হাইলাইটস:

  • বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর বিতর্কে আর্জেন্টিনা।
  • ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস’ লেখা ব্যানার হাতে উদযাপন করেন ফুটবলাররা।
  • ফিফার কাছে তদন্তের দাবি জানায় যুক্তরাজ্য।
  • একই সময়ে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস মেডওয়ে-এর গতিবিধি নিয়ে নতুন অভিযোগ তোলে বুয়েনস আইরেস।
  • ফকল্যান্ডস বা মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে চার দশকেরও বেশি পুরনো সার্বভৌমত্ব-বিতর্ক আবার আন্তর্জাতিক আলোচনায়।

বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের জয় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন বিতর্কে পরিণত হয়েছে। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা দর্শকদের দেওয়া একটি ব্যানার হাতে ছবি তোলেন। ব্যানারে লেখা ছিল— “Las Malvinas son Argentinas” বা “মালভিনাস আর্জেন্টিনার”

আর্জেন্টিনার কাছে দ্বীপপুঞ্জটির নাম মালভিনাস, আর যুক্তরাজ্য একে ফকল্যান্ডস নামে চেনে। এই ব্যানার প্রকাশ্যে প্রদর্শনের ঘটনাকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করে ব্রিটেন। লন্ডনের অভিযোগ, ফুটবলকে রাজনৈতিক প্রচারের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই কারণেই ফিফার কাছে বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।

ম্যাচের পরই বিতর্ক

আটলান্টায় অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নাটকীয় জয় পায় আর্জেন্টিনা। শেষ মুহূর্তে দুটি গোল করে তারা ফাইনালে ওঠে। মাঠে উৎসবের আবহে ফুটবলাররা সমর্থকদের সঙ্গে উদযাপনে মেতে ওঠেন। সেই সময়ই মালভিনাস-সংক্রান্ত ব্যানারটি সামনে আসে।

আর্জেন্টিনায় এই স্লোগান অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেশটির সংবিধানেও মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জের ওপর সার্বভৌমত্বের দাবি উল্লেখ রয়েছে। ফলে অনেক আর্জেন্টাইন নাগরিকের কাছে এটি জাতীয় পরিচয়ের অংশ। কিন্তু ব্রিটেনের কাছে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মতে, ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি এবং সেখানকার বাসিন্দারাই বহুবার ব্রিটেনের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন।

নতুন করে যুদ্ধজাহাজ বিতর্ক

ফুটবল-পরবর্তী বিতর্কের মধ্যেই আরেকটি অভিযোগ সামনে আনে আর্জেন্টিনা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির টহলজাহাজ এইচএমএস মেডওয়ে চলতি মাসের শুরুতে আর্জেন্টিনার জলসীমায় প্রবেশ করেছে এবং সে বিষয়ে আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কুইর্নো অভিযোগ করেন, এটি একটি “অবৈধ সামরিক অনুপ্রবেশ”। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে বুয়েনস আইরেসে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাসে কড়া ভাষায় কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র পাঠানো হয়েছে।

তবে যুক্তরাজ্য এখনও এই অভিযোগ স্বীকার করেনি। ব্রিটিশ পক্ষের অবস্থান, ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ ও তার আশপাশের জলসীমায় রয়্যাল নেভির উপস্থিতি নিয়মিত ও বৈধ।

কেন এত সংবেদনশীল ফকল্যান্ডস প্রশ্ন?

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ছোট্ট এই দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধের ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দীর। ১৮৩৩ সালে ব্রিটেন দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর থেকেই আর্জেন্টিনা সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে।

১৯৮২ সালে পরিস্থিতি যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার দ্বীপপুঞ্জ দখলের চেষ্টা করলে যুক্তরাজ্য পাল্টা সামরিক অভিযান চালায়। ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে ৯০০-রও বেশি মানুষ নিহত হন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।

যুদ্ধ শেষ হলেও বিরোধ কখনও মেটেনি। জাতিসংঘ দুই দেশকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানালেও এখনও পর্যন্ত কোনও স্থায়ী সমাধান হয়নি।

ফুটবল ও মালভিনাস: আবেগের সম্পর্ক

আর্জেন্টিনায় ফুটবল ও জাতীয়তাবাদ বহু ক্ষেত্রেই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে মালভিনাস প্রসঙ্গ নতুন নয়।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত “হ্যান্ড অব গড” গোলের পর তিনি বলেছিলেন, সেটি ছিল “কিছুটা মারাদোনা, কিছুটা ঈশ্বরের হাত”। আর্জেন্টিনার বহু সমর্থক সেই জয়কে ফকল্যান্ডস যুদ্ধের প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবেও দেখেছিলেন।

সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই এবারের বিশ্বকাপেও মালভিনাস-সংক্রান্ত ব্যানার ঘিরে আবেগ তৈরি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলি সাধারণত মাঠে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের বিরোধী।

ফিফার সামনে নতুন প্রশ্ন

ফিফার শৃঙ্খলাবিধিতে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শগত বার্তা বহনকারী প্রদর্শন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ফলে আর্জেন্টিনার উদযাপন ফিফার নজরে আসতে পারে। যদিও ব্যানারটি খেলোয়াড়দের পরিকল্পিত ছিল, নাকি সমর্থকদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে হাতে এসেছে— সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।

ফিফা এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও তদন্ত শুরু করেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানায়নি।

বিশ্বকাপের আনন্দে কূটনীতির ছায়া

বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসর বহু সময় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। এবারের ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। একদিকে আর্জেন্টিনার কাছে মালভিনাস জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রতীক, অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের কাছে ফকল্যান্ডস তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ড।

ফলে ফুটবল মাঠের এক মুহূর্তের উদযাপনই পুরনো ভূরাজনৈতিক বিরোধকে আবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বিশ্বকাপের ফাইনাল সামনে, কিন্তু মাঠের বাইরের এই সংঘাতও যে সমানভাবে নজর কেড়েছে, তা স্পষ্ট।