বাংলাস্ফিয়ার: বিচারপতি দীপাঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি এস. সি. শর্মার বেঞ্চ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, পরিষেবার শর্ত এবং কার্যকালের মেয়াদ) আইন, ২০২৩-কে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া একাধিক আবেদনের শুনানি করছিল। ওই আইনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী, এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতার সমন্বয়ে গঠিত কমিটিই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নির্বাচন করবে।

আইনের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, শুধু এই কারণে যে নির্বাচন কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মিলিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই তাঁরা গণতন্ত্রের স্বার্থবিরোধীভাবে কাজ করবেন—এমন ধারণা করা সম্পূর্ণ ভুল।

মেহতার বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রীর পদ একটি সাংবিধানিক মর্যাদাসম্পন্ন পদ। সেই পদের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা মানে নির্বাচিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের যে আস্থা থাকা উচিত, তাকে দুর্বল করা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের উপরই আস্থা না থাকে, তবে মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচন করার সময়ও কি তাঁকে এই আদালতের কোনও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বা অন্য কোনও ‘বহিরাগত’-এর সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে?

এর জবাবে বিচারপতি দীপাঙ্কর দত্ত বলেন, “এখানে কিন্তু মন্ত্রী নিয়োগের প্রশ্ন নয়। মন্ত্রী তো ইতিমধ্যেই আছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে বেছে নেবেন। ফলে কমিটির অনুপাত দাঁড়াচ্ছে ২:১—দু’জন সরকারপক্ষের, একজন বিরোধী শিবিরের।”

এরপর মেহতা আদালতের কাছে আবেদন জানান, বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো হোক। তাঁর যুক্তি, “কেন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে এত আলোচনা হবে? কেন ধরে নেওয়া হবে যে কেবল একটি অঙ্গের উপরই আস্থা রাখা যায়, অন্যগুলির উপর নয়?”

এই আবেদন নিয়ে রায় সংরক্ষণ করেছে আদালত।

মেহতা আরও বলেন, “কমিটিতে কোন মন্ত্রী থাকবেন, তা সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। তিনি চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে রাখতে পারেন, পশুপালনমন্ত্রীকে রাখতে পারেন, মৎস্যমন্ত্রীকে রাখতে পারেন, এমনকি দফতরবিহীন মন্ত্রীকেও রাখতে পারেন। কিন্তু আদালত যদি বলেন যে দুই বনাম এক হওয়ায় সমস্যা রয়েছে, তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় আদালত সম্ভাব্যভাবে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখছে না।”

বিচারপতি দত্ত এর জবাবে বলেন, “এটি আস্থার অভাবের প্রশ্ন নয়। নির্বাচন কমিশনারকে অবশ্যই স্বাধীন ব্যক্তি হতে হবে। তাঁকে কারা নির্বাচন করছেন? আইন অনুযায়ী একটি কমিটি করছে। কিন্তু সেই কমিটিতে এমন ব্যক্তিরা থাকা উচিত নয় কি, যাতে নিরপেক্ষতার প্রকাশ স্পষ্ট হয়? আমরা বলছি না যে এই কমিটি নিরপেক্ষ নয়। আমরা শুধু বলছি, যেমন ন্যায়বিচার শুধু হওয়াই যথেষ্ট নয়, তা হচ্ছে বলেও মানুষের কাছে প্রতীয়মান হওয়া জরুরি—আমরা সেই দ্বিতীয় দিকটির কথাই বলছি।”

এরপর মেহতা মনোজ নারুলা বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলার রায়ের উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সেই মামলায় বলেছিল যে, প্রধানমন্ত্রী কাকে মন্ত্রী করবেন, সে বিষয়ে তাঁর সাংবিধানিক বিচক্ষণতার উপর আস্থা রাখতে হবে। সেই নীতিই বর্তমান মামলার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।

বিচারপতি দত্ত বলেন, “এখানে কিন্তু মন্ত্রী নিয়োগের প্রশ্ন নয়। মন্ত্রিসভায় কে থাকবেন, তা সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর এক্তিয়ার। সেই সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়ে গেছে। এখন তিনি মন্ত্রিসভার ২৫ জন সদস্যের মধ্যে একজনকে বেছে নিয়ে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ কমিটিতে রাখছেন। বিষয়টি তার পরের ধাপ।”

মেহতা জবাবে বলেন, “আমি বলতে চাইছি, মনোজ নারুলা মামলার মূল নীতি হল—প্রধানমন্ত্রীর পদে একটি বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা রয়েছে। আমি বলছি না যে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বেছে নেবেন কি না। আমি বলছি, যদি তাঁর সিদ্ধান্তের উপরই আস্থা না থাকে, তাহলে মন্ত্রিসভা গঠনের সময়ও কি তাঁকে কোনও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বা অন্য কোনও বহিরাগতকে সঙ্গে নিতে হবে?”

তিনি আরও বলেন, মূল প্রশ্ন হল—রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক অঙ্গ কি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটির সিদ্ধান্তের উপর অনাস্থা প্রকাশ করতে পারে? কারণ, এমন অনাস্থার অর্থ দাঁড়ায় এই ধারণা করা যে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর মনোনীত মন্ত্রী সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গণতন্ত্র বা সংবিধানের মূল নীতির পরিপন্থীভাবে কাজ করতে পারেন।

মেহতা বলেন, “এটাই পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চের গড়ে তোলা Constitutional Trust Doctrine। আদালত যদি বলেন, এই কমিটির গঠন জনআস্থা জাগায় না, তাহলে একদিকে সংসদের প্রজ্ঞাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে।”

এই সময় বিচারপতি দত্ত ড. বি. আর. আম্বেদকরের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, “ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আজ দেশের কত রাজ্যে এমন মন্ত্রী রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে?”

এর জবাবে মেহতা বলেন, বিচারপতি নিয়োগে কলেজিয়াম ব্যবস্থা চালু হওয়ার যে ঐতিহাসিক রায়গুলি ছিল, পরে সেই রায়দানকারী কয়েকজন বিচারপতিও বলেছেন, তাঁদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।

এ প্রসঙ্গে বিচারপতি দত্ত মন্তব্য করেন, “আপনি বললেন বিচারপতিরা বিচারপতিদেরই নির্বাচন করেন। এখন তো আমাদেরই সন্দেহ হচ্ছে, আদৌ কি বিচারপতিরাই বিচারপতিদের নির্বাচন করেন?”

শেষে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনাস্থার বিষয় নয়। অবশ্যই আমরা প্রধানমন্ত্রীর উপর আস্থা রাখি। কিন্তু অতীতে যেভাবে বিষয়গুলি ঘটেছে, তার অভিজ্ঞতাও তো আমাদের সামনে রয়েছে। এই পর্যন্তই বলব।”