Home খবর যুদ্ধের বাজিতে ট্রাম্প?

যুদ্ধের বাজিতে ট্রাম্প?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
23 views 6 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • যুদ্ধবিরতির এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে ফের হামলার নির্দেশ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
  • বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপাকে ফেলতে পারে।
  • সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে স্থলযুদ্ধে গড়ানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।
  • হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
  • বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক ঘাটতি ও ভুল কৌশল পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল বড় ঝুঁকি নেওয়া। ব্যবসায় দেউলিয়াত্ব থেকে ফিরে আসা হোক বা রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় সামলে হোয়াইট হাউসে ফেরা—বারবার তিনি দেখিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে দেওয়াই তাঁর কৌশল।

কিন্তু এবার সেই কৌশলই তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

মাত্র এক মাস আগে ইরানের সঙ্গে যে যুদ্ধবিরতিকে তিনি বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় সংকট থেকে রক্ষার সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, সেই সমঝোতাই এখন কার্যত ভেঙে দিয়েছেন। নতুন করে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প আবারও মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

গত সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী ইরানের একাধিক সামরিক ও অবকাঠামোগত স্থাপনায় হামলা চালায়। ট্রাম্পের দাবি, ১৭ জুন ভার্সাইয়ে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। এর পাল্টা জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলিকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

ভোটের আগে বড় ঝুঁকি

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি।

ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেমেছে। এর মধ্যে নতুন যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানির দাম, মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে তার রাজনৈতিক মূল্য রিপাবলিকানদেরই দিতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রক্ষণশীল সাময়িকী The American Conservative-এর নির্বাহী সম্পাদক কার্ট মিলস বলেন, নির্বাচনের আগে এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক লাভের কোনও যুক্তি তিনি দেখেন না। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত ক্ষোভের বশে নেওয়া এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের জন্য আত্মঘাতীও হতে পারে।

দীর্ঘ যুদ্ধের আশঙ্কা

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, এই সংঘাত ধীরে ধীরে স্থলযুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

এমন হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে—যে ধরনের “অন্তহীন যুদ্ধ” থেকে দেশকে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ট্রাম্প একসময় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক উপদেষ্টা নেট সোয়ানসন মনে করেন, প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল পরিস্থিতি সাময়িকভাবে উত্তপ্ত হলেও শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথেই ফিরবে। কিন্তু এখন সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অনেকেরই প্রত্যাশার বাইরে।

তাঁর মতে, ওয়াশিংটন সামরিক চাপ বাড়িয়ে তেহরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে চাইছে। কিন্তু সেই কৌশল উল্টো ফলও দিতে পারে।

সংঘাতের কেন্দ্রে হরমুজ

বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু এখন হরমুজ প্রণালি—যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবাহিত হয়।

যুদ্ধের শুরুতে ইরান এই জলপথ বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং তেল রপ্তানির সুযোগ বাড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু সেই সমঝোতা বেশিদিন টেকেনি।

ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করে তাদের কৌশলগত প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এরপরই সেই জাহাজগুলোর ওপর হামলা শুরু হয় এবং যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে।

ভুল হিসাব, বাড়ছে সংকট

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভালি নাসর মনে করেন, এটি কোনও ভুল বোঝাবুঝির ফল নয়। বরং দুই পক্ষই যুদ্ধবিরতির সময় নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে।

তাঁর মতে, ট্রাম্প চেয়েছিলেন হরমুজে ইরানের প্রভাব কমিয়ে আলোচনায় বাড়তি সুবিধা নিতে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধবিরতির সুযোগে অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই প্রতিপক্ষকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছে।

কূটনীতির অভাব?

বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগ, ট্রাম্প প্রশাসনে এখন ইরান নিয়ে অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারকের সংখ্যা অনেক কম।

সাবেক কূটনীতিক নেট সোয়ানসনের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে দেওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে পেশাদার মূল্যায়নের বদলে রাজনৈতিক হিসাবই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

বর্তমানে ট্রাম্প মূলত তাঁর ঘনিষ্ঠ আলোচক স্টিভ উইটকফ, জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স-এর পরামর্শের ওপর নির্ভর করছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের জটিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোকে ব্যবসায়িক দরকষাকষির মানসিকতায় বিচার করা বড় ভুল হতে পারে।

শেষ কোথায়?

মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, ইরান এমন প্রতিপক্ষ, যারা দীর্ঘ সময় চাপ সহ্য করেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে প্রস্তুত। হরমুজ প্রণালী তাদের অন্যতম বড় কৌশলগত অস্ত্র।

অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ও সাবেক সেন্টকম প্রধান জোসেফ ভোটেল সতর্ক করে বলেছেন, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া এই সংঘাত কেবল পাল্টাপাল্টি হামলার এক অন্তহীন চক্রে পরিণত হবে।

ট্রাম্পের হিসাব শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত স্পষ্ট, ইরানে নতুন সামরিক অভিযান শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, হোয়াইট হাউসের রাজনীতিকেও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles