নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দায়ের হওয়া এফআইআর বাতিল করতে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ বলেছে, সদুদ্দেশ্যে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া তরুণদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই এই অসাধারণ ক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে—বিশেষ পরিস্থিতিতে দেওয়া এই আদেশকে ভবিষ্যতের মামলায় নজির হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

অনুচ্ছেদ ১৪২-এ কী বলা হয়েছে?

সংবিধানের ১৪২(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে, সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন কোনও মামলা বা বিষয়ের ক্ষেত্রে ‘সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় যে কোনও ডিক্রি বা আদেশ দিতে পারে সর্বোচ্চ আদালত। সেই আদেশ গোটা দেশে কার্যকর হবে।

১৪২(২) অনুচ্ছেদ আদালতকে আরও কয়েকটি সহায়ক ক্ষমতা দিয়েছে—কোনও ব্যক্তিকে হাজির করানো, নথি বা তথ্য পেশের নির্দেশ দেওয়া এবং আদালত অবমাননার তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা করা।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দবন্ধ হল ‘সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার’। প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগে কোনও মামলার প্রকৃত অন্যায় দূর না হলে, সেই ফাঁক পূরণ করতেই ১৪২ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করা হয়। এই ক্ষমতা কেবল সুপ্রিম কোর্টের; হাই কোর্ট বা নিম্ন আদালতের নয়।

নিট আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে কেন প্রয়োগ?

২০২৬ সালের জুলাইয়ে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে সংসদ অভিযানের সময় সংঘর্ষের পরে দিল্লি-সহ বিভিন্ন রাজ্যে ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছিল। পরে কেন্দ্র, দিল্লি পুলিশ এবং মহারাষ্ট্র, বিহার, অসম ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার মামলাগুলি প্রত্যাহারে সম্মত হয়। কিন্তু এফআইআরগুলি বিভিন্ন রাজ্যে দায়ের হওয়ায় প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গেলে দীর্ঘ সময় লাগত।

এই জট কাটাতেই সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগের অনুরোধ জানান। সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে দেশজুড়ে সংশ্লিষ্ট এফআইআর বাতিল করে দেয়। আদালত মনে করেছে, সদুদ্দেশ্যে প্রতিবাদে যোগ দেওয়া ছাত্রছাত্রীদের মাথায় বছরের পর বছর ফৌজদারি মামলা ঝুলিয়ে রাখা তাঁদের শিক্ষা, চাকরি ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারে। সরকার এবং আন্দোলনকারী—উভয় পক্ষের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তা মেনে চলার শর্তেই এই স্বস্তি দেওয়া হয়েছে।

এই ক্ষমতা কতটা বিস্তৃত?

১৪২ অনুচ্ছেদকে সুপ্রিম কোর্টের ‘অবশিষ্ট’ বা ‘পরিপূরক’ ক্ষমতা বলা হয়। আইনসভা আগে থেকে কোনও বিশেষ পরিস্থিতির সমাধান কল্পনা না করলেও আদালত তার সামনে বিচারাধীন মামলায় ন্যায়সংগত ফল আনতে পারে। বিবাহ সম্পূর্ণ ভেঙে গেলে পারস্পরিক সম্মতি ছাড়াও বিবাহবিচ্ছেদ দেওয়া, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ নির্দেশ, বিচারপ্রক্রিয়ার স্থানান্তর কিংবা একাধিক মামলা একত্রিত করার মতো ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা ব্যবহৃত হয়েছে।

তবে ১৪২ অনুচ্ছেদ আদালতকে ইচ্ছামতো দেশ চালানোর ক্ষমতা দেয় না। এটি নতুন আইন তৈরির বিকল্পও নয়। এর প্রয়োগের সঙ্গে আদালতে বিচারাধীন কোনও ‘মামলা বা বিষয়’-এর সরাসরি যোগ থাকতে হবে।

সীমারেখা কোথায়?

প্রথমত, ১৪২ অনুচ্ছেদের আদেশ কোনও নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে না। ১৯৬৩ সালের প্রেমচাঁদ গর্গ বনাম আবগারি কমিশনার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, ‘সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার’-এর নামে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে স্বীকৃত অধিকার অগ্রাহ্য করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, এই ক্ষমতা দিয়ে কোনও মূল বা সারবত্তাগত আইনকে সম্পূর্ণ পাশ কাটানো যায় না। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় আদালত জানায়, ১৪২ অনুচ্ছেদ আইনকে পরিপূরক করতে পারে, কিন্তু তার জায়গা দখল করতে পারে না। অর্থাৎ প্রক্রিয়াগত বাধা কিছুটা শিথিল করা গেলেও সংসদের তৈরি আইনে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলে আদালত সাধারণত তার বিপরীত ব্যবস্থা নিতে পারে না।

তৃতীয়ত, মামলার পক্ষ নন—এমন ব্যক্তির অধিকার তাঁদের বক্তব্য না শুনে ক্ষুণ্ণ করা যায় না। প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মূলনীতি, বিশেষত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, বজায় রাখতেই হবে। ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্টও বলেছে, অসংখ্য মামলায় অন্য বেঞ্চের বৈধ আদেশ এক ধাক্কায় বাতিল করতে ১৪২ প্রয়োগ করা যায় না।

নিট মামলার আদেশ তাই কোনও সাধারণ ঘোষণা নয় যে প্রতিবাদের সময় সংঘটিত সমস্ত অপরাধই ক্ষমাযোগ্য। সরকারগুলির সম্মতি, আন্দোলনকারীদের ভবিষ্যৎ এবং বিশেষ সমঝোতার ভিত্তিতে আদালত এককালীন সমাধান দিয়েছে। সেই কারণেই বেঞ্চ আদেশটির গায়ে স্পষ্টভাবে লিখে দিয়েছে—এটি নজির নয়।