হাইলাইটস
- ইংল্যান্ডের কাছে রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে হারলেও মেক্সিকো জুড়ে হতাশার চেয়ে গর্বই ছিল বেশি।
- সমর্থকদের মতে, দলটি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ খেলেছে; ভাগ্য ও জর্ডান পিকফোর্ডের অসাধারণ গোলরক্ষাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
- রাষ্ট্রপতি ক্লাউদিয়া শেইনবাউম মেক্সিকোর আতিথেয়তা ও ঐক্যের প্রশংসা করেছেন।
- বিশ্বকাপে সহ-আয়োজক হিসেবে মেক্সিকো ফুটবলের প্রকৃত আবেগ ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরেছে।
- ১৭ বছরের গিলবার্তো মোরার উত্থান ভবিষ্যতের জন্য নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
মেক্সিকো সিটির প্রাণকেন্দ্রের সরু রাস্তা কায়ে হেনোভার বারগুলোতে সোমবার সকাল এগারোটার আগেই আবার গান-বাজনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। রাস্তায় ছড়িয়ে পড়া ভিড় দেখে মনে হচ্ছিল, আগের রাতের উৎসব যেন শেষই হয়নি। সর্বত্র মেক্সিকো জাতীয় দলের জার্সি। কেউ যদি আগের পনেরো ঘণ্টার খবর না জানতেন, তবে মনে করতেই পারতেন—এল ত্রি বুঝি বিশ্বকাপে আরেকটি স্মরণীয় জয় তুলে নিয়েছে।
বাস্তব অবশ্য ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের কাছে নাটকীয় পরাজয়ের পর গভীর রাতে পাসেও দে লা রেফর্মা প্রায় ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আগের ম্যাচে ইকুয়েডরকে হারানোর পর যে বুলেভার্ডে প্রায় ১৪ লক্ষ মানুষ নেমে এসেছিল, সেখানে ইংল্যান্ডের কাছে বিদায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়ে যায়। হাতে গোনা কয়েকজন সমর্থক তখনও পাশের গলিগুলিতে উদ্যাপন চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
তবু এই বিদায় শুধুই হতাশার ছিল না। মেক্সিকোর মানুষ বিশ্বাস করেন, তাঁদের দল একটি অসাধারণ ম্যাচ খেলেছে এবং বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা লড়াই উপহার দিয়েছে। অনেকেরই মত, ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড অসাধারণ না খেললে ফল অন্যরকমও হতে পারত। আবার আত্মসমালোচনাও ছিল—অ্যান্থনি গর্ডনকে পেনাল্টি আদায়ের সুযোগ করে দেওয়া দুর্বল রক্ষণই শেষ পর্যন্ত সর্বনাশ ডেকে এনেছে।
দেশের অন্যতম বড় সংবাদপত্র এল ইউনিভার্সাল লিখেছে, “এমন এক ধাক্কা, যার যন্ত্রণা চিরকাল থেকে যাবে।” একই সঙ্গে তারা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মেক্সিকোর “মহাকাব্যিক পারফরম্যান্স”-এরও প্রশংসা করেছে। অর্থাৎ হারলেও দলের লড়াই মানুষের গর্বের কারণ হয়ে উঠেছে।
মেক্সিকোর রাষ্ট্রপতি ক্লাউদিয়া শেইনবাউমও ইতিবাচক বার্তাই দিয়েছেন। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “আমরা গোটা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি, মেক্সিকোই বিশ্বের সেরা আয়োজক। আমাদের মানুষ আনন্দিত, ঐক্যবদ্ধ এবং অতিথিপরায়ণ।”
অবশ্য বাস্তব চিত্র কিছুটা জটিল। অপহরণ, মাদকচক্রের সহিংসতা এবং নানা সামাজিক সংকট এখনও দেশটিকে তাড়া করে বেড়ায়। বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনেক সময় সেই সমস্যাগুলিকে আড়াল করে দেয়। তবু বিদেশি সমর্থকদের অভিজ্ঞতা বলছে, আতিথেয়তা ও আন্তরিকতায় মেক্সিকো সত্যিই সবার মন জয় করেছে।
আজতেকা স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলাকালীন পরিবেশ ছিল উত্তপ্ত, আবেগময় এবং ঐতিহাসিক। কিন্তু সেই উত্তেজনা কখনও শত্রুতায় পরিণত হয়নি। ইংল্যান্ডের সমর্থকদের প্রতি মেক্সিকোর দর্শকদের আচরণ ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। খেলার আগে ও পরে দুই দেশের সমর্থক একসঙ্গে ছবি তুলেছেন, গান গেয়েছেন, আড্ডা দিয়েছেন এবং রাতভর উৎসব করেছেন।
এই ম্যাচের শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়ে গেল মেক্সিকোর বিশ্বকাপ সহ-আয়োজক হিসেবে ভূমিকা। যুক্তরাষ্ট্র আয়োজনের সবচেয়ে বড় অংশ সামলালেও, অনেকের মতে এই বিশ্বকাপের প্রকৃত প্রাণ ছিল মেক্সিকো। এখানে ফুটবল কেবল বিনোদন নয়, মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই আবেগই গোটা প্রতিযোগিতাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
তবু আফসোস থেকে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়াম, গুয়াদালাহারা ও মনতেরের স্টেডিয়ামগুলো এখন বাকি টুর্নামেন্টে আর ব্যবহৃত হবে না। আজতেকায় আধুনিকতার চাকচিক্য হয়তো কম, কিন্তু তার ইতিহাস, আবেগ এবং পরিবেশ তাকে অনন্য করে তুলেছে। প্রতিযোগিতার শুরুতে যাতায়াত ও পরিকাঠামোগত যে সমস্যাগুলি ছিল, সেগুলিও অনেকটাই দূর হয়ে গিয়েছিল। ফলে অনেকের প্রশ্ন—মেক্সিকো কি আরও অন্তত এক সপ্তাহ বিশ্বকাপের কেন্দ্রে থাকার সুযোগ পেতে পারত না?
তবে এই বিশ্বকাপ মেক্সিকোর ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য নতুন দরজাও খুলে দিয়েছে। মাত্র ১৭ বছর বয়সি গিলবার্তো মোরা ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে নজর কেড়েছেন। তাঁর নৈপুণ্য দেখে অনেকেই বিশ্বাস করছেন, বিশ্বফুটবল এক নতুন তারকার জন্ম প্রত্যক্ষ করল।
মেক্সিকোর ঘরোয়া লিগ আর্থিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় অনেক ফুটবলার দেশ ছাড়তে চান না। আবার যারা ইউরোপে যেতে চান, তাদের মূল্য এত বেশি ধরা হয় যে বড় ক্লাবগুলিও অনেক সময় পিছিয়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মেক্সিকোর প্রতিভা যতটা ছড়িয়ে পড়ার কথা, তা হয় না। অথচ ১৩ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষের এই ফুটবলপাগল দেশটির সম্ভাবনা অপরিসীম। ইউরোপের শীর্ষ লিগে আরও বেশি মেক্সিকান ফুটবলারের সুযোগ তৈরি হলে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথ অনেকটাই প্রশস্ত হবে।