হাইলাইটস
- নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ব্রাজিল।
- টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপে শিরোপাহীন থেকে গেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা; দেশে একে বলা হচ্ছে ‘উল্টো হেক্সা’।
- কোচ কার্লো আনচেলত্তির কৌশল ও বদলি সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
- নেইমারের আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর ঘোষণার মধ্যেই ব্রাজিলে নতুন প্রজন্ম গড়ার দাবি জোরদার হয়েছে।
বিশ্বকাপে ষষ্ঠবারের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন—যাকে ব্রাজিলে ‘হেক্সা’ বলা হয়—আবারও অধরা থেকে গেল। রবিবার শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। ফলে টানা ছয়টি বিশ্বকাপ ধরে শিরোপার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। অনেকেই ব্যঙ্গ করে এই ব্যর্থতাকে ‘উল্টো হেক্সা’ বলছেন।
দেশজুড়ে এই হারের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত তীব্র। ব্রাজিলের প্রাক্তন ফুটবলার ও বর্তমানে ধারাভাষ্যকার নেতো বর্তমান দলকে কার্যত ধুয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, “এরা এমন একটি প্রজন্ম, যারা কিছুই জিততে পারেনি। ছয়জন ফুটবলারের ঝুলিতে একটি কোপা আমেরিকা ছাড়া আর কিছু নেই। শুরু থেকেই সবকিছু লজ্জাজনক ছিল। এরা পরাজিতদের প্রজন্ম, মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি দল।”
জাপানের বিরুদ্ধে শেষ বত্রিশের ম্যাচে কৌশলগত পরিবর্তনের জন্য প্রশংসিত হলেও নরওয়ের বিরুদ্ধে সেই কার্লো আনচেলত্তিই এখন সমালোচনার কেন্দ্রে। গ্লোবোএসপোর্তে-র সাংবাদিক কাহে মোতা লিখেছেন, আনচেলত্তির বদলি সিদ্ধান্ত দলকে আরও দুর্বল করে দেয়।
তাঁর মতে, “ব্রাজিল এমন একটি কৌশল নিয়েছিল, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে বলের দখল নরওয়েকে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণের ওপর ভরসা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনা কার্যত ব্যর্থ হয়। ব্রুনো গিমারায়েস পেনাল্টি থেকে গোল করলে ম্যাচের চিত্র বদলাতে পারত। কিন্তু ব্রাজিল এমন এক ধরনের ফুটবল খেলতে চেয়েছে, যা তাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে একেবারেই মেলে না। সুযোগ পেয়েও তারা নিষ্ঠুরভাবে শেষ করতে পারেনি। এই হারে অবিচারের অভিযোগও তোলা যায় না। এটাও বলা যায় না যে ব্রাজিল ব্রাজিলের মতো খেলেছিল।”
ম্যাচে ব্রাজিলের বল দখল ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপে এই পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর কোনও বিশ্বকাপ ম্যাচে ব্রাজিলের এটিই সর্বনিম্ন বল দখল। এই তথ্যই দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী বিশ্লেষক মাউরো সেজার পেরেইরার ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।
তাঁর বক্তব্য, “বছরের পর বছর ‘জোগা বনিতো’ বা সুন্দর ফুটবলের প্রচার করা একটি দল যদি প্রতিপক্ষকে বল ছেড়ে দিয়ে শুধু পাল্টা আক্রমণের অপেক্ষায় থাকে, তা লজ্জাজনক। এই ভীতু কৌশল ব্রাজিলের মানুষ কোনও দিন মেনে নেবে না। আনচেলত্তির কাজের মান হতাশাজনক।”
ইতিমধ্যেই আনচেলত্তিকে বরখাস্ত করার দাবি উঠতে শুরু করেছে। বিশ্বকাপের কয়েক মাস আগে তাঁকে নতুন চার বছরের চুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েছে ব্রাজিল ফুটবল সংস্থা।
নেইমারকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়েও মতভেদ স্পষ্ট। তাঁর সমর্থকদের দাবি, শুরু থেকেই মাঠে থাকলে প্রথমার্ধে ব্রাজিল যে পেনাল্টি নষ্ট করেছে, সেটি নেইমার গোল করতে পারতেন এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে যেত।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, নেইমারকে নামানোর সিদ্ধান্তই আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় ভুল। নেইমারকে মাঝখানে খেলানোর ফলে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও এন্দ্রিককে দুই প্রান্তে সরে যেতে হয়, যা দলের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।
মাউরো সেজার পেরেইরার ভাষায়, “ম্যাচের মোড় সেখানেই ঘুরে যায়। নেইমার নামার পর নরওয়ের বল দখল আরও বেড়ে যায়। তারা আরও বেশি আক্রমণ গড়ে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত গোলও করে। নেইমার, এন্দ্রিক ও ভিনিসিয়ুসকে একসঙ্গে খেলিয়ে ব্রাজিল বল কেড়ে নেওয়ার লড়াইয়ে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। নরওয়ে পুরোপুরি ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি ছিল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।”
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিউ জার্সিতে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। ঠিক সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ১৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও ৮০টি গোলের পর জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর যাত্রা শেষ হল।
বিদায়বেলায় নেইমার বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি। এখানেই আমার আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর এখানেই শেষ হল। এবার সব শেষ।”
এখন ব্রাজিলে নতুন করে দল গঠনের দাবি জোরালো হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, নেইমার, কাসেমিরোদের প্রজন্মের বিদায়ের সময় এসে গেছে। আশাবাদীরা চান, একসময়ের মতো আবার বিশ্বমানের মিডফিল্ডার ও ফুল-ব্যাক তৈরি হোক।
ব্রাজিলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য দুই বছর পরের কোপা আমেরিকা, যা সম্ভবত আবারও যুক্তরাষ্ট্রেই হবে। সেই প্রতিযোগিতাতেও যদি আনচেলত্তির ফল একই রকম হতাশাজনক হয়, তবে বছরে ৮৫ লক্ষ পাউন্ডের চুক্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁর কোচের পদ টিকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।