নেপাল বিপর্যয়ের পরে নতুন প্রশ্ন: ভারতের ঝুঁকির তালিকায় আছে হিমবাহ-হ্রদ, ঝুলন্ত হিমবাহ

যা জানা জরুরি
- নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ২৬ আগস্ট বরফ, পাথর ও জলের বিরাট স্রোত যে বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তার পরে ভারতের হিমালয় অঞ্চলের বিপদ-মানচিত্র নিয়েও নতুন করে…
- ভারতের নজরদারি ব্যবস্থায় বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদের একটি বিস্তৃত তালিকা রয়েছে।
- কিন্তু নেপালে যে ধরনের উঁচু ঢাল থেকে হিমবাহের অংশ খসে পড়ে বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে, সেই ‘ঝুলন্ত হিমবাহ’ এখনও দেশের মূল সরকারি ঝুঁকিতালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে ২৬ আগস্ট বরফ, পাথর ও জলের বিরাট স্রোত যে বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তার পরে ভারতের হিমালয় অঞ্চলের বিপদ-মানচিত্র নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভারতের নজরদারি ব্যবস্থায় বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদের একটি বিস্তৃত তালিকা রয়েছে। কিন্তু নেপালে যে ধরনের উঁচু ঢাল থেকে হিমবাহের অংশ খসে পড়ে বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে, সেই ‘ঝুলন্ত হিমবাহ’ এখনও দেশের মূল সরকারি ঝুঁকিতালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়।
জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ বা এনডিএমএ ভারতের ছয়টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ১৯৫টি হিমবাহ-হ্রদকে হঠাৎ ফেটে বন্যা ঘটানোর পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ৬৭টি ‘ক’ শ্রেণির—অর্থাৎ অতি উচ্চ ঝুঁকির। ৪৮টি ‘খ’ শ্রেণির বা উচ্চ ঝুঁকির এবং ৭৪টি ‘গ’ শ্রেণির বা মাঝারি ঝুঁকির। ছ’টির শ্রেণিবিন্যাস এখনও হয়নি।
তালিকায় সবচেয়ে বেশি, ৪৮টি হ্রদ রয়েছে হিমাচল প্রদেশে। সিকিমে ৪১টি, লাদাখে ৩৪টি, অরুণাচল প্রদেশে ৩২টি, জম্মু ও কাশ্মীরে ২৭টি এবং উত্তরাখণ্ডে ১৩টি। অতি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলির মধ্যে রয়েছে সিকিমের দক্ষিণ লোনাক, হিমাচলের গেপাং গাথ এবং জম্মু ও কাশ্মীরের ব্রাম সার। ২০২৩ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ লোনাক হ্রদ ফেটে তিস্তা অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। মৃত্যু হয়েছিল বহু মানুষের; ধ্বংস হয়েছিল ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তিস্তা-তিন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ওই বিপর্যয়ের পরেই ভারতের ঝুঁকি-চিহ্নিতকরণের কাজ দ্রুততর হয়।
কেন্দ্রীয় জল কমিশন আবার আরও বিস্তৃত পদ্ধতিতে নজরদারি চালাচ্ছে। তার ২০২৬ সালের জুনের প্রতিবেদনে ভারতীয় হিমালয়ের নদী অববাহিকায় দশ হেক্টরের বেশি আয়তনের ২,৮৪৩টি হ্রদ ও জলাশয় পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এগুলির মধ্যে ২,৪৮৫টি হিমবাহজাত হ্রদ। ভারতীয় ভূখণ্ডে থাকা ৬৮১টি হিমবাহ-হ্রদের মধ্যে শুধু জুন মাসেই ১৪৭টির জলীয় আয়তন বেড়েছে। সেগুলিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়েছে।
সমস্যা হল, এই দুই ব্যবস্থাই মূলত হ্রদকে কেন্দ্র করে তৈরি। কোনও হিমবাহ পিছিয়ে গেলে তার সামনে পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রাকৃতিক বাঁধের পিছনে জল জমে হ্রদ তৈরি হয়। সেই বাঁধ ভেঙে গেলে বিপুল জল একসঙ্গে নীচে নেমে আসে। কিন্তু নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সূচনা কোনও হ্রদ ফেটে হয়নি। পাহাড়ের খাড়া ঢালে আটকে থাকা হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়ে বরফ-পাথরের ধস সৃষ্টি করেছিল। তার পর ধ্বংসাবশেষ নদী আটকে অস্থায়ী হ্রদ তৈরি করে এবং বিপর্যয় কয়েকটি ধাপে নীচের জনপদে ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতের পক্ষে উদ্বেগের কারণ এখানেই। ভারতীয় বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান বা আইআইএসসি-র গবেষকেরা উত্তরাখণ্ডের অলকানন্দা অববাহিকাতেই ২১৯টি ঝুলন্ত হিমবাহ শনাক্ত করেছেন। এগুলির মোট আয়তন ৭১.৭ বর্গকিলোমিটার এবং মোট বরফের পরিমাণ আনুমানিক ২.৩৯ ঘনকিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ০.৭৪ ঘনকিলোমিটার বরফ সরাসরি ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। হিমবাহগুলির গড় ঢাল প্রায় ৩৪ ডিগ্রি; কয়েকটির নীচের পাথুরে ঢাল ৫০ ডিগ্রিরও বেশি খাড়া। উষ্ণতা বৃদ্ধি, বরফ গলে জল প্রবেশ কিংবা বরফের স্তর পাতলা হয়ে গেলে পাথরের সঙ্গে তার বন্ধন দুর্বল হতে পারে। তখন প্রায় কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই বরফের বিরাট অংশ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। হিমালয়ে এমন বিপদের পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক তালিকা এখনও তৈরি হয়নি।
গবেষকেরা ২৫টি ঝুলন্ত হিমবাহ ভেঙে পড়ার সম্ভাব্য ফলের অনুকরণ করেছেন। তাতে বদ্রীনাথে ধসপ্রবাহের উচ্চতা সর্বাধিক ৫১ মিটার, বদ্রীনাথ–মানা সড়কে ৪৮ মিটার এবং হনুমান চট্টিতে ৪০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। বিপন্ন এলাকার সম্ভাব্য জনসংখ্যা ২০০০ সালের ৩৮০ থেকে ২০৩০ সালে প্রায় ৮,৫০০-তে পৌঁছবে বলেও অনুমান।
এনডিএমএ বিপজ্জনক হ্রদের জল সৌরশক্তিচালিত পাম্প ও নল দিয়ে ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা করছে। বসানো হচ্ছে জলস্তর মাপার যন্ত্র ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। গত কয়েক মাসে অন্তত ৩০টি উচ্চঝুঁকির হ্রদে সরেজমিন অভিযানও হয়েছে। কিন্তু ঢাল থেকে আকস্মিক বরফ খসে পড়া আটকাতে হ্রদের জল কমানো কোনও সমাধান নয়।
নেপালের শিক্ষা তাই স্পষ্ট: বিপদ শুধু হিমবাহ-হ্রদে নয়, হিমবাহের মাথার উপরেও। ভারতের বর্তমান তালিকা পরিচিত বিপদের একটি অংশ ধরতে পারছে; কিন্তু ঝুলন্ত হিমবাহ, পাথর-বরফের ধস এবং তার থেকে জন্ম নেওয়া ধারাবাহিক বিপর্যয় এখনও নজরদারির বড় অন্ধ অঞ্চল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



