হাইলাইটস:
- তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের বিজেপিমুখী করার নেপথ্যে উঠে এলেন অন্ধ্রপ্রদেশের বিজেপি সাংসদ সি এম রমেশ।
- নিজেই দাবি করেছেন, “দু’ঘণ্টা সময় পেলেই কাউকে বিজেপিতে যোগ দিতে রাজি করাতে পারি।”
- হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি, বহু তৃণমূল সাংসদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে।
- ২০২০ সালে তাঁর পুত্রের বিয়েতে দুবাই ও হায়দরাবাদের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তৎকালীন মমতা-অনুগত শতাব্দী রায়ও।
- বিদ্রোহী সাংসদদের সঙ্গে যোগাযোগে রমেশের ভূমিকা নিয়ে জোর রাজনৈতিক জল্পনা।
বাংলাস্ফিয়ার: তৃণমূল কংগ্রেসের চলমান ভাঙন-পর্বে সামনে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দর যাদব। কিন্তু পর্দার আড়ালে যে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কাজ করছেন, তাঁর নাম এতদিন রাজনৈতিক মহলে তেমনভাবে আলোচিত হয়নি। তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের বিজেপি সাংসদ সি এম রমেশ।
হিন্দুস্তান টাইমসের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তৃণমূলের একাধিক সাংসদকে বিজেপির দিকে টানার ক্ষেত্রে রমেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রশ্ন উঠছে, বাংলার রাজনীতির এই সংকটকালে একজন তেলুগুভাষী, প্রাক্তন টিডিপি নেতা কেন এত সক্রিয়ভাবে তৃণমূলের সাংসদদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে এই ‘অপারেশন’-এর দায়িত্ব দিলেও, অধিকাংশ ফোনকল এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের কাজটি করেছেন রমেশ। তিনি নিজেও বিষয়টি অস্বীকার করেননি। বরং হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর মন্তব্য, “মানুষকে বোঝানোই আমার দক্ষতা। আমাকে মাত্র দু’ঘণ্টা সময় দিন, আমি যে কাউকে বিজেপিতে যোগ দিতে রাজি করিয়ে দিতে পারি।”
এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংসদীয় সম্পর্ক। রমেশ জানিয়েছেন, তৃণমূলের অধিকাংশ সাংসদের সঙ্গে তাঁর বহু বছরের পরিচয়। সংসদের ক্যান্টিনে নিয়মিত আড্ডা, বিভিন্ন কমিটির কাজ এবং দিল্লির রাজনৈতিক পরিসরে ওঠাবসার ফলে একটি ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। সেই সম্পর্কই এখন রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, দলবদলের ক্ষেত্রে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত যোগাযোগ অনেক সময় বেশি কার্যকর হয়। বিশেষ করে যখন কোনও রাজনৈতিক দল দুর্বল অবস্থায় থাকে, তখন পুরনো সম্পর্ক, আস্থা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা— এই তিনের সমন্বয়েই সিদ্ধান্ত বদলাতে দেখা যায় অনেক নেতাকে। রমেশ সম্ভবত সেই মনস্তত্ত্বটিই কাজে লাগাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে একটি উল্লেখযোগ্য তথ্যও উঠে এসেছে। ২০২০ সালে রমেশের পুত্রের বিয়ে উপলক্ষে দুবাই এবং হায়দরাবাদে যে জমকালো অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন তৃণমূলের অন্যতম বিশ্বস্ত মুখ শতাব্দী রায়। আজ যাঁকে বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেই শতাব্দীর সঙ্গে রমেশের পরিচয় যে নতুন নয়, তা এই ঘটনাই প্রমাণ করে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিজেপি এবার কেবল সাংগঠনিক শক্তি বা কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রভাব নয়, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ককেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আর সেই নেটওয়ার্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন সি এম রমেশ।
তৃণমূলের অন্দরে এই খবর নতুন উদ্বেগও তৈরি করেছে। কারণ, যদি সত্যিই ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে সাংসদদের মধ্যে মত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তবে কেবল দলীয় শৃঙ্খলা দিয়ে সেই স্রোত আটকানো কঠিন হবে।
বাংলার রাজনৈতিক নাটকে তাই নতুন চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছেন সি এম রমেশ। তিনি মঞ্চের সামনের সারিতে নেই, মিছিলের মুখও নন। কিন্তু হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনের দাবি যদি সঠিক হয়, তাহলে তৃণমূলের বর্তমান সংকটের নেপথ্য কাহিনিতে তাঁর ভূমিকাই হয়তো সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে চলেছে।