International

৫৪ বছর পর পর্দায় ফিরছেন সাহেবজান

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • মুম্বই: ৫৪ বছর আগে মুম্বইয়ের মারাঠা মন্দিরে ‘পাকিজা’র প্রথম প্রদর্শন।
  • উপস্থিত ছিলেন পরিচালক কামাল আমরোহি, ছবির প্রাণ মীনাকুমারী এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের বহু বিশিষ্ট মুখ।
  • অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে সেই কালজয়ী ছবি আবার ফিরছে দর্শকের সামনে—নতুন রূপে, নতুন ঔজ্জ্বল্যে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

মুম্বই: ৫৪ বছর আগে মুম্বইয়ের মারাঠা মন্দিরে ‘পাকিজা’র প্রথম প্রদর্শন। ছবির ক্যান সেদিন এসেছিল পালকিতে চড়ে। উপস্থিত ছিলেন পরিচালক কামাল আমরোহি, ছবির প্রাণ মীনাকুমারী এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের বহু বিশিষ্ট মুখ। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে সেই কালজয়ী ছবি আবার ফিরছে দর্শকের সামনে—নতুন রূপে, নতুন ঔজ্জ্বল্যে। দু’বছরের কঠিন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার-প্রক্রিয়া শেষে আগামী অক্টোবরে ফ্রান্সের লিয়ঁ শহরে ফেস্টিভ্যাল লুমিয়েরে পুনরুদ্ধার করা সংস্করণের বিশ্ব অভিষেক হবে ‘পাকিজা’র। তার পর ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবে হবে বিশেষ প্রদর্শন।

ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১৫৩ মিনিটের ছবিটি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এই কাজে সহযোগিতা করেছেন কামাল আমরোহির পরিবারের সদস্যেরাও। নষ্ট হয়ে যাওয়া মূল নেগেটিভ, বিবর্ণ রং, ছত্রাক ও আঁচড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন উপাদান থেকে ছবিটিকে পুরনো ঔজ্জ্বল্যে ফিরিয়ে আনা ছিল রীতিমতো দুঃসাধ্য কাজ।

ফাউন্ডেশনের পরিচালক শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর জানান, মূল ক্যামেরা নেগেটিভ পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা যায়, সেটি প্রায় গলে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে। অন্য উপাদানগুলির কোথাও রং বিবর্ণ, কোথাও আঁচড়, আবার কোথাও ছত্রাকের দাগ। দীর্ঘ অনুসন্ধানে পাওয়া ছবির কিছু মূল স্থিরচিত্রও পুনরুদ্ধারের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

রামনর্ড গবেষণাগার থেকে সংগ্রহ করা হয় একটি ইন্টারপজিটিভ এবং একটি সিনেমাস্কোপ ছাপ। পাশাপাশি ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন–ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অব ইন্ডিয়ায় সংরক্ষিত একটি কালার রিভার্সাল ইন্টারনেগেটিভও ব্যবহারের সুযোগ মেলে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এই সব উপাদান একত্র করেই ফিরিয়ে আনা হয়েছে ‘পাকিজা’র হারানো দৃশ্যঐশ্বর্য।

অওধের নবাবি সংস্কৃতির শেষ সময়কে পটভূমি করে তৈরি ‘পাকিজা’য় মীনাকুমারী অভিনয় করেছিলেন সাহেবজান নামে এক নর্তকীর ভূমিকায়—যাঁর জীবন করুণ পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রে মীনাকুমারীর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয় এই চরিত্র। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি ছবিটির পরিকল্পনা করেছিলেন কামাল আমরোহি। তাঁর স্ত্রী এবং শিল্পপ্রেরণা মীনাকুমারীর সৌন্দর্যের প্রতি যেন এক মহার্ঘ চলচ্চিত্র-শ্রদ্ধার্ঘ্য হয়ে উঠেছিল ‘পাকিজা’।

তবে ছবিটির নির্মাণকাহিনি তার গল্পের মতোই বিষাদময়। ১৯৫৬ সালে সাদা-কালোয় শুটিং শুরু হয়। দু’বছর পরে নির্মাতারা ইস্টম্যানকালারে চলে যান। অভিনেতা নির্বাচন বদল, চিত্রনাট্যের বারংবার সংশোধন, অর্থাভাব এবং প্রতিটি দৃশ্য নিয়ে কামাল আমরোহির নিখুঁত হওয়ার জেদ—সব মিলিয়ে ছবির কাজ ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে।

১৯৬৪ সালে ব্যক্তিগত মতবিরোধের জেরে কামাল আমরোহি ও মীনাকুমারী আলাদা হয়ে গেলে ছবির কাজ কার্যত থেমে যায়। ১৯৬৮ সালে যকৃতের গুরুতর অসুখে আক্রান্ত হন মীনাকুমারী। ছবিটি আদৌ শেষ হবে কি না, তা নিয়েই দেখা দেয় সংশয়। পরের বছর পর্যন্ত তোলা অংশগুলি দেখে অভিনেতা সুনীল দত্ত ও নার্গিস মুগ্ধ হন। তাঁদের অনুরোধেই অসুস্থ মীনাকুমারী অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে রাজি হন।

নির্মাণের দীর্ঘ পথে একের পর এক ধাক্কাও এসেছে। ছবির কিংবদন্তি চিত্রগ্রাহক জোসেফ ভিরশিং ১৯৬৭ সালে মারা যান। তাঁর তৈরি বিশেষ দৃশ্যভাষা অক্ষুণ্ণ রাখতে পরে দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট চিত্রগ্রাহক পর্যায়ক্রমে কাজটি শেষ করেন। ১৯৬৮ সালে প্রয়াত হন ছবির অবিস্মরণীয় গানগুলির সুরকার গুলাম মহম্মদও। শেষ পর্যন্ত নওশাদ ছবিটির আবহসংগীত সম্পূর্ণ করেন।

দীর্ঘ ১৫ বছরের নির্মাণযাত্রা শেষে ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় ‘পাকিজা’। তখন ভারতীয় ছবিতে উর্দু-প্রভাবিত, সুরুচিসম্পন্ন প্রাসাদোপম কাহিনিচিত্রের যুগ অনেকটাই অস্তমিত। তার জায়গা নিচ্ছিল শহুরে হিংসা ও ক্ষোভনির্ভর ছবির জনপ্রিয়তা। ফলে প্রথম দিকে প্রত্যাশিত সাড়া না মিললেও সমালোচকেরা ছবিটির শিল্পমূল্য স্বীকার করেছিলেন।

মুক্তির মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরে, ৩১ মার্চ মীনাকুমারীর মৃত্যু ‘পাকিজা’কে ঘিরে দর্শকদের আবেগ আরও গভীর করে দেয়। ধীরে ধীরে ছবিটি বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করে এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পাকাপাকি জায়গা করে নেয়।

এ বার লিয়ঁর চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্ব অভিষেকের পর লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবের বৃহৎ পর্দায় ফের হাঁটবেন সাহেবজান—তাঁর স্বপ্ন, প্রেম, অপমান আর অপূর্ণতার জগতে। প্রযুক্তি হয়তো ছবির বিবর্ণ রং ফিরিয়ে দিয়েছে, মুছে দিয়েছে সময়ের আঁচড়। কিন্তু ‘পাকিজা’র অন্তরের বিষাদ? ৫৪ বছর পরেও তা রয়ে গিয়েছে একই রকম অমলিন।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles