তিন মাসে ২৬টি নির্যাতনের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ খ্রিস্টান সংগঠন

যা জানা জরুরি
- পশ্চিমবঙ্গে গত তিন মাসে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ২৬টি ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হস্তক্ষেপ চাইল বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা।
- সংগঠনের দাবি, ওই ঘটনাগুলির মধ্যে মাত্র ১১টিতে থানায় প্রাথমিক অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
- গির্জা, প্রার্থনাগৃহ এবং খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছে তারা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিমবঙ্গে গত তিন মাসে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ২৬টি ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হস্তক্ষেপ চাইল বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা। সংগঠনের দাবি, ওই ঘটনাগুলির মধ্যে মাত্র ১১টিতে থানায় প্রাথমিক অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। আরও অনেক ঘটনার অভিযোগই সামনে আসেনি। গির্জা, প্রার্থনাগৃহ এবং খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দিয়েছে তারা।
১৭ সেপ্টেম্বরের ওই স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সম্পাদক হেরোদ মল্লিক। রাজ্যের ১৩ লক্ষের বেশি ক্যাথলিক ও অন্যান্য খ্রিস্টান বিশ্বাসীর প্রতিনিধিত্ব করার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের অভিযোগ, একাধিক জেলায় খ্রিস্টানদের সম্পর্কে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে। তার সঙ্গে চলছে শারীরিক আক্রমণ এবং বেছে বেছে হেনস্থা। এই পরিস্থিতিতে সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে বলে স্মারকলিপিতে জানানো হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠকও চেয়েছে সংগঠনটি। ধর্মযাজক ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি দল তাঁর কাছে গিয়ে ঘটনাগুলির তথ্য তুলে ধরতে চায়। সংগঠনের বক্তব্য, তাদের সংগ্রহ করা তথ্য যাচাই করা হয়েছে। জেলা পুলিশকে অবিলম্বে অভিযোগ গ্রহণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে। যাচাই না হওয়া উগ্রপন্থী প্রচারের ভিত্তিতে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বন্ধের দাবিও রয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা। তাদের দাবি, নথিভুক্ত অভিযোগগুলির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আক্রান্তদের থানায় অভিযোগ দায়ের করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে অথবা নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। সংগঠনটির বক্তব্য, এর ফলে এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে, যেন এই ধরনের হিংসার ঘটনা আদৌ ঘটছে না।
স্মারকলিপিতে পরিচিত ব্যক্তির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংগঠনের অভিযোগ, আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাকে কখনও কখনও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ বলে যুক্তিসংগত দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। হামলার নিন্দা করার পরিবর্তে এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হলে উগ্র গোষ্ঠীগুলি পরোক্ষে উৎসাহ পায়। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই অভিযোগের সূত্রে নির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজকল্যাণে খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলির দীর্ঘদিনের অবদানের কথাও স্মারকলিপিতে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, রাজ্য সরকারের উপরে দীর্ঘদিনের আস্থা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতি তাদের উদ্বিগ্ন করেছে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করতে স্বচ্ছ তদন্ত এবং ঝুঁকির মুখে থাকা গির্জা, প্রার্থনাগৃহ ও প্রতিষ্ঠানগুলিতে যথেষ্ট পুলিশি নিরাপত্তা চেয়েছে তারা। আবেদনটি সব জেলার প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই। ধর্মাচরণের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সব সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি উদ্যোগ দাবি করা হয়েছে।
এই আবেদনের পটভূমিতে রয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার খবর। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হাওড়ার উলুবেড়িয়ায় ২৩ আগস্ট রবিবারের প্রার্থনা চলাকালীন একটি বাড়িতে জনতা ঢুকে পড়ে। জোর করে ধর্মান্তরণের অভিযোগ তুলে সেখানে মারধর ও ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ। পুলিশ গিয়ে যাজক এবং প্রার্থনায় অংশগ্রহণকারীদের উদ্ধার করে।
ওই প্রতিবেদনে পূর্ব বর্ধমানে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির সমাধিস্থ করার কাজে বাধা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুভাষগ্রামে নির্মীয়মাণ গির্জায় ভাঙচুরের কথাও উঠে এসেছিল। সুভাষগ্রামের ঘটনাটি ঘটে ৫ জুলাই। ধারাবাহিক হামলার আশঙ্কায় কয়েকটি জেলার খ্রিস্টান গোষ্ঠী বাড়িতে প্রার্থনাসভা ও ধর্মীয় সফর স্থগিত রেখেছে বলেও জানানো হয়েছিল। ধর্মান্তরণের অভিযোগ সামনে এলেও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বক্তব্য, সেই অভিযোগকে অজুহাত করে তাঁদের নিশানা করা হচ্ছে। হামলার অভিযোগের পাশাপাশি প্রার্থনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ, তাতে আক্রান্ত এলাকার বাইরেও দৈনন্দিন ধর্মাচরণে ভয়ের প্রভাব পড়ছে।
তবে ২৬টি ঘটনার হিসাব এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার বক্তব্য সংগঠনের অভিযোগ হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে। স্মারকলিপি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বা রাজ্য পুলিশের কোনও প্রতিক্রিয়া উল্লিখিত দুটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নেই। ফলে অভিযোগগুলির বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান এখনও ওই সূত্রগুলি থেকে জানা যাচ্ছে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



