বাংলাস্ফিয়ার: তীব্র গরমে কার্যত বিপর্যস্ত উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকা। দুপুর গড়াতেই জনশূন্য হয়ে যাচ্ছে রাস্তা ও বাজার। কোথাও কোথাও কৃষকরা দিনের বদলে রাতের বেলায় জমিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ দিনের বেলায় বাইরে দাঁড়ানোই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।

ভারতীয় আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দিল্লির সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী ‘কুলিং জোন’ বা শীতল আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে, যেখানে মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।

আবহাওয়া দফতরের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্যে এই পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই বেশি থাকবে। তাই দুপুরের সবচেয়ে গরম সময়ে ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ভারতে সমতল অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে এবং পার্বত্য অঞ্চলে ৩০ ডিগ্রির উপরে উঠলে তাকে তাপপ্রবাহ বা হিটওয়েভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

দৈনন্দিন জীবন কার্যত স্তব্ধ

প্রবল গরমের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে উত্তরপ্রদেশসহ উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে।

দেশের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তরপ্রদেশের বহু এলাকায় দুপুরের পর বাজার ও দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বেরোচ্ছেন না। অনেক ব্যবসায়ী সকাল সকাল কাজ সেরে নিচ্ছেন।

সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছেন কৃষকরা। দিনের বেলায় মাঠে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় অনেকে রাতের অন্ধকারে চাষের কাজ করছেন।

গরমের কারণে শিক্ষাব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক জেলায় আগেভাগেই গরমের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কোথাও কোথাও স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার উত্তরপ্রদেশের বান্দা শহরে তাপমাত্রা ৪৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরছে।

স্বাস্থ্য দফতর নাগরিকদের পর্যাপ্ত জল পান, শরীর ঠান্ডা রাখা এবং মাথা ঘোরা, বমিভাব বা উচ্চ জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

দিল্লিতে শীতল আশ্রয়কেন্দ্র

দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় তৈরি করা হয়েছে বিশেষ শীতল আশ্রয়কেন্দ্র। সেখানে রয়েছে এয়ার কুলার, পাখা, পানীয় জল এবং ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ওআরএস)।

বুধবার এমনই একটি কেন্দ্রে দেখা গেল, বহু মানুষ কুলারের সামনে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। সরকারি কর্মীরা তাঁদের হাতে ওআরএস মেশানো জল তুলে দিচ্ছেন।

২৫ বছরের পর্যটক বাশারত আহমেদ মাল্লা বলেন, “আমরা ঘুরতে এসেছিলাম। কিন্তু গরম এতটাই বেশি যে বাইরে থাকা কঠিন। এই কেন্দ্রের শীতল ব্যবস্থা আমাদের খুব উপকার করছে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট

জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই অস্বাভাবিক গরম কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

গত এক দশকে ভারতের ইতিহাসে নথিভুক্ত সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলির প্রায় সবকটিই দেখা গেছে। তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও তীব্রতাও ক্রমশ বাড়ছে।

পুনের ফ্লেম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলবায়ু বিষয়ক একাধিক প্রতিবেদনের লেখক অঞ্জল প্রকাশ বলেন, “মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত এক দশকে ভারতের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম ভারতের উষ্ণতা দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।”

তাঁর মতে, ভারত গরমের সঙ্গে পরিচিত দেশ হলেও জলবায়ু পরিবর্তন এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যার ফলে চরম তাপপ্রবাহ এখন আরও ঘন ঘন এবং আরও বিস্তৃত আকারে দেখা দিচ্ছে।

মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গবেষণা বলছে, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ভারতে প্রতি বছর গড়ে ১,১১৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে তাপপ্রবাহজনিত কারণে।

তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। কারণ বহু ক্ষেত্রে মৃত্যুর শংসাপত্রে সরাসরি ‘তাপপ্রবাহ’কে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। ফলে অসংখ্য মৃত্যুর ঘটনা সরকারি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।

ভারত যখন একের পর এক রেকর্ড গরমের মুখোমুখি হচ্ছে, তখন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন যে এটি আর সাময়িক আবহাওয়ার ঘটনা নয়। বরং ভবিষ্যতের নতুন বাস্তবতারই ইঙ্গিত, যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ উভয়েরই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি প্রয়োজন।