নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে কোন এলাকার মানুষ কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা এখন অনেকটাই বোঝা যায়। কারণ বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্রে জমা ভোট গণনা করা হয় বুথ ধরে ধরে। এই ব্যবস্থার ফলে কোনও নির্দিষ্ট পাড়া, গ্রাম কিংবা জনবসতির ভোটের প্রবণতা রাজনৈতিক দলগুলির কাছে কার্যত প্রকাশ হয়ে পড়ে। ক্ষমতাসীন প্রার্থী বা দলকে ভোট না দেওয়ার ‘অপরাধে’ সেই এলাকার মানুষ যাতে প্রতিহিংসা, বঞ্চনা কিংবা হিংসার শিকার না হন, সেই উদ্বেগ থেকেই ফের সামনে এসেছে ‘টোটালাইজার’ ব্যবহারের প্রস্তাব।

মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনাকে নিয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ কেন্দ্রীয় সরকারকে এই বিষয়ে নিজের অবস্থান জানাতে বলেছে। আদালত জানতে চেয়েছে, বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্রের ভোট গণনায় টোটালাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধা কোথায় এবং এই পদ্ধতি চালু হলে কোনও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না। প্রয়োজন হলে ১৯৬১ সালের নির্বাচন পরিচালনা বিধি সংশোধনের সম্ভাবনাও কেন্দ্রকে পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। মামলাটির পরবর্তী শুনানি চার সপ্তাহ পরে।

টোটালাইজার কীভাবে কাজ করে

টোটালাইজার হল এমন একটি যন্ত্র, যার সঙ্গে সাধারণত ১৪টি বুথের বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ-একক যুক্ত করা যায়। তার পরে ওই ১৪টি যন্ত্রে জমা ভোট একসঙ্গে গণনা করে প্রত্যেক প্রার্থীর মোট প্রাপ্ত ভোট দেখানো হয়। কিন্তু কোন বুথে কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন, সেই পৃথক হিসাব প্রকাশিত হয় না।

সহজ উদাহরণে, ১৪টি বুথে কোনও প্রার্থী মোট ৫,০০০ ভোট পেলে টোটালাইজার শুধু সেই সম্মিলিত সংখ্যাটিই জানাবে। কোন গ্রাম বা পাড়ার বুথ থেকে তিনি বেশি কিংবা কম ভোট পেয়েছেন, তা জানা যাবে না। কাগজের ব্যালটের যুগে বিভিন্ন বাক্সের ভোট একত্রে মিশিয়ে গণনার যে ধারণা ছিল, টোটালাইজারকে তার বৈদ্যুতিন সংস্করণ বলা যায়।

আদালতের উদ্বেগ কোথায়

আদালতের পর্যবেক্ষণ, গোপন ভোটাধিকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনও প্রার্থী যদি জানতে পারেন যে একটি নির্দিষ্ট বুথের মানুষ তাঁকে ভোট দেননি, তা হলে সেই এলাকার ভোটারদের উপরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেমে আসতে পারে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, বুথভিত্তিক ফল ব্যবহার করে কোথাও উন্নয়ন আটকে দেওয়া, সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা কিংবা নির্বাচন-পরবর্তী হিংসা ঘটানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বর্তমান মামলাগুলিতে তাই সংসদীয় আসনের সামগ্রিক ফল প্রকাশ এবং পৃথক বুথের ভোটের প্রবণতা গোপন রাখার দাবি জানানো হয়েছে। আবেদনকারীদের অন্যতম আইনজীবী অশ্বিনী উপাধ্যায় বলেছেন, টোটালাইজার চালু হলে নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিহিংসা ও প্রাণহানির ঝুঁকি কমতে পারে।

এত দিনেও ব্যবস্থা চালু হয়নি কেন

টোটালাইজারের প্রস্তাব নতুন নয়। নির্বাচন কমিশন ২০০৮ সালে কেন্দ্রের কাছে প্রথম এই ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছিল; পরে আবারও প্রস্তাব পাঠানো হয়। ভারত ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড এবং ইলেকট্রনিক্স কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া যন্ত্রটির নমুনাও তৈরি করে। আইন কমিশন তার ২৫৫তম প্রতিবেদনে বিশেষত সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলিতে টোটালাইজার ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল।

কিন্তু সরকার-নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং মন্ত্রীগোষ্ঠী প্রস্তাবটিতে সম্মতি দেয়নি। রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেও ঐকমত্য তৈরি হয়নি। কমিশনের সাম্প্রতিক হলফনামায় বলা হয়েছে, ছয়টি জাতীয় দলের মধ্যে তিনটি-সহ অধিকাংশ মতামত টোটালাইজারের বিপক্ষে গিয়েছিল। ফলে প্রযুক্তি প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় বিধি সংশোধন হয়নি।

গোপনীয়তা বনাম স্বচ্ছতার দ্বন্দ্ব

টোটালাইজারের সবচেয়ে বড় সুবিধাই আবার তার বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তি। বর্তমানে প্রতিটি বুথের বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্রের হিসাব ‘ফর্ম ১৭সি’-তে নথিভুক্ত ভোটের সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। প্রার্থী ও তাঁদের গণনা-প্রতিনিধিরা যন্ত্র ধরে ধরে সেই যাচাই করতে পারেন। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এই একটির সঙ্গে অন্যটির সরাসরি মিলই বর্তমান গণনাব্যবস্থার স্বচ্ছতার মেরুদণ্ড।

১৪টি যন্ত্রের ভোট একসঙ্গে মেশানো হলে কোনও একটি যন্ত্রের ত্রুটি বা হিসাবের অসঙ্গতি সম্মিলিত ফলের আড়ালে চলে যেতে পারে। ভোটার-যাচাইযোগ্য কাগজের পত্র বা ভিভিপ্যাটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পদ্ধতিতেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। কমিশনের আশঙ্কা, বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্র নিয়েই যখন নানা প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তখন নতুন একটি পর্যাপ্ত আইনবিহীন যন্ত্র যোগ করলে নতুন বিতর্ক জন্মাতে পারে।

অতএব সুপ্রিম কোর্ট এখনও টোটালাইজার চালুর নির্দেশ দেয়নি। আদালত আসলে কেন্দ্রকে গোপন ভোটের পরিধি নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে বলেছে—গোপনীয়তা কি শুধু একজন ভোটারের পছন্দ আড়াল রাখবে, না তাঁর পাড়া বা গ্রামের সম্মিলিত রাজনৈতিক পছন্দও প্রতিশোধের হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবে? কেন্দ্রের জবাবের উপরেই নির্ভর করবে, ভারতীয় নির্বাচনব্যবস্থা ভোটের গোপনীয়তা এবং গণনার স্বচ্ছতার মধ্যে নতুন ভারসাম্য খুঁজবে কি না।