ভারতের অর্থনীতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম তিন মাসে অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুনে, ৭.৮ শতাংশ বেড়েছে বলে কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান মন্ত্রক ঘোষণা করার পর আপাতদৃষ্টিতে সরকারের আনন্দিত হওয়ারই কথা ছিল। কারণ, অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ বৃদ্ধির হার ৭.১ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে বলে অনুমান করেছিলেন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পূর্বাভাস ছিল ৭ শতাংশ। সরকারি হিসাব দুটিকেই ছাপিয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই সাফল্যকে অসাধারণ কৃতিত্ব বলে তুলে ধরেছেন।

কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উৎসবের মধ্যে ঢুকে পড়েছে সন্দেহ। প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ দাবি করেছেন, অর্থনীতি প্রকৃতপক্ষে ৭.৮ শতাংশ বাড়েনি; টাকার অঙ্কে বৃদ্ধির হার মাত্র ২.৬ শতাংশ, মূল্যবৃদ্ধি বাদ দিলে প্রকৃত বৃদ্ধি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কংগ্রেস সেই বক্তব্য উদ্ধৃত করে অভিযোগ করেছে, পরিসংখ্যানের কারসাজি করে দুর্বল অর্থনীতিকে সবল দেখানো হচ্ছে। অন্য দিকে, কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান মন্ত্রক ছয় দফা ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছে, গর্গ একই মাপকাঠিতে তৈরি দুটি সংখ্যার তুলনা করেননি। ফলে তাঁর ২.৬ শতাংশের হিসাবটিই ভ্রান্ত।

বিতর্কটি রাজনৈতিক হলেও এর মূলে রয়েছে কয়েকটি অত্যন্ত জটিল পরিসংখ্যানগত প্রশ্ন—চলতি দাম ও স্থির দাম, ভিত্তিবর্ষের পরিবর্তন, মূল্যহ্রাসক, উৎপাদক মূল্যসূচক, দ্বৈত মূল্যসংশোধন এবং পুরনো হিসাবের পুনর্মূল্যায়ন। সাধারণ মানুষের পক্ষে এই শব্দের জঙ্গল পেরিয়ে বোঝা কঠিন—দেশ সত্যিই কতটা এগোল এবং এই ৭.৮ শতাংশের সঙ্গে তাঁর চাকরি, আয় কিংবা বাজারের খরচের সম্পর্কই বা কী।

প্রথমে বোঝা যাক জিডিপি কী

একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশের সীমানার মধ্যে উৎপাদিত সমস্ত চূড়ান্ত পণ্য ও পরিষেবার মোট আর্থিক মূল্যই মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি। ধরা যাক, একটি ছোট দেশে এক বছরে শুধু ১০০ কিলোগ্রাম চাল উৎপাদিত হয়। প্রতি কিলোগ্রাম চালের দাম ৫০ টাকা। সেই দেশের জিডিপি ৫,০০০ টাকা।

পরের বছরও যদি ১০০ কিলোগ্রাম চাল উৎপাদিত হয়, কিন্তু দাম বেড়ে ৫৫ টাকা হয়, তবে টাকার অঙ্কে জিডিপি হবে ৫,৫০০ টাকা। অর্থাৎ জিডিপি ১০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু দেশটি কি বাস্তবে বেশি চাল উৎপাদন করেছে? একেবারেই নয়। বৃদ্ধি হয়েছে শুধু দামের।

এই টাকার অঙ্কে মাপা উৎপাদনকে বলা হয় চলতি দামের বা নামমাত্র জিডিপি। দাম বৃদ্ধির প্রভাব বাদ দিয়ে কতটা বেশি পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদিত হল, তাকে বলা হয় স্থির দামের বা প্রকৃত জিডিপি। অর্থনীতির প্রকৃত বৃদ্ধি বলতে সাধারণত এই দ্বিতীয় সংখ্যাটিকেই বোঝানো হয়।

ভারতের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে চলতি দামের জিডিপি হয়েছে ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে, নতুন পরিসংখ্যানমালা অনুযায়ী, তা ছিল ৮০ লক্ষ কোটি টাকা। অতএব টাকার অঙ্কে বৃদ্ধি:

(৮৮.২৭ – ৮০) ÷ ৮০ × ১০০ = ১০.৩ শতাংশ।

কিন্তু এই বৃদ্ধির একাংশ এসেছে দাম বাড়ার কারণে। সেই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাদ দিলে প্রকৃত জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৮১.৩৬ লক্ষ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৭৫.৪৬ লক্ষ কোটি। ফলে প্রকৃত বৃদ্ধির হার:

(৮১.৩৬ – ৭৫.৪৬) ÷ ৭৫.৪৬ × ১০০ = ৭.৮ শতাংশ।

এগুলি পরিসংখ্যান মন্ত্রকের প্রকাশিত মূল সংখ্যা। একই হিসাবে প্রকৃত মোট মূল্য সংযোজন বেড়েছে ৮.২ শতাংশ এবং চলতি দামে মূল্য সংযোজন বেড়েছে ১১.৫ শতাংশ।

তা হলে ২.৬ শতাংশ সংখ্যাটি এল কোথা থেকে?

এখানেই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকের জিডিপি পুরনো পরিসংখ্যানমালায়, যার ভিত্তিবর্ষ ছিল ২০১১-১২, ধরা হয়েছিল ৮৬.০৫ লক্ষ কোটি টাকা। চলতি বছরের এপ্রিল-জুনে নতুন পরিসংখ্যানমালা অনুযায়ী জিডিপি হয়েছে ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি টাকা।

সুভাষচন্দ্র গর্গ এই দুটি সংখ্যার তুলনা করেছেন:

(৮৮.২৭ – ৮৬.০৫) ÷ ৮৬.০৫ × ১০০ = প্রায় ২.৬ শতাংশ।

অঙ্কটিতে যোগ-বিয়োগের ভুল নেই। সমস্যা হল, যে দুটি সংখ্যার তুলনা করা হচ্ছে, তারা একই নিয়মে তৈরি নয়। ৮৬.০৫ লক্ষ কোটি টাকা পুরনো ভিত্তিবর্ষ ও পুরনো পদ্ধতির হিসাব; ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি নতুন ভিত্তিবর্ষ ও নতুন পদ্ধতির হিসাব। একটি পুরনো মাপের ফিতে, অন্যটি নতুন মাপের ফিতে।

সহজ উদাহরণ নেওয়া যাক। কোনও শহরে বাড়ির দূরত্ব আগে সোজা রাস্তা ধরে মাপা হত। পরে সিদ্ধান্ত হল, আসল যাতায়াতের পথ ধরে দূরত্ব মাপা হবে। পুরনো হিসাবে একটি বাড়ি ১০ কিলোমিটার দূরে, নতুন হিসাবে অন্য বাড়ি ১২ কিলোমিটার দূরে—এই দুটি সংখ্যা থেকে দ্বিতীয় বাড়িটি ২০ শতাংশ বেশি দূরে বলা যাবে না। প্রথম বাড়িটির দূরত্বও নতুন নিয়মে মাপতে হবে।

পরিসংখ্যান মন্ত্রকের বক্তব্য, নতুন পদ্ধতিতে ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুনের জিডিপি প্রথমে নির্ধারিত হয়েছিল ৮০.৩২ লক্ষ কোটি টাকা। পরে আরও তথ্য আসায় তা ৮০.৪৪ লক্ষ কোটি হয়। নতুন শিল্প উৎপাদনসূচক যুক্ত করার পরে সর্বশেষ হিসাবে সেটি ৮০ লক্ষ কোটি হয়েছে। অতএব ২০২৬ সালের ৮৮.২৭ লক্ষ কোটির সঙ্গে তুলনা করতে হবে একই পরিসংখ্যানমালার ৮০ লক্ষ কোটিকেই। তাতেই ১০.৩ শতাংশ নামমাত্র বৃদ্ধি পাওয়া যাচ্ছে।

অর্থাৎ ৮৬.০৫ লক্ষ কোটি থেকে ৮০ লক্ষ কোটিতে নামানো কোনও একটি পর্যায়ে গোপনে করা ছয় লক্ষ কোটি টাকার কাটছাঁট নয়। পুরনো ভিত্তিবর্ষের গোটা পরিসংখ্যানমালা বদলে নতুন ভিত্তিবর্ষে সমস্ত হিসাব নতুন করে তৈরি করার ফল। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দুই ভিন্ন পরিসংখ্যানমালার সংখ্যা মিলিয়ে ২.৬ শতাংশ বার করা তাই আপেল ও কমলালেবুর তুলনার সমান।

এই নির্দিষ্ট বিষয়ে পরিসংখ্যান মন্ত্রকের যুক্তিই বেশি শক্তিশালী। ২.৬ শতাংশকে ৭.৮ শতাংশের সরাসরি বিকল্প হিসাবে তুলে ধরা গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জিডিপির নতুন হিসাব নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না।

ভিত্তিবর্ষ বদলানোর দরকার কী?

জিডিপি গণনা করতে একটি বছরকে তুলনার ভিত্তি হিসাবে বেছে নেওয়া হয়। আগে ভারতের ভিত্তিবর্ষ ছিল ২০১১-১২। এখন তা বদলে ২০২২-২৩ করা হয়েছে।

সময়ের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে যায়। ২০১১ সালে অনলাইন কেনাকাটা, মুঠোফোনভিত্তিক অর্থপ্রদান, ডিজিটাল পরিষেবা, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা কিংবা আর্থিক প্রযুক্তির পরিধি আজকের মতো ছিল না। আবার কোনও কোনও পুরনো শিল্পের গুরুত্ব কমেছে। এগারো-পনেরো বছর আগের পণ্যের তালিকা এবং ব্যবসায়িক কাঠামো দিয়ে আজকের অর্থনীতি মাপলে ছবিটি বিকৃত হতে পারে।

ভিত্তিবর্ষ বদলালে তাই তিনটি কাজ হয়:

  • অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্রগুলিকে হিসাবের মধ্যে আনা হয়।
  • বিভিন্ন শিল্পের গুরুত্ব নতুন করে নির্ধারণ করা হয়।
  • উৎপাদন ও দামের উন্নত এবং বিস্তৃত তথ্য ব্যবহার করা হয়।

এ বার নতুন ভোক্তা মূল্যসূচক, শিল্প উৎপাদনসূচক, উৎপাদক মূল্যসূচক এবং ব্যাঙ্ক পরিষেবা মূল্যসূচক ব্যবহার করা হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাদ দেওয়ার জন্য আগে প্রায় ১৮০টি পণ্যের দামের তথ্য ব্যবহৃত হত। নতুন ব্যবস্থায় ৫০০ থেকে ৬০০টি পণ্যের দাম ব্যবহারের ব্যবস্থা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারও ভারতের পুরনো ভিত্তিবর্ষ, পাইকারি মূল্যসূচকের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং একক মূল্যসংশোধন নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। নতুন ব্যবস্থা সেই দুর্বলতা সংশোধনের চেষ্টা।

সুতরাং ভিত্তিবর্ষ পরিবর্তন নিজে কোনও সন্দেহজনক ঘটনা নয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশই নির্দিষ্ট ব্যবধানে এটি করে। বরং দীর্ঘদিন ভিত্তিবর্ষ না বদলানোই উদ্বেগের বিষয়।

আসল জট: মূল্যবৃদ্ধি কীভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে

চলতি দামের জিডিপিকে প্রকৃত জিডিপিতে রূপান্তরের জন্য একটি উপযুক্ত মূল্যসূচক ব্যবহার করা হয়। একে সহজ ভাষায় মূল্যহ্রাসক বলা যেতে পারে।

আগের চালের উদাহরণে ফিরে যাই। টাকার অঙ্কে উৎপাদন ১০ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু চালের দামও ১০ শতাংশ বেড়েছে। সুতরাং প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধি শূন্য। কিন্তু যদি ভুল করে ধরে নেওয়া হয় দাম বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশ, তা হলে কাগজে উৎপাদন প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে বলে দেখা যাবে।

অর্থাৎ ব্যবহৃত মূল্যবৃদ্ধির হার যত কম হবে, হিসাবের প্রকৃত বৃদ্ধির হার তত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। এখানেই অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের আপত্তি।

বিশেষ করে উৎপাদন শিল্পে চলতি দামের মোট মূল্য সংযোজন বেড়েছে ৭.৭ শতাংশ, অথচ দাম বাদ দেওয়ার পরে প্রকৃত মূল্য সংযোজন বেড়েছে ৯.২ শতাংশ। অর্থাৎ দাম বাদ দেওয়ার পর বৃদ্ধি কমেনি, উল্টে বেড়েছে। এর অর্থ উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত অন্তর্নিহিত মূল্যহ্রাসক ঋণাত্মক ১.৫ শতাংশ—যেন ওই ক্ষেত্রের সামগ্রিক দাম কমেছে।

সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক: বাজারে যখন অধিকাংশ জিনিসের দাম বাড়ছে, তখন কলকারখানার ক্ষেত্রে দাম কমল কী করে?

দ্বৈত মূল্যসংশোধনের ব্যাখ্যা

সরকার বলছে, উৎপাদন শিল্পে এখন দ্বৈত মূল্যসংশোধন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টি একটি বিস্কুট কারখানার উদাহরণে বোঝা যেতে পারে।

ধরা যাক, গত বছর কারখানাটি ১০০ টাকার বিস্কুট বিক্রি করেছিল। বিস্কুট তৈরির জন্য ময়দা, চিনি, তেল, বিদ্যুৎ ও মোড়কের পিছনে খরচ হয়েছিল ৬০ টাকা। তার মূল্য সংযোজন ছিল ৪০ টাকা।

এ বছর বিস্কুট বিক্রি হল ১১০ টাকার। কিন্তু কাঁচামালের খরচ বেড়ে হল ৭০ টাকা। মূল্য সংযোজন এখনও ৪০ টাকা। শুধু বিক্রির দাম দেখে উৎপাদন ১০ শতাংশ বেড়েছে বলা যাবে না।

আবার উল্টো ঘটনাও ঘটতে পারে। কাঁচামালের দাম যদি পণ্যের বিক্রয়মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি বাড়ে, তবে চলতি দামে মূল্য সংযোজন খুব কম বাড়তে পারে। কিন্তু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লে স্থির দামে মূল্য সংযোজন বেশি দেখাবে। তাই উৎপাদিত পণ্যের দাম এবং ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম আলাদা করে সংশোধন করা হয়। এটিই দ্বৈত মূল্যসংশোধন।

মন্ত্রকের ব্যাখ্যা, এপ্রিল-জুনে কলকারখানার কাঁচামালের দাম উৎপাদিত পণ্যের দামের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। ফলে চলতি দামে মূল্য সংযোজনের বৃদ্ধি ৭.৭ শতাংশ হলেও দামগুলিকে আলাদা করে বাদ দেওয়ার পরে উৎপাদনের পরিমাণগত বৃদ্ধি ৯.২ শতাংশ হয়েছে। ঋণাত্মক মূল্যহ্রাসক মানেই সমস্ত শিল্পপণ্যের বাজারদর কমেছে—এমন নয়। এটি উৎপাদনমূল্য ও উপকরণমূল্যের আপেক্ষিক চলাচলের ফল।

তত্ত্বগতভাবে এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ সম্ভব। বরং পুরনো একক মূল্যসংশোধনের বদলে দ্বৈত ব্যবস্থা চালুর দাবি অর্থনীতিবিদেরা দীর্ঘদিন ধরেই জানিয়েছিলেন।

কিন্তু বিতর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না। সমালোচকদের প্রশ্ন হল, উৎপাদিত পণ্য এবং উপকরণের দাম মাপার জন্য যে সূচক ও অনুপাত ব্যবহার করা হয়েছে, তা বাস্তব শিল্পক্ষেত্রের সঠিক প্রতিফলন কি না। পদ্ধতি তত্ত্বগতভাবে উন্নত হলেই ব্যবহৃত তথ্য নির্ভুল হয়ে যায় না। কোন শিল্পে কোন দামের সূচক ব্যবহৃত হয়েছে, উপকরণ ও উৎপাদনের অনুপাত কী ভাবে অনুমান করা হয়েছে এবং অসংগঠিত ছোট শিল্পের তথ্য কতটা ধরা পড়েছে—এসবের আরও বিস্তারিত প্রকাশ দরকার।

পুরনো হিসাব বারবার বদলায় কেন?

জিডিপির প্রথম ত্রৈমাসিক হিসাব কোনও চূড়ান্ত জনগণনার ফল নয়। দ্রুত ফল প্রকাশ করতে সরকারকে অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করতে হয়। পরে সংস্থার পূর্ণাঙ্গ হিসাব, কর আদায়, শিল্প উৎপাদন, সরকারি ব্যয় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক তথ্য এলে আগের সংখ্যা সংশোধন করা হয়।

এই কারণে জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিকের বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ থেকে সংশোধিত হয়ে ৮.৬ শতাংশ হয়েছে। সংশোধন হওয়া স্বাভাবিক। বিশ্বের সর্বত্রই প্রাথমিক জিডিপির হিসাব পরে বদলায়।

তবে সংশোধনের আকার যদি খুব বড় হয় কিংবা প্রায় সব সময় একই দিকে যায়, তা হলে স্বচ্ছতার প্রশ্ন ওঠে। কোন নতুন তথ্যের কারণে কোন ক্ষেত্রের হিসাব কতটা বদলাল, সরকারকে তা সহজ ও বিস্তারিত ভাষায় প্রকাশ করতে হবে। “উন্নত তথ্য পাওয়া গিয়েছে” বললেই জনসংশয় দূর হয় না।

৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির বাস্তব ভিত আছে কি?

সরকারি প্রতিবেদনে শুধু একটি সামগ্রিক সংখ্যা নেই; বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। উৎপাদন শিল্পে প্রকৃত বৃদ্ধি ৯.২ শতাংশ, আর্থিক, আবাসন, তথ্যপ্রযুক্তি ও পেশাদার পরিষেবায় ১২.১ শতাংশ এবং সামগ্রিক পরিষেবা ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে।

স্থায়ী মূলধন গঠন—অর্থাৎ কারখানা, যন্ত্র, রাস্তা, ভবন ও অন্যান্য উৎপাদনক্ষম সম্পদে বিনিয়োগ—১১.৯ শতাংশ বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই বৃদ্ধি ছিল ৫.৮ শতাংশ। ব্যক্তিগত ভোগব্যয় বেড়েছে ৭.১ শতাংশ এবং রফতানি ১২ শতাংশ। কৃষির বৃদ্ধি ৩.৬ শতাংশ হলেও খনি ক্ষেত্রে ২.৪ শতাংশ সংকোচন হয়েছে। মোট মূল্য সংযোজনের বৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ—জিডিপির থেকেও বেশি।

ঋণের চাহিদা, সরকারি মূলধনী ব্যয়, ভোগ এবং পরিষেবার প্রসারের মতো অন্যান্য সূচকও অর্থনীতি যে সম্প্রসারিত হয়েছে, সেই বক্তব্যকে সমর্থন করে। অতএব গোটা ৭.৮ শতাংশই কেবল একটি মূল্যসূচকের কৌশলে সৃষ্টি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

তবে বিনিয়োগের ১১.৯ শতাংশ বৃদ্ধির কতটা বেসরকারি শিল্পের নতুন লগ্নি এবং কতটা সরকারি পরিকাঠামো ব্যয়, তা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি স্বল্পমেয়াদে জিডিপি বাড়াতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির জন্য বেসরকারি লগ্নির ধারাবাহিকতা দরকার।

জিডিপি বাড়লে সাধারণ মানুষ টের পান না কেন?

এই প্রশ্নটিই সম্ভবত সবচেয়ে জরুরি। ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি সত্য হলেও প্রত্যেক ভারতীয়ের আয় ৭.৮ শতাংশ বেড়েছে—এমন নয়।

জিডিপি দেশের মোট উৎপাদন মাপে, তার বণ্টন নয়। কোনও বড় সংস্থার লাভ দ্বিগুণ হলে জিডিপি বাড়তে পারে, অথচ সেই সংস্থার কর্মীর বেতন একই থাকতে পারে। যন্ত্রনির্ভর শিল্পে উৎপাদন বাড়লেও সমান হারে চাকরি সৃষ্টি না-ও হতে পারে। আবার দেশের মোট জিডিপি ৭.৮ শতাংশ বাড়লেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু বৃদ্ধি তার চেয়ে কম হবে।

জিডিপি জানায় না:

  • নতুন কাজ কতগুলি তৈরি হয়েছে;
  • শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি বেড়েছে কি না;
  • কৃষকের আয় কতটা বাড়ল;
  • ছোট ব্যবসার অবস্থা কী;
  • সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য কমল না বাড়ল;
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা পরিবেশের মান উন্নত হল কি না।

আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। কোনও পরিবারের মাসিক আয় ৮ শতাংশ বাড়লেও খাবার, চিকিৎসা, বাড়িভাড়া ও যাতায়াতের খরচ যদি ১০ শতাংশ বাড়ে, সেই পরিবার নিজেকে উন্নত মনে করবে না। জাতীয় হিসাবের মূল্যহ্রাসক এবং একটি সাধারণ পরিবারের ব্যক্তিগত মূল্যবৃদ্ধির অভিজ্ঞতা এক জিনিস নয়। গরিব পরিবারের বাজেটে খাবারের অংশ বেশি; ধনী পরিবারের বাজেটে পরিষেবা ও বিলাসসামগ্রীর অংশ বেশি। তাই একই সরকারি মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেও দুই পরিবারের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

কোন পক্ষের বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য?

বিতর্কটিকে তিনটি আলাদা প্রশ্নে ভাগ করা উচিত।

প্রথম প্রশ্ন: ৭.৮ শতাংশের বদলে প্রকৃত বৃদ্ধি কি ২.৬ শতাংশ?
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর—না। পুরনো পরিসংখ্যানমালার ৮৬.০৫ লক্ষ কোটি টাকার সঙ্গে নতুন পরিসংখ্যানমালার ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি তুলনা করে ২.৬ শতাংশ বার করা পদ্ধতিগতভাবে ঠিক নয়। একই নতুন পরিসংখ্যানমালায় আগের বছরের ৮০ লক্ষ কোটির সঙ্গে তুলনাই গ্রহণযোগ্য।

দ্বিতীয় প্রশ্ন: সরকারি ৭.৮ শতাংশকে কি একেবারে নির্ভুল ও চূড়ান্ত ধরে নিতে হবে?
না। এটি প্রাথমিক ত্রৈমাসিক অনুমান। পরে সংশোধিত হতে পারে। উৎপাদন শিল্পের মূল্যহ্রাসক, দ্বৈত মূল্যসংশোধনে ব্যবহৃত তথ্য এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের অনুমান স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা করা দরকার।

তৃতীয় প্রশ্ন: ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি মানেই কি সাধারণ মানুষের জীবন ৭.৮ শতাংশ ভালো হয়েছে?
একেবারেই নয়। এটি মোট উৎপাদনের সূচক, জনকল্যাণের সামগ্রিক পরিমাপ নয়। তার জন্য মাথাপিছু আয়, কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি, ভোগের বণ্টন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং দারিদ্র্যের তথ্যও দেখতে হবে।

শেষ কথা

এই বিতর্কে দু’টি চরম অবস্থানই এড়ানো দরকার। সরকারি সংখ্যা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হলেই তাকে বিনা প্রশ্নে অর্থনৈতিক বিজয়ঘোষণা বানানো উচিত নয়। আবার দুই ভিন্ন ভিত্তিবর্ষের সংখ্যা জুড়ে ২.৬ শতাংশ বার করে গোটা ৭.৮ শতাংশকেই জাল বলে দেওয়াও পরিসংখ্যানসম্মত নয়।

সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত হল—ভারতের অর্থনীতি এপ্রিল-জুনে শক্তিশালী গতিতে বেড়েছে, এবং ৭.৮ শতাংশ তার বর্তমানে স্বীকৃত সরকারি পরিমাপ। ভোগ, বিনিয়োগ, পরিষেবা, রফতানি ও ঋণের সম্প্রসারণ সেই বৃদ্ধির বাস্তব ভিত থাকার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বৃদ্ধির সঠিক মাত্রা সম্পর্কে মূল্যসংশোধনের পদ্ধতি এবং ব্যবহৃত তথ্য আরও খোলসা করা জরুরি। বিশেষ করে উৎপাদন শিল্পে ঋণাত্মক মূল্যহ্রাসক কেন হল, তার ক্ষেত্রভিত্তিক হিসাব জনসমক্ষে রাখা উচিত।

পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু অঙ্ক ঠিক রাখলে তৈরি হয় না; কী ভাবে সেই অঙ্কে পৌঁছনো হল, সেটিও নাগরিকের বোঝার মতো করে জানাতে হয়। জিডিপির এই ধুন্ধুমার বিতর্ক তাই শেষ পর্যন্ত একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে—অর্থনীতি কতটা বাড়ছে, তার পাশাপাশি সরকারি পরিসংখ্যানকে মানুষ কতটা বিশ্বাস করতে পারছেন। সেই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ আরও তথ্য, আরও স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষ পর্যালোচনা; রাজনৈতিক উল্লাস কিংবা রাজনৈতিক স্লোগান নয়।