হাইলাইটস:

  • গুজরাত সরকারের ‘অ্যান্টি-র‍্যাডিক্যালাইজেশন’ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) নিয়ে নতুন বিতর্ক।
  • দাড়ি রাখা, নিকাব পরা, আরবি সম্ভাষণ ব্যবহার বা ধর্মীয় অনুশীলনের মতো বিষয়কে সন্দেহের সূচক হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
  • এক সাংসদ সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করে বলেছেন, এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের ‘প্রোফাইলিং’-এর শামিল এবং সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।
  • সরকারের দাবি, এসওপির উদ্দেশ্য কোনও সম্প্রদায়কে নিশানা করা নয়; কেবল চরমপন্থা প্রতিরোধে প্রশাসনকে সহায়তা করা।

বাংলাস্ফিয়ার: গুজরাত সরকারের প্রণীত ‘অ্যান্টি-র‍্যাডিক্যালাইজেশন’ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। অভিযোগ, এই নির্দেশিকায় এমন কিছু আচরণ ও পরিচয়ের বৈশিষ্ট্যকে সম্ভাব্য ‘র‍্যাডিক্যালাইজেশন’-এর লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা মূলত মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর ফলে গোটা একটি সম্প্রদায়কে সন্দেহের চোখে দেখার প্রবণতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিরোধী নেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং আইন বিশেষজ্ঞরা।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এসওপির সেই অংশ, যেখানে দাড়ি রাখা, নিকাব বা বোরকা পরা, আরবি ভাষায় সম্ভাষণ করা, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি আকস্মিকভাবে বেশি ঝোঁক, অথবা নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক পরার মতো বিষয়কে সম্ভাব্য সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। সমালোচকদের বক্তব্য, এগুলি কোনওভাবেই উগ্রপন্থার নির্ভরযোগ্য সূচক হতে পারে না। বরং এগুলি লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ধর্মীয় অনুশীলন।

এই বিষয়টি সংসদেও পৌঁছেছে। এক সাংসদ অভিযোগ করেন, এসওপির ভাষা এমন যে, তা কার্যত মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘প্রোফাইল’ করার পথ খুলে দেয়। তাঁর বক্তব্য, কোনও ব্যক্তি কী পোশাক পরছেন, কী ভাষায় সম্ভাষণ জানাচ্ছেন বা কীভাবে ধর্ম পালন করছেন, তার ভিত্তিতে সন্দেহ তৈরি করা ভারতের সংবিধানে স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমতার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি এসওপি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।

সমালোচকদের মতে, নিরাপত্তা সংস্থার প্রশিক্ষণপুস্তকে এই ধরনের নির্দেশনা থাকলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ বা প্রশাসনিক কর্মীদের মধ্যে পূর্বধারণা তৈরি হতে পারে। ফলে নিরপরাধ মানুষ অযথা নজরদারি, জিজ্ঞাসাবাদ বা হয়রানির মুখে পড়তে পারেন। এতে সাধারণ নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে আস্থার সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, গুজরাত সরকারের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকারের দাবি, এসওপির উদ্দেশ্য কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করা নয়। এটি মূলত পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজকর্মী ও স্থানীয় প্রশাসনের জন্য একটি নির্দেশিকা, যাতে প্রাথমিক পর্যায়েই চরমপন্থার লক্ষণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সরকারের বক্তব্য, কোনও একক বৈশিষ্ট্যকে অপরাধ বা উগ্রপন্থার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং একাধিক আচরণগত পরিবর্তন একসঙ্গে দেখা গেলে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিশ্বজুড়েই উগ্রপন্থা মোকাবিলায় ‘আর্লি ওয়ার্নিং’ বা প্রাথমিক সতর্কতার ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় পরিচয়, পোশাক বা ভাষাকে প্রধান সূচক হিসেবে ব্যবহার করলে তা উল্টো ফল দিতে পারে। কারণ এতে প্রকৃত হুমকি চিহ্নিত করার বদলে গোটা সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলিও সতর্ক করেছে যে, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। কোনও নাগরিকের বিশ্বাস, পোশাক বা সম্ভাষণকে সন্দেহের ভিত্তি বানানো হলে তা বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ ডেকে আনতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তৎপরতার কার্যকারিতাও কমে যেতে পারে।

এই বিতর্ক নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন রাজ্যে নিরাপত্তার স্বার্থে তৈরি কিছু নির্দেশিকা বা নজরদারি ব্যবস্থাকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করা হয়েছে। তবে গুজরাতের এই এসওপি সেই বিতর্ককে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। এখন নজর থাকবে, রাজ্য সরকার নির্দেশিকায় কোনও সংশোধন আনে কি না এবং সংসদ ও জনপরিসরে ওঠা আপত্তির কী জবাব দেয়। একই সঙ্গে এই ঘটনায় আবারও প্রশ্ন উঠেছে—সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার প্রয়োজনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কীভাবে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতাও সমানভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়।