতে গিয়ে। সেখানে হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। সারা শরীরে রুপোলি রং মেখে এক ব্যক্তি মহাত্মা গান্ধীর বেশে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মাঝেমধ্যে শিশুদের দিকে হাত নাড়ছেন। সামনে রাখা দানের বাক্সের পাশে আবার পোশাকে সাঁটা রয়েছে ডিজিটাল পেমেন্টের সংকেতচিহ্ন।
দৃশ্যটি দেখে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন সাংবাদিক। ভাষার সমস্যা পেরিয়ে কয়েক দিনের চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত খোঁজ মেলে ওই ব্যক্তির। বাড়ি তেলঙ্গানার খাম্মামে।
কেন এমন সাজে দিনের পর দিন সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি?
উত্তরটিও কম চমকপ্রদ নয়। তাঁর আক্ষেপ, দেশের মানুষ ধীরে ধীরে গান্ধীকে ভুলে যাচ্ছে। তাই গান্ধীর সাজে দাঁড়িয়ে তিনি মানুষকে জাতির জনকের কথা মনে করিয়ে দিতে চান। পাশাপাশি এই কাজ থেকে পাওয়া অর্থ জমাচ্ছেন মেয়ের বিয়ের জন্য।
আর একটি গল্পের সন্ধান মিলেছিল বারাণসীর অসি ঘাটে। হাঁটতে হাঁটতে সাংবাদিকের চোখে পড়ে কুস্তিগিরদের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। সেখানে তরুণ-তরুণীরা শরীরচর্চা করছেন, শক্তি বাড়ানোর অনুশীলন করছেন এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য কুস্তির তালিম নিচ্ছেন। শহরের চেনা পর্যটন-ছবির আড়ালে থাকা অন্য এক বারাণসী যেন সেখানেই ধরা দেয়।
তিনটি গল্পের প্রেক্ষাপট আলাদা। একজন চলচ্চিত্র তারকার প্রথম পা রাখার বাড়ি, শহরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক সবুজ পথ, সমুদ্রসৈকতে গান্ধীর বেশে দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা মানুষ কিংবা ঘাটের পাশে কুস্তির আখড়া—সবকিছুর মধ্যে যোগসূত্র একটাই: কৌতূহল।
সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই শুধু তথ্য নয়, চারপাশকে নতুন করে দেখার চোখ। পূর্বনির্ধারিত গল্পের বাইরে তাকানোর অভ্যাস। কারণ সংবাদ কখনও কখনও প্রেস রিলিজ, ফোনকল বা সাক্ষাৎকারের ভিতরে অপেক্ষা করে না। সে লুকিয়ে থাকে একটি দরজার ওপারে, কোনও অচেনা গলিতে, কিংবা ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত মানুষের শরীরে।
সাংবাদিককে সব সময় গল্পের পিছনে ছুটতে হয় না।
কখনও কখনও গল্পই সাংবাদিককে খুঁজে নেয়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



