শ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, অশোধিত তেলের চড়া দাম এবং সরবরাহ-শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেও ভারতীয় অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভাল ফল করেছে। জাতীয় পরিসংখ্যান দফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের এপ্রিল–জুন ত্রৈমাসিকে প্রকৃত মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি বেড়েছে ৭.৮ শতাংশ। জানুয়ারি–মার্চে বৃদ্ধির সংশোধিত হার ছিল ৮.৬ শতাংশ। সেই তুলনায় গতি কিছুটা কমলেও, এক বছর আগের একই ত্রৈমাসিকের ৬.৯ শতাংশ বৃদ্ধির চেয়ে বর্তমান ফল যথেষ্ট ভাল। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অনুমান করেছিল ৭ শতাংশ; রয়টার্সের অর্থনীতিবিদদের সমীক্ষায় পূর্বাভাস ছিল ৭.১ শতাংশ। অর্থাৎ ফলাফল প্রত্যাশাকে স্পষ্ট ভাবেই ছাপিয়ে গিয়েছে। এনএসও-র মূল প্রতিবেদনAttachment.png

এই পরিসংখ্যান থেকে তিনটি প্রধান বার্তা পাওয়া যায়।

প্রথমত, ভারতীয় অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী।

ব্যক্তিগত ভোগব্যয় বেড়েছে ৭.১ শতাংশ, এক বছর আগে যা ছিল ৬.৮ শতাংশ। গত বছরের আয়কর ছাড় এবং পণ্য ও পরিষেবা করের বোঝা কমানোর ফলে পরিবারের হাতে খরচযোগ্য অর্থ বেড়েছিল। তার সুফল এখনও বাজারে দেখা যাচ্ছে। শক্তিশালী বিক্রি সংস্থাগুলির মুনাফা ও বিনিয়োগের আগ্রহও বাড়িয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল বিনিয়োগের উত্থান। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার এক বছর আগের ৫.৮ শতাংশ থেকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১২ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তথ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ, ধাতু ও পরিকাঠামোয় নতুন লগ্নির সঙ্গে ব্যাঙ্কঋণের প্রবাহও বেড়েছে। জুনের শেষে কৃষি, শিল্প ও পরিষেবা মিলিয়ে ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ১৮.৩ শতাংশ—এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দ্রুততম। উৎপাদন শিল্প বেড়েছে ৯.২ শতাংশ এবং আর্থিক, আবাসন ও পেশাদার পরিষেবা ১২.১ শতাংশ। ফলে বৃদ্ধিকে শুধু সরকারি ব্যয় বা কোনও একটি ক্ষেত্রের কৃতিত্ব বলা যাবে না। রয়টার্সের বিশ্লেষণAttachment.png

সরকারের ভূমিকার আর একটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত তার প্রয়োজনীয় অশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়েও বিকল্প উৎস থেকে তেল আনা এবং দেশের বাজারে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের বড় ঘাটতি ঠেকানো গিয়েছিল। সরবরাহ সত্যিই ভেঙে পড়লে মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন, পরিবহণ ও ভোগ—তিনটিই ক্ষতিগ্রস্ত হত।

দ্বিতীয়ত, বৃদ্ধির সাফল্যের জন্য সরকারকে রাজকোষে মূল্য দিতে হয়েছে।

মোট মূল্য সংযোজন বা জিভিএ বেড়েছে ৮.২ শতাংশ, অথচ জিডিপি বেড়েছে ৭.৮ শতাংশ। জিডিপি হল জিভিএ-র সঙ্গে নিট পরোক্ষ কর যোগ করার ফল। জিডিপি বৃদ্ধির হার জিভিএ-র চেয়ে ০.৪ শতাংশ-বিন্দু কম হওয়ার অর্থ, কর ও ভর্তুকির সমীকরণ বৃদ্ধিকে কিছুটা নিচে টেনেছে।

যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল ও সারের দাম বাড়লেও তার সম্পূর্ণ বোঝা সরকার গ্রাহক ও কৃষকের উপরে চাপায়নি। ফলে ভর্তুকির খরচ বেড়েছে। অন্য দিকে, চলতি দামে বা নামমাত্র জিডিপি বেড়েছে ১০.৩ শতাংশ—ঐতিহাসিক মানদণ্ডে যা খুব বেশি নয়। অতএব কর আদায়ে অপ্রত্যাশিত বিপুল লাভের সম্ভাবনাও সীমিত। তেলের দাম দীর্ঘদিন উঁচু থাকলে রাজকোষ ঘাটতি এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি—দুইয়ের উপরেই চাপ বাড়বে।

তৃতীয়ত, একটি ভাল ত্রৈমাসিক যেন আত্মতুষ্টির কারণ না হয়।

করছাড়ের ফলে চাহিদার যে প্রাথমিক জোয়ার এসেছিল, সময়ের সঙ্গে তার প্রভাব কমবে। কৃষি উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৩.৬ শতাংশ। দুর্বল বর্ষা গ্রামীণ আয় ও খাদ্য উৎপাদনে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারের আশপাশে থাকায় মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও কাটেনি। মূল্যস্ফীতি বাড়লে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে সুদ বাড়াতে হতে পারে, যার ধাক্কা পড়বে ঋণ, বিনিয়োগ ও গৃহস্থের খরচে।

সুতরাং ৭.৮ শতাংশ নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য—বিশেষত যুদ্ধ ও তেল-সঙ্কটের পটভূমিতে। কিন্তু এটি প্রধানত ভারতের সাময়িক অভিঘাত সামলানোর ক্ষমতার প্রমাণ; দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তার শংসাপত্র নয়। সাত শতাংশের বেশি বৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে উৎপাদন শিল্পের বিস্তার, রফতানির প্রতিযোগিতাশক্তি, কর্মসংস্থান এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে স্থায়ী ভিত্তি দিতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জুন ত্রৈমাসিকের পরিসংখ্যানে আড়াল হয়ে থাকা চাপগুলি পরবর্তী মাসগুলিতে আরও স্পষ্ট হতে পারে।