সোমবার লাদাখের মুখ্যসচিব আশিস কুন্দ্র এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণকে শক্তিশালী করা এবং প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলের উন্নয়নকে আরও কার্যকর করে তোলা। তাঁর কথায়, “লাদাখ প্রশাসন সাতটি জেলার প্রতিটিতে একটি করে স্বশাসিত হিল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি স্থানীয় স্বশাসন এবং তৃণমূল স্তরের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে।”
দুই থেকে সাত জেলা
দীর্ঘদিন লাদাখে ছিল মাত্র দুটি জেলা—লে ও কার্গিল। এই দুই জেলাতেই আগে থেকে স্বশাসিত হিল কাউন্সিল ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে আরও পাঁচটি নতুন জেলা তৈরি করা হয়—শ্যাম, নুব্রা, চাংথাং, জান্সকার এবং দ্রাস। ফলে জেলার সংখ্যা বেড়ে হয় সাত।
নতুন জেলা গঠিত হলেও এতদিন পর্যন্ত নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব সীমাবদ্ধ ছিল কেবল লে ও কার্গিলের দুই হিল কাউন্সিলের মধ্যেই। নতুন জেলাগুলির বাসিন্দারা একই ধরনের স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এবার সেই দাবিই কার্যত মেনে নিল প্রশাসন।
কী হবে নতুন কাঠামো?
ঘোষণা অনুযায়ী, সাতটি জেলার প্রত্যেকটিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি করে অটোনোমাস হিল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল গঠন করা হবে। পাশাপাশি গোটা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য থাকবে একটি ইউটি-স্তরের সংস্থা।
এই কাঠামো স্থানীয় প্রশাসনকে আরও ক্ষমতাসম্পন্ন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে রাস্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানীয় জল, কৃষি, পর্যটন এবং স্থানীয় পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে জেলার নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ?
২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন আইনের মাধ্যমে লাদাখ পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও সেখানে কোনও বিধানসভা নেই। ফলে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তাঁদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সীমিত।
গত কয়েক বছরে লাদাখে একাধিক সংগঠন সাংবিধানিক সুরক্ষা, ভূমি ও চাকরির অধিকার এবং অধিক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবিতে আন্দোলন করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই নতুন প্রশাসনিক কাঠামোকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
‘অনুচ্ছেদ ৩৭১-ধাঁচের’ কাঠামো কেন?
ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭১-এর বিভিন্ন উপধারার মাধ্যমে কয়েকটি রাজ্যকে বিশেষ প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভূমি, সামাজিক স্বার্থ এবং প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত থাকে।
লাদাখে ঘোষিত নতুন ব্যবস্থা সরাসরি অনুচ্ছেদ ৩৭১-এর আওতায় নয়। তবে প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি সেই ধরনের বিকেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার ধারণা অনুসরণ করে তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে স্থানীয় প্রতিনিধিদের হাতে উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্তের অধিকাংশ ক্ষমতা থাকবে।
উন্নয়ন ও প্রতিনিধিত্বে জোর
লাদাখ ভারতের অন্যতম বৃহত্তম কিন্তু জনসংখ্যার বিচারে অন্যতম ক্ষুদ্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক এলাকা, কঠোর আবহাওয়া এবং দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও অনেক বেশি।
সাতটি পৃথক হিল কাউন্সিল গঠিত হলে প্রতিটি জেলার নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা সহজ হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের দাবি, প্রয়োজন এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতিফলন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আরও বেশি করে ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের মতে, নতুন এই কাঠামো কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়, বরং লাদাখে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন নজর থাকবে—কবে এই কাউন্সিলগুলির গঠন, নির্বাচন এবং ক্ষমতার পরিধি নিয়ে বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করা হয়।