হাইলাইটস
- ফিলাডেলফিয়ায় তীব্র দাবদাহের মধ্যে ১-০ গোলে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে শেষ আটে উঠল ফ্রান্স।
- ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, পেনাল্টি থেকে।
- বদলি নেমে দেজিরে দুয়ে দুর্দান্ত ড্রিবলে পেনাল্টি আদায় করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
- রক্ষণাত্মক ও শারীরিক ফুটবল খেলেও ফ্রান্সকে আটকে রাখতে পারেনি প্যারাগুয়ে।
- গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে লিওনেল মেসির সমতায় পৌঁছে গেলেন এমবাপ্পে।
- কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ মরক্কো।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয়ই শেষ কথা। শিল্প, সৌন্দর্য কিংবা চোখধাঁধানো আক্রমণাত্মক ফুটবল সব সময় সম্ভব হয় না। বিশেষ করে যখন পারদের পারা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে যায়। ফিলাডেলফিয়ার স্বাধীনতা দিবসের দাবদাহে তাই ফ্রান্স তাদের স্বভাবসিদ্ধ ঝলমলে ফুটবল কিছুটা তুলে রেখেছিল। কিন্তু গতি কমালেও শক্তি কমেনি। শেষ পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলে প্যারাগুয়েকে ১-০ হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেল দিদিয়ে দেশঁর দল।
ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল ফরাসিদের দখলে। প্রথমার্ধে এক সময় পরিসংখ্যান বলছিল, ফ্রান্স ২০৮টি পাস খেলেছে, আর প্যারাগুয়ে মাত্র ৩৩টি। কিন্তু এত বিপুল দখল সত্ত্বেও গোলের সামনে ধারালো হয়ে উঠতে পারছিল না ফরাসিরা। কারণ প্যারাগুয়ে নিজেদের অর্ধে প্রায় সব খেলোয়াড়কে নামিয়ে ঘন রক্ষণ গড়ে তোলে। সুযোগ পেলেই শক্ত ট্যাকল, শরীরী সংঘর্ষ এবং খেলার গতি নষ্ট করার কৌশল নেয় তারা।
প্রথমার্ধে ফ্রান্সের দখলদারি চোখে পড়লেও তা গোলে রূপান্তরিত হয়নি। প্যারাগুয়ে পরিকল্পিতভাবে ফরাসি আক্রমণকে মাঝমাঠেই আটকে দিচ্ছিল। অনেক সময় বলের বদলে খেলোয়াড়কে থামানোর চেষ্টাও দেখা যায়। ম্যাচজুড়ে একাধিক কড়া ট্যাকল, কনুইয়ের ব্যবহার এবং রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে লাগাতার আপত্তি জানাতে থাকে দক্ষিণ আমেরিকার দলটি। আশ্চর্যের বিষয়, ১৩টি ফাউল করেও তারা একটি হলুদ কার্ডও দেখেনি। বিপরীতে ১১টি ফাউল করা ফ্রান্সকে তিনটি হলুদ কার্ড দেখতে হয়।
দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা ছায়া নামার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সের খেলায়ও ছন্দ ফিরে আসে। ৫৫ মিনিটে মানু কোনের দূরপাল্লার শট দুর্দান্তভাবে রুখে দেন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। এরপরও একের পর এক আক্রমণ হলেও শেষ মুহূর্তের নিখুঁত পাস কিংবা ফিনিশিংয়ের অভাবে গোল আসছিল না।
এক ঘণ্টা খেলা পেরোতেই বড় সিদ্ধান্ত নেন কোচ দিদিয়ে দেশঁ। ব্র্যাডলি বারকোলাকে তুলে নামান তরুণ দেজিরে দুয়েকে। এই পরিবর্তনই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বাম প্রান্তে নেমেই ড্রিবল, গতি এবং সৃজনশীলতায় প্যারাগুয়ের রক্ষণকে বিপর্যস্ত করে দেন তিনি। ক্লান্ত ডিফেন্ডারদের বিরুদ্ধে তাঁর দৌড় ক্রমশ ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
৬৪ মিনিটে দুয়ে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে একে একে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এগিয়ে যান। তৃতীয় ডিফেন্ডার দিয়েগো গোমেস তাঁকে ফেলে দেন। প্রথমে রেফারি কোনও ফাউল দেননি। কিন্তু ভিডিও সহকারী রেফারির পরামর্শে সিদ্ধান্ত বদলান। পেনাল্টি স্পটও একবার নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল বলে কিছুটা বিলম্ব হয়। সব নাটকের শেষে স্পট কিকে গোলরক্ষককে ভুল পথে পাঠিয়ে বল জালে জড়ান এমবাপ্পে।
এই এক গোলই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। শেষ দিকে অবশ্য এমবাপ্পে আরও একটি গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। অতিরিক্ত সময়ে তাঁর পরপর দুটি শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন অরল্যান্ডো গিল। ফলে এমবাপ্পে বিশ্বকাপে ১৯ ম্যাচে ১৯ গোলেই আটকে থাকলেন। একই সঙ্গে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আবারও লিওনেল মেসির সমতায় পৌঁছে গেলেন তিনি।
ম্যাচ শেষে প্যারাগুয়ের রুক্ষ ফুটবল নিয়ে ক্ষোভ লুকোননি ফরাসি অধিনায়ক। এমবাপ্পে বলেন, “আমরা শুধু সুন্দর আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে জানি, এমন নয়। প্রয়োজনে কঠিন লড়াইও করতে পারি। ওরা ভেবেছিল আমরা যেন টাক্সেডো পরে খেলতে এসেছি। কিন্তু দরকার হলে আমরাও কঠিন ফুটবল খেলতে জানি। আমরা জিতেছি, কারণ আমরা ওদের চেয়ে ভালো দল।”
পরিসংখ্যানেও ফরাসি আধিপত্য স্পষ্ট। বলের দখল ছিল ৭২ শতাংশ, যেখানে প্যারাগুয়ের মাত্র ২৮ শতাংশ। ফ্রান্স ১২টি কর্নার পায়, প্যারাগুয়ে মাত্র ২টি। গোলের উদ্দেশে ফরাসিরা ১৪টি শট নেয়, যার মধ্যে ৪টি লক্ষ্যে ছিল। প্যারাগুয়ের পাঁচটি শটের একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি।
এই ম্যাচে প্যারাগুয়ের একমাত্র সাফল্য ছিল দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রান্সকে আটকে রাখা। শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিরোধও ভেঙে পড়ে। জার্মানিকে বিদায় করে যে দল চমক দেখিয়েছিল, তারা এবার আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে বুঝে গেল।
অন্যদিকে ফ্রান্স হয়তো এদিন তাদের সেরা ফুটবল খেলেনি, কিন্তু বড় দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল—খারাপ দিনেও জয় ছিনিয়ে নেওয়া। দাবদাহ, শক্ত প্রতিপক্ষ এবং ধৈর্যের পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে সেই কাজই করল দেশঁর দল। এখন তাদের সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা। পাঁচ দিন পর কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ মরক্কো। সেখানে এমবাপ্পে ও তাঁর সতীর্থদের সামনে থাকবে শুধু সেমিফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নয়, বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও।