কটি ঐতিহাসিক ঘটনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা, কোনও সাহিত্যকর্মের একাধিক পাঠ হাজির করা কিংবা একটি রাজনৈতিক তত্ত্বের অন্তর্নিহিত স্ববিরোধ চিহ্নিত করা—মানববিদ্যায় উচ্চশিক্ষার জন্য এই দক্ষতাগুলিই সবচেয়ে জরুরি। অথচ স্নাতকোত্তর ও গবেষণাস্তরে ভর্তির প্রাথমিক বাছাই ক্রমশ বহুনির্বাচনী প্রশ্ন বা এমসিকিউ-নির্ভর হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক তাই প্রশ্ন তুলেছেন, এই পরীক্ষায় কি সত্যিই মানববিদ্যা চর্চার উপযুক্ত প্রার্থীদের চিহ্নিত করা সম্ভব?

দেশের কেন্দ্রীয় ও অন্য অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্নাতকোত্তর ভর্তির জন্য অভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশিকা পরীক্ষা বা সিইউইটি-পিজি নেওয়া হয়। জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা পরিচালিত এই পরীক্ষার প্রশ্ন মূলত বহুনির্বাচনী। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, দর্শন, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের মতো বিষয়েও প্রার্থীকে কয়েকটি সম্ভাব্য উত্তরের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট উত্তরটি বেছে নিতে হয়। একই ধরনের পরীক্ষার ফল গবেষণার যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই ব্যবস্থার পক্ষে একটি জোরালো প্রশাসনিক যুক্তি রয়েছে। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্র দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব, মূল্যায়নে পরীক্ষকের ব্যক্তিগত পক্ষপাত থাকে না এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনকারীদের একই মানদণ্ডে বিচার করা যায়। লিখিত উত্তর মূল্যায়নে দুই পরীক্ষকের নম্বরের মধ্যে বড় পার্থক্য হতে পারে; বহুনির্বাচনী পরীক্ষায় সেই অনিশ্চয়তা নেই। ফল প্রকাশও দ্রুত হয় এবং পুনর্মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিরোধ তুলনামূলকভাবে কম।

কিন্তু শিক্ষকদের একাংশের মতে, প্রশাসনিক সুবিধাকে শিক্ষাগত উৎকর্ষের সমার্থক ধরে নেওয়াতেই বিপদ। মানববিদ্যায় অনেক প্রশ্নের একটিমাত্র অবিসংবাদিত উত্তর থাকে না। ইতিহাস মানে শুধু কোন যুদ্ধ কত সালে হয়েছিল, তা জানা নয়; যুদ্ধটির সামাজিক কারণ কী ছিল, তার বিবরণ কারা লিখেছেন এবং সেই বিবরণের মধ্যে ক্ষমতার কোন দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে—এই প্রশ্নগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যে একটি উপন্যাস প্রকাশের সাল জানা যেতে পারে এমসিকিউয়ের মাধ্যমে, কিন্তু উপন্যাসটির ভাষা, নীরবতা বা চরিত্রের দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাতে ধরা পড়ে না।

বহুনির্বাচনী প্রশ্ন অবশ্যই সব সময় নিছক মুখস্থবিদ্যা যাচাই করে না। দক্ষতার সঙ্গে প্রশ্ন তৈরি করা হলে কোনও অনুচ্ছেদ পড়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো, যুক্তির দুর্বলতা শনাক্ত করা কিংবা কাছাকাছি কয়েকটি ব্যাখ্যার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্যটি বেছে নেওয়ার ক্ষমতাও যাচাই করা যায়। সমস্যা হল, বিপুল পরিমাণ প্রশ্ন দ্রুত প্রস্তুত করার চাপে পরীক্ষাগুলিতে প্রায়ই লেখক, গ্রন্থ, সাল, পরিভাষা ও সংজ্ঞা-নির্ভর প্রশ্নের আধিক্য দেখা যায়। ফলে পরীক্ষার্থী গবেষণার পদ্ধতি আয়ত্ত করার বদলে তথ্যের তালিকা মুখস্থ করতে উৎসাহিত হন।

এর আর একটি ফল হল প্রশিক্ষণকেন্দ্র-নির্ভরতা। সম্ভাব্য প্রশ্ন, পুরনো প্রশ্নপত্র এবং দ্রুত উত্তর দেওয়ার কৌশল রপ্ত করা পরীক্ষার্থীরা এগিয়ে যান। ধীরে পড়ে, সংশয় প্রকাশ করে এবং একটি সমস্যাকে নানা দিক থেকে ভাবেন—এমন মেধাবী শিক্ষার্থী পরীক্ষার সময়সীমার মধ্যে পিছিয়ে পড়তে পারেন। অথচ গবেষণায় দ্রুত উত্তর দেওয়ার চেয়ে ঠিক প্রশ্নটি করতে পারা অনেক বেশি মূল্যবান।

গবেষণাস্তরে সমস্যাটি আরও গুরুতর। একজন সম্ভাব্য গবেষকের বিষয় সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকা দরকার, কিন্তু তার সঙ্গে প্রয়োজন যুক্তি নির্মাণ, প্রমাণ ব্যবহার, পূর্ববর্তী গবেষণার সীমাবদ্ধতা বোঝা এবং নিজস্ব অনুসন্ধানের পরিকল্পনা তৈরি করা। চারটি উত্তরের একটিতে দাগ দিয়ে এসব দক্ষতা দেখানো যায় না। কেবল এমসিকিউয়ের ফলের ভিত্তিতে গবেষণার প্রার্থী বাছাই করলে পরীক্ষায় দক্ষ কিন্তু মৌলিক অনুসন্ধানে দুর্বল প্রার্থী এগিয়ে যেতে পারেন। আবার নতুন প্রশ্ন তোলার ক্ষমতাসম্পন্ন কেউ প্রাথমিক পর্বেই বাদ পড়তে পারেন।

একটি সংসদীয় কমিটিও মানববিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একই ধরনের অভিন্ন বহুনির্বাচনী পরীক্ষা কতটা উপযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। বিশেষ করে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের সামাজিক ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য বজায় রাখার নিজস্ব লক্ষ্য অভিন্ন পরীক্ষাব্যবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করে। শিক্ষকদের আশঙ্কা, সব বিষয় ও প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ছাঁচ প্রয়োগ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থী বাছাইয়ের স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়।

তবে পুরনো ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ ফিরে যাওয়াও সমাধান নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পৃথক পরীক্ষা করলে আবেদন খরচ বাড়ে, বিভিন্ন শহরে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয় এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তাই বিশেষজ্ঞেরা মিশ্র পদ্ধতির কথা বলছেন। প্রাথমিক বাছাইয়ের জন্য সীমিত সংখ্যক উন্নত মানের এমসিকিউ রাখা যেতে পারে। তার সঙ্গে বিশ্লেষণমূলক সংক্ষিপ্ত উত্তর, একটি নিবন্ধ, পাঠ্যাংশের ব্যাখ্যা অথবা গবেষণা-প্রস্তাব যোগ করা প্রয়োজন। পিএইচডির ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পরে বিষয়ভিত্তিক সাক্ষাৎকার এবং গবেষণা-প্রস্তাবের মূল্যায়ন অপরিহার্য হওয়া উচিত।

পরীক্ষা কেবল শিক্ষার্থী বাছাই করে না; কীভাবে পড়াশোনা করতে হবে, সেই বার্তাও দেয়। প্রবেশিকার সাফল্য যদি তথ্য মুখস্থ করা ও দ্রুত বিকল্প বাছার উপর নির্ভর করে, তা হলে শ্রেণিকক্ষেও গভীর পাঠ, তর্ক এবং স্বাধীন চিন্তার গুরুত্ব কমবে। মানববিদ্যার মূল কাজ নিশ্চিত উত্তর মুখস্থ করানো নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত উত্তরকে প্রশ্ন করতে শেখানো। সেই ক্ষমতা যাচাই করতে হলে পরীক্ষাব্যবস্থাকেও ‘কোনটি সঠিক’ থেকে এগিয়ে ‘কেন সঠিক’ এবং ‘আর কীভাবে দেখা যায়’—এই প্রশ্নগুলির জায়গা তৈরি করতে হবে।