Table of Contents
হাইলাইটস
- মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের হরমোজগান প্রদেশে একটি সুড়ঙ্গ ও তিনটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত।
- সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় বন্দরনগরী বান্দার আব্বাস কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
- মার্কিন সেনাবাহিনীর দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল সামরিক নজরদারি কেন্দ্র, অস্ত্রভাণ্ডার ও নৌ-সামরিক অবকাঠামো।
- আহভাজ-সহ একাধিক শহরে রাতভর বিস্ফোরণে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
- যুদ্ধের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, জলসংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সমস্যায় নাজেহাল সাধারণ মানুষ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক আরও বেড়েছে। বিশেষ করে হরমোজগান প্রদেশে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বন্দরনগরী বান্দার আব্বাস দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে হরমোজগান গভর্নরের দফতর জানিয়েছে, রাতের হামলায় একটি সুড়ঙ্গ ও তিনটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসন সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় সড়কযাত্রা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। উল্লেখ্য, এই প্রদেশেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি।
বান্দার আব্বাসের এক বাসিন্দা মারজিয়েহ জানান, শহরের আশপাশের একাধিক সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি নিজের পুরো পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, শুধু বান্দার আব্বাস নয়, খুজেস্তান প্রদেশের রাজধানী আহভাজ, ফার্স প্রদেশের লার ও দারাব, এবং জাস্ক অঞ্চলের একটি সমুদ্রের জল মিষ্টিকরণ কেন্দ্রেও হামলা হয়েছে। তবে এসব হামলার বিষয়ে মার্কিন সেনাবাহিনী আলাদা করে কোনও মন্তব্য করেনি।
আংশিক স্বাভাবিক হচ্ছে যোগাযোগ
ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার বিকেলের মধ্যে কিছু যোগাযোগ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে চালু হয়েছে। বান্দার আব্বাস রেলস্টেশন থেকে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে এবং শহরের পূর্ব দিকে একটি বিকল্প সড়কপথও খুলে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন সেনাবাহিনীর দাবি, তাদের হামলা ছিল সামরিক লক্ষ্যবস্তু কেন্দ্রিক। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নজরদারি কেন্দ্র, সামরিক রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার এবং নৌ-সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার কথা তারা অস্বীকার করেছে।
রাত হলেই আতঙ্ক
খুজেস্তানের রাজধানী আহভাজের ৩৪ বছর বয়সি ব্যবসায়ী এমাদ বলেন, রাতের বিস্ফোরণ এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। তাঁর মতে, বেশিরভাগ হামলাই শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হলেও বিস্ফোরণের শব্দে পুরো শহর আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে।
আরেক বাসিন্দা এলনাজ জানান, বৃহস্পতিবার রাত ছিল সাম্প্রতিক সংঘর্ষ পুনরায় শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে ভয়াবহ।
তাঁর কথায়, “বিস্ফোরণের অভিঘাত এতটাই কাছাকাছি ছিল যে মনে হচ্ছিল বাইরে বেরোলেই পুরো শহর ধ্বংস হয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, হামলার তীব্রতা কিছুটা কমলেও প্রতি রাতেই নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। সামরিক স্থাপনাগুলিই মূল লক্ষ্য হলেও বিস্ফোরণের অভিঘাত থেকে সাধারণ মানুষও রেহাই পাচ্ছেন না।
যুদ্ধের সঙ্গে বাড়ছে মানবিক সংকট
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শুধু নিরাপত্তা নয়, দৈনন্দিন জীবনও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
আহভাজে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নতুন নয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জল সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যেই শহরের তাপমাত্রা ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছে।
এলনাজ জানান, বাজারে এখনও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে। কারণ যুদ্ধের কারণে খাদ্যদ্রব্যের দাম দ্রুত বাড়ছে, অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
তাঁর কথায়, “আগেও জীবন সহজ ছিল না। যুদ্ধ সেই দুর্ভোগকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে।”
দক্ষিণ ইরানে চলমান এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাহত হয় নিত্যদিনের জীবন, আর সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হয় সাধারণ মানুষকেই।