হাইলাইটস:

  • অতিরিক্ত সময়ে মিকেল মেরিনোর গোলে পর্তুগালকে ১-০ হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন।
  • ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেললেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো; বিদায়টা রইল নিঃশব্দ ও হতাশার।
  • মাঝমাঠের দখল, বল নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত ফুটবলে ম্যাচের বড় অংশে এগিয়ে ছিল স্পেন।
  • শেষ আটে স্পেনের প্রতিপক্ষ হবে যুক্তরাষ্ট্র অথবা বেলজিয়াম।

বাংলাস্ফিয়ার: অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে যে গোলটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করল, সেটি এল এমন এক লম্বা, কিছুটা অপ্রচলিত গড়নের ফুটবলারের পা থেকে, যাঁর নাম হয়তো ম্যাচের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল না। ফেরান তোরেসের বাড়ানো পাস ধরে বক্সে ঢুকে অসাধারণ স্থিরতায় পর্তুগালের গোলরক্ষক দিয়োগো কোস্তাকে পরাস্ত করেন মিকেল মেরিনো। দীর্ঘ সময় ধরে ছন্নছাড়া ও স্নায়ুচাপপূর্ণ লড়াইয়ের পর সেটিই হয়ে ওঠে জয়ের গোল।

গোলের পর মেরিনোর উদ্‌যাপনও ছিল আবেগে ভরা। ২০২৪ সালের ইউরোয় জার্মানির বিরুদ্ধে জয়সূচক গোল করার পর যেমন কর্নার ফ্ল্যাগ ঘিরে দৌড়েছিলেন, এবারও ঠিক তেমনই দৌড়ালেন। এটি ছিল তাঁর বাবা আঞ্জেল মেরিনোর ১৯৯১ সালে স্টুটগার্টে ওসাসুনার হয়ে গোল করার পরের উদ্‌যাপনের পুনরাবৃত্তি।

মাঠের এক প্রান্তে যখন স্পেনের উল্লাস, অন্য প্রান্তে তখন নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। শেষ বাঁশি বাজার পর তিনি কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে মাঠের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অনিবার্য পরিসমাপ্তির বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করা ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তাঁর নাম অমর হয়ে থাকবে, কিন্তু সপ্তম বিশ্বকাপে সেই কীর্তি আর বাড়ানো হবে না। ৪১ বছর বয়সে বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর যাত্রা শেষ হল।

রোনাল্ডোর এই বিদায়ের ইঙ্গিত অবশ্য অনেক দিন ধরেই স্পষ্ট হচ্ছিল। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় সুইৎজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁকে প্রথম একাদশের বাইরে রাখা হয়েছিল। তাঁর পরিবর্তে নেমে গনসালো রামোস হ্যাটট্রিক করে পর্তুগালকে ৬-১ ব্যবধানে জেতান। তখন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, জাতীয় দলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রোনাল্ডোর সময় ফুরিয়ে আসছে।

এই ম্যাচে তাঁর বিদায়কে নাটকীয় বলা যায় না, আবার লড়াকু বিদায়ও বলা কঠিন। বরং পুরো ম্যাচে তিনি ছিলেন প্রায় নিষ্প্রভ। সেটাই হয়তো সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড়ের উত্তরাধিকার শেষ দিকে এসে অহংবোধ ও নিজেকে ঘিরে অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে কিছুটা ম্লান হয়ে গেল বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। সমৃদ্ধ প্রতিভায় ভরা পর্তুগালের মাঝমাঠও যেন অনেক সময় তাঁর উপস্থিতির ভারে স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলেছে।

স্পেন জিতলেও আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন রোনাল্ডো। তিনি কিছু করলেও খবর, না করলেও খবর। ম্যাচের আগের দিন তাঁর সংবাদ সম্মেলনেও ছিল আত্মবিশ্বাস, রসিকতা, খোঁচা এবং একই সঙ্গে নিজের ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার এক আবেগঘন স্বীকারোক্তি। তবে মাঝেমধ্যে আত্মদয়ার সুরও স্পষ্ট ছিল।

এই প্রসঙ্গে লিওনেল মেসির সঙ্গে তুলনাও উঠে আসে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেসি নিজের খেলাকে বদলে নিয়েছেন। শরীরের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে কম দৌড়ে, নতুন নতুন জায়গায় অবস্থান নিয়ে, সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষায় থেকে তিনি এখনও ম্যাচের মোড় ঘোরাতে পারেন।

রোনাল্ডোর ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন খুব একটা দেখা যায়নি। তিনি এখনও মূলত মাঝখানেই খেলতে চান, বারবার বল দাবি করেন এবং সতীর্থদের ওপর সেই চাপও তৈরি হয়। কখনও ডান বা বাম দিকে কিংবা মাঝমাঠে নেমে এলেও তাতে আক্রমণের গতি কমে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে একটি দ্রুত পাল্টা আক্রমণে তাঁর গতি ও শক্তির ঘাটতি স্পষ্ট ধরা পড়ে। সামনে এগোতে না পেরে তাঁকে পিছিয়ে ডান দিকের ডিফেন্ডারের কাছে বল ফিরিয়ে দিতে হয়।

ম্যাচজুড়ে তাঁর চেনা কিছু দৃশ্যও দেখা গেছে—ধীরগতির স্টেপওভার, সতীর্থদের উদ্দেশে অসন্তোষ, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগ, হতাশার অঙ্গভঙ্গি এবং দূরপাল্লার কয়েকটি আশাবাদী শট। এগুলোর অনেকটাই যেন অতীতের উজ্জ্বল রোনাল্ডোর স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা আর সেই জায়গায় নেই।

গ্যালারিতে তাঁর একনিষ্ঠ সমর্থকদের আচরণও নজর কেড়েছে। লামিন ইয়ামাল বল পেলেই দুয়ো, রোনাল্ডো পড়ে গেলে প্রবল প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে যেন ম্যাচের বড় অংশটাই ঘুরপাক খেয়েছে একজন ফুটবলারকে ঘিরে। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে রোনাল্ডোকে অনেক সময় সেই শিশুর মতো মনে হয়েছে, যার বল বলে খেলায় সবাইকে তাঁকেই গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।

রোনাল্ডোর আবেগঘন বিদায়ের আড়ালে অবশ্য স্পেনের ফুটবলও প্রশংসার দাবিদার। দুই দলের শক্তিশালী মাঝমাঠের লড়াইয়ে বেশিরভাগ সময় এগিয়ে ছিল স্পেন। বলের দখল, ছন্দ এবং পাসিং—সব ক্ষেত্রেই তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। দীর্ঘ চোট কাটিয়ে ফেরা রদ্রি ধীরে ধীরে আবার আগের ছন্দে ফিরছেন। মাঝমাঠে তাঁর উপস্থিতি স্পেনকে স্থিরতা দিয়েছে।

পর্তুগালের হয়ে নুনো মেন্দেস আবারও দুর্দান্ত খেলেছেন। লামিন ইয়ামালকে দীর্ঘ সময় কার্যত আটকে রেখেছিলেন। প্রথমার্ধের শেষ দিকে তাঁর একটি ডিফ্লেক্টেড শট ক্রসবারে লাগে। কিন্তু পরে ইয়ামালের একটি শট ঠেকাতে গিয়ে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তেই স্পেনের তরুণ তারকা আরও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন।

তবু স্পেনের আক্রমণ নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ইউরো জয়ের সময় যে ধার ছিল, এবারের বিশ্বকাপে তা পুরোপুরি দেখা যায়নি। চোটের কারণে লামিন ইয়ামালও আগের মতো বিধ্বংসী নন। বাম প্রান্তেও নিকো উইলিয়ামসের মতো ধারাবাহিক হুমকি কেউ তৈরি করতে পারেননি।

তারপরও শেষ পর্যন্ত জয়ের জন্য যা প্রয়োজন, তা স্পেন করে দেখিয়েছে। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা মুখোমুখি হবে যুক্তরাষ্ট্র অথবা বেলজিয়ামের।

আর রোনাল্ডো? শেষ বাঁশির পর টেলিভিশন ক্যামেরা তাঁকে অনুসরণ করতে করতে দেখল, তিনি ধীরে ধীরে অন্ধকার টানেলের দিকে হাঁটছেন। আলো নিভে যাওয়ার বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লড়াই করা স্বাভাবিক, কখনও কখনও অনুপ্রেরণাদায়কও। কিন্তু তাঁর বিশ্বকাপ-বিদায়টি ছিল এতটাই নিস্তেজ যে, সেটি শেষ পর্যন্ত এক ধরনের অপূর্ণতার অনুভূতিই রেখে গেল।