Home SportsFIFA 2026 মেক্সিকো ’৮৬ ছিল শিল্পের প্রতীক, ২০২৬-এর বিশ্বকাপ লোগো কেন হতাশ করল ডিজাইনারদের

মেক্সিকো ’৮৬ ছিল শিল্পের প্রতীক, ২০২৬-এর বিশ্বকাপ লোগো কেন হতাশ করল ডিজাইনারদের

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
13 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের লোগোকে এখনও সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রীড়া প্রতীক হিসেবে মনে করেন ডিজাইনাররা।
  • ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের লোগোকে ঘিরে মেক্সিকোসহ বিশ্বজুড়ে নকশাবিদদের মধ্যে তীব্র হতাশা তৈরি হয়েছে।
  • সমালোচকদের মতে, নতুন লোগোতে নেই কোনও মৌলিক ভাবনা, নেই তিন আয়োজক দেশের ঐক্যের প্রতিফলন।
  • ১৯৮৬ সালের লোগোর স্রষ্টা রুবেন সান্তিয়াগো হার্নান্দেজের অভিযোগ, নতুন নকশা অতিরিক্ত কর্পোরেটধর্মী এবং আবেগহীন।

চার দশক আগে মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু মাঠের ইতিহাসের জন্য নয়, তার অনন্য লোগোর জন্যও আজও কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার Diego Maradona-র ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল যেমন সেই আসরকে স্মরণীয় করে রেখেছে, তেমনই গ্রাফিক নকশার জগতে আলাদা স্থান করে নিয়েছে বিশ্বকাপের সেই প্রতীকচিহ্ন। অনেকের মতে, সেটিই ছিল ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল লোগো।

২০২৬ সালে মেক্সিকো তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক। তবে এবার তাদের সঙ্গে রয়েছে United States এবং Canada। কিন্তু এবারের লোগো প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বহু ডিজাইনারের মতে, নতুন লোগোটি একেবারেই অনুপ্রেরণাহীন, প্রাণহীন এবং কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের মতো।

১৯৮৬ সালের লোগোর স্রষ্টা রুবেন সান্তিয়াগো হার্নান্দেজ তখন ছিলেন তরুণ ডিজাইনার। একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাঁর নকশা নির্বাচিত হয়। তাঁর তৈরি লোগোতে একটি ফুটবল পৃথিবীর দুই অর্ধগোলককে যুক্ত করেছে। নিচে সবুজ অক্ষরে লেখা ছিল ‘Mexico 86’। এই নকশার মূল ভাবনা ছিল— ফুটবল পৃথিবীর মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে, আর ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত মেক্সিকোকেও বিশ্বসমাজের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ করে।

হার্নান্দেজ জানান, ১৯৮৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে অনিশ্চয়তা ও বিভাজনের আবহ ছিল। সেই কারণেই তিনি এমন একটি প্রতীক তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা ঐক্য, আশা এবং পুনর্গঠনের বার্তা বহন করবে। তাঁর কথায়, “একটি লোগো কেবল সুন্দর ছবি নয়, একটি ধারণার দৃশ্যমান রূপ।”

বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেক্সিকোর নকশার ঐতিহ্য আরও পুরনো। ১৯৬৮ সালের অলিম্পিকের জন্য মার্কিন ডিজাইনার Lance Wyman যে লোগো ও চিহ্নমালা তৈরি করেছিলেন, তা মেক্সিকোর আদিবাসী শিল্পরীতিকে আধুনিক রেখাচিত্রের সঙ্গে মিশিয়ে এক নতুন ভাষা তৈরি করে। সেই নকশা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে পরবর্তীতে মেক্সিকো সিটির মেট্রো ব্যবস্থার মানচিত্র ও নির্দেশক চিহ্ন তৈরির দায়িত্বও তাঁকেই দেওয়া হয়।

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের লোগোও তৈরি করেন ওয়াইম্যান। সেই ধারার প্রভাবই পরে হার্নান্দেজ তাঁর ১৯৮৬ সালের নকশায় নতুনভাবে ব্যবহার করেন। আজও সেই অক্ষররীতি ও নকশা পোশাক, স্মারক এবং ফ্যাশন পণ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি আন্তর্জাতিক পোশাক সংস্থাগুলিও সেই নকশা থেকে অনুপ্রাণিত সংগ্রহ বাজারে এনেছে।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের লোগো অত্যন্ত সরল। একটি বড় ‘২’ এবং ‘৬’-এর উপর বসানো হয়েছে বিশ্বকাপ ট্রফির ছবি। এটিই প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে ট্রফির বাস্তব ছবিকে লোগোর অংশ করা হয়েছে। কিন্তু ডিজাইনারদের অভিযোগ, এতে কোনও সৃজনশীল প্রতীকী ভাষা নেই। তিনটি আয়োজক দেশের সংস্কৃতি, রং বা পরিচয়েরও কোনও প্রতিফলন দেখা যায় না।

ক্রীড়া-লোগো বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস ক্রিমারের মন্তব্য, এটি “ভয়ঙ্কর”। নকশাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকীগুলিও বলেছে, মনে হচ্ছে যেন নকশা তৈরির চেয়ে বাণিজ্যিক প্রচারেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২৩ সালে লোগো উন্মোচনের সময় Gianni Infantino বলেছিলেন, এই নকশা তিন আয়োজক দেশের জন্য একটি যৌথ আহ্বান, যার মাধ্যমে প্রত্যেকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের অধ্যায় লিখবে। পরিকল্পনা ছিল, প্রতিটি আয়োজক শহর নিজেদের সংস্কৃতি অনুযায়ী লোগোর পৃথক সংস্করণ তৈরি করবে। বাস্তবে অবশ্য মূল লোগোটিই সর্বত্র ব্যবহৃত হয়েছে। শহরভেদে কেবল সংখ্যার ভেতরে স্টেডিয়ামের ছবি বসানো হয়েছে।

মেক্সিকোতে সাধারণ সমর্থকরাও সামাজিক মাধ্যমে নতুন লোগোর তীব্র সমালোচনা করেন। কেউ লেখেন, “চাইলেই আমি এর চেয়ে ভালো নকশা সাধারণ আঁকার সফটওয়্যারেই বানিয়ে দিতে পারি।” আরেকজনের মন্তব্য, “লোগোটা ভীষণই কুৎসিত।”

হার্নান্দেজের মতে, একটি সফল লোগো মুহূর্তকে নয়, একটি ধারণাকে ধারণ করে। তাঁর ভাষায়, “এটি আসলে কোনও লোগোই নয়। ট্রফির একটি ছবি, আর তার পেছনে দুটি সংখ্যা। একটি ছবি কখনও লোগো হতে পারে না। ছবি একটি মুহূর্তকে ধরে রাখে, কিন্তু লোগো হয়ে ওঠে চিরস্থায়ী প্রতীক।”

এই কারণেই, চার দশক পরেও মেক্সিকো ’৮৬-এর লোগো আজও নকশা শিক্ষার্থীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। অথচ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের প্রতীককে অনেকেই মনে করছেন একটি বড় হারিয়ে যাওয়া সুযোগ— যেখানে তিনটি দেশ, তিনটি সংস্কৃতি এবং ফুটবলের বিশ্বজনীন ঐক্যকে একসঙ্গে তুলে ধরার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles