Home সংস্কৃতি ও বিনোদন প্রেম, শরীর, নাকি ভ্রম? ‘ওয়ারি ডল’-এর অস্বস্তিকর জাদু

প্রেম, শরীর, নাকি ভ্রম? ‘ওয়ারি ডল’-এর অস্বস্তিকর জাদু

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
17 views 6 minutes read
A+A-
Reset

 

হাইলাইটস

  • লরা ম্যাকফি-ব্রাউনের তৃতীয় উপন্যাস ‘Worry Doll’
  • দুই নারীর প্রেমকে দেখানো হয়েছে দুই বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে।
  • উপন্যাসে সত্য কখনও স্পষ্ট নয়, পাঠককেই তৈরি করতে হয় নিজের ব্যাখ্যা।
  • শরীর, ক্ষুধা, যৌনতা ও স্মৃতিকে একই বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
  • প্রেমের চেয়ে বেশি, এটি আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপ্রবঞ্চনার মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান।

একটি সাধারণ চিকেন স্যান্ডউইচ দিয়েই শুরু হয় ‘Worry Doll’-এর জগৎ। রোস্ট চিকেন, ঝাঁঝালো চিজ আর টাটকা টমেটোয় ভরা সেই স্যান্ডউইচের জন্য এক চরিত্রের আকুলতা এতটাই জীবন্ত যে পড়তে পড়তেই পাঠকের নিজেরও ক্ষুধা পেতে পারে। এই ক্ষুধা কেবল খাবারের নয়; এটি স্পর্শের, ভালোবাসার, পূর্ণতার—আর সেই সূক্ষ্ম অনুভূতিকেই অসাধারণ সংবেদনশীলতায় ধরেছেন লেখিকা লরা ম্যাকফি-ব্রাউন

‘Worry Doll’ তাঁর তৃতীয় উপন্যাস। উপর থেকে দেখলে এটি দুই নারীর প্রেমের গল্প—হেলোইসলেসি। ট্রেনে আকস্মিক পরিচয়, তারপর দ্রুত ঘনিষ্ঠতা, এবং ধীরে ধীরে এক সর্বগ্রাসী সম্পর্ক। কিন্তু কয়েক পাতা পড়লেই বোঝা যায়, এটি কোনও প্রচলিত প্রেমের উপন্যাস নয়। বরং এটি স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতা এবং আত্মপ্রবঞ্চনার এক জটিল মানসিক মানচিত্র।

সত্য কোথায়? উত্তর দেয় না উপন্যাস

উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নির্মাণে। হেলোইস ও লেসি—দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা অধ্যায়ে উঠে আসে। ফলে কোনও ঘটনাই একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। পাঠক যেন দুই বিপরীত স্মৃতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকেন, যেখানে প্রতিটি বক্তব্যই আংশিক, প্রতিটি স্মৃতিই প্রশ্নসাপেক্ষ।

সাধারণত সম্পর্কভিত্তিক উপন্যাসে পাঠক জানতে চান—কে ঠিক, কে ভুল? কিন্তু ‘Worry Doll’ সেই আরাম দেয় না। বরং অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়েই পাঠককে সম্পর্কের ভাঙাগড়া বুঝতে হয়। এই অনিশ্চয়তাই বইটিকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে।

স্থির জীবনের ভিতেও ফাটল

প্রথমে পরিচয় হয় হেলোইসের সঙ্গে। দীর্ঘ আট বছরের সম্পর্কে রয়েছেন তিনি। সঙ্গী আর্নির সঙ্গে রয়েছে নিরাপদ জীবন—চাকরি, সুন্দর বাড়ি, বন্ধুবান্ধব, আদরের বিড়াল, সাজানো সংসার।

তবু কোথাও যেন সবকিছু অসম্পূর্ণ।

তিনি বুঝতে শুরু করেন, চাকরিতে তিনি অপরিহার্য নন, বাড়িটি তাঁর নিজের নয়, এমনকি যে জীবনকে তিনি নিজের বলে মনে করেন, সেটিও হয়তো অন্য কারও তৈরি। ঠিক সেই সময়েই তাঁর জীবনে আসে লেসি।

হেলোইস লেসিকে দীর্ঘ, আবেগে ভরা বার্তা পাঠান। উত্তরে আসে ছোট, প্রায় নিরাসক্ত উত্তর। সম্পর্কের ভার যেন একতরফা। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

ক্ষমতা কার হাতে?

প্রথম নজরে মনে হয় লেসিই সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু উপন্যাস যত এগোয়, সেই ধারণা ভেঙে যায়।

লেসির আছে যৌবনের তীব্রতা, অনিশ্চয়তার আকর্ষণ। অন্যদিকে হেলোইসের আছে আর্থিক স্বাধীনতা, ভাষা এবং নিজের গল্প বলার ক্ষমতা। প্রথমার্ধে পাঠক লেসিকে দেখেন শুধুই হেলোইসের চোখ দিয়ে। পরে যখন লেসির নিজের কণ্ঠ সামনে আসে, তখন গোটা সম্পর্কের অর্থই বদলে যায়।

এই নির্মাণই উপন্যাসকে মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের আবহ দেয়। কে শিকার, কে শিকারি—শেষ পর্যন্ত তার কোনও সহজ উত্তর মেলে না।

যখন প্রেম শরীর দখল করে

হেলোইসের আকাঙ্ক্ষা কেবল মানসিক নয়; তা শরীরেও ছাপ ফেলে।

তিনি বারবার জিনিস হারিয়ে ফেলেন—ব্যাগ, ক্রেডিট কার্ড, বাজারের থলে। এটি কি প্রেমের উন্মত্ততা, নাকি গভীর কোনও মানসিক সংকট? লেখিকা ইচ্ছাকৃতভাবেই সেই প্রশ্নের উত্তর দেন না।

বরং দেখান, প্রবল আকাঙ্ক্ষা মানুষকে কত সহজে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।

শরীরকে রোম্যান্সের বাইরে এনে দাঁড় করায় ‘Worry Doll’

উপন্যাসটির সবচেয়ে সাহসী দিক সম্ভবত শরীরের উপস্থাপন।

এখানে শরীর শুধু প্রেম বা যৌনতার বাহন নয়। এটি ক্ষুধার্ত হয়, ব্যথা পায়, রক্তক্ষরণ করে, বমি করে, ঘামে, দুর্গন্ধ ছড়ায়। প্রেম, কামনা, খাবার, ঋতুস্রাব, অসুস্থতা—সবকিছুকেই একই বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

ফলে উপন্যাসটি যেমন সংবেদনশীল, তেমনই অস্বস্তিকর। আর ঠিক সেই অস্বস্তিই পাঠককে চরিত্রগুলির আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়।

প্রেম নয়, আত্মপ্রবঞ্চনার গল্প

‘Worry Doll’ শেষ পর্যন্ত কোনও নিখুঁত প্রেমের গল্প নয়। এটি এমন এক উপন্যাস, যা প্রশ্ন তোলে—আমরা কি সত্যিই অন্য কাউকে ভালোবাসি, নাকি নিজের ইচ্ছার প্রতিচ্ছবিকেই ভালোবাসি?

মানুষ প্রায়ই বিশ্বাস করতে চায়, তার অনুভূতি পারস্পরিক। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় তেমন নয়। সেই ভুল বিশ্বাস, সেই আত্মপ্রবঞ্চনাই কখনও কখনও সবচেয়ে বড় মানসিক ভয়ের জন্ম দেয়।

এক সমালোচক লিখেছেন, এক রাতের অনিদ্রায় তিনি পুরো বইটি পড়ে শেষ করেছিলেন। সকালে ঘুম ভেঙে তাঁর প্রথম অনুভূতি ছিল তীব্র ক্ষুধা।

সম্ভবত এটাই ‘Worry Doll’-এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। বইটি পড়া শেষ হলেও তার অনুভূতি শরীর ছেড়ে যায় না। এটি পাঠককে নতুন করে ভাবায়—নিজের ইচ্ছা, নিজের স্মৃতি এবং নিজের অপূর্ণতার মুখোমুখি হওয়া কি সত্যিই এত সহজ?

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles