হাইলাইটস
- বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় সোমবার সিয়াটলে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম।
- প্রায় সম্পূর্ণ মার্কিন সমর্থকে ভরা গ্যালারির চাপকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বেলজিয়াম শিবির।
- মার্চ মাসে প্রীতি ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রকে ৫-২ গোলে হারিয়েছিল বেলজিয়াম, তবে সেই ফলকে এখন আর প্রাসঙ্গিক মনে করছেন না ফুটবলাররা।
- লাল কার্ডের কারণে খেলতে পারবেন না মার্কিন দলের অন্যতম ভরসা ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগান।
- প্রতিপক্ষের নতুন কৌশল ও তিন ডিফেন্ডারের রক্ষণভাগ ভাঙতে নিজেদের পরিকল্পনা তৈরি রেখেছে বেলজিয়াম।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ঘরের মাঠের সমর্থন যে কত বড় শক্তি হতে পারে, তা বারবার দেখা গেছে। সোমবার সিয়াটলের বিশাল স্টেডিয়ামেও সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রায় আশি হাজার দর্শকের গর্জনে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন জানাবে গ্যালারি। কিন্তু এই আবহকে মোটেই ভয়ের কারণ বলে মনে করছে না বেলজিয়াম। বরং তাদের বিশ্বাস, এমন পরিস্থিতিতেই ঠান্ডা মাথা ও আত্মবিশ্বাসের প্রকৃত পরীক্ষা হয়।
বেলজিয়ামের বাঁ-প্রান্তের ডিফেন্ডার ম্যাক্সিম ডে কুইপার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, দর্শকদের আওয়াজ নয়, মাঠে নিজেদের ফুটবলটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, আশি হাজার দর্শক বিপক্ষে থাকুক বা পাশে, ফুটবলারদের কাজ একই—নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলা। তাই আবেগে ভেসে না গিয়ে সাহস ও সংযম নিয়েই মাঠে নামতে হবে।
ডে কুইপারের মন্তব্যে ছিল আত্মবিশ্বাসের স্পষ্ট ছাপ। তিনি বলেন, বড় ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তাই পার্থক্য গড়ে দেয়। গ্যালারির চাপে ভেঙে পড়লে প্রতিপক্ষ সুবিধা পাবে, কিন্তু নিজের খেলায় স্থির থাকলে সেই চাপ ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে যাবে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে এমন পরিবেশ নতুন কিছু নয় এবং অভিজ্ঞ ফুটবলাররা জানেন কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলাতে হয়।
একই সুর শোনা গেল ডান-প্রান্তের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় টিমোথি কাস্তান্যের গলায়। তাঁর মতে, দর্শকরা সবসময় শক্তি হয়ে ওঠেন না। ম্যাচ যদি যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী না এগোয়, তবে সেই একই দর্শক হতাশা থেকে নিজেদের দলকেই বাড়তি চাপে ফেলে দিতে পারেন। তাই শুরুতেই আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।
কাস্তান্যে আরও বলেন, মাঠে নেমে ফুটবলাররা যেন এক আলাদা জগতে চলে যান। তখন গ্যালারির আওয়াজ প্রায় শোনা যায় না। মনোযোগ থাকে শুধুই বল, সতীর্থ এবং কোচের নির্দেশে। ফলে বাইরে কী হচ্ছে, তা নিয়ে ভাবলে চলবে না।
এই দুই দলের মধ্যে চলতি বছর এটাই প্রথম লড়াই নয়। মার্চ মাসে আটলান্টায় অনুষ্ঠিত একটি প্রীতি ম্যাচে বেলজিয়াম যুক্তরাষ্ট্রকে ৫-২ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল। সেই বড় জয় তখন মার্কিন দলের বিশ্বকাপ সম্ভাবনা নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছিল। তবে বেলজিয়ামের ফুটবলারদের মতে, চার মাস আগের সেই ম্যাচের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কোনও তুলনা চলে না।
সেই ম্যাচে জোড়া গোল করা ডোডি লুকেবাকিও স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অনেক বদলে গেছে। তাঁর মতে, প্রীতি ম্যাচের পর থেকে মার্কিন দল নিজেদের খেলায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। ফলে আগের ফল দেখে আত্মতুষ্টির কোনও সুযোগ নেই।
ডে কুইপারও একই মত পোষণ করেন। তাঁর বক্তব্য, মার্চের ৫-২ ফলাফল ম্যাচের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেনি। গোলরক্ষক সেনে ল্যামেন্স দুর্দান্ত কিছু সেভ না করলে ম্যাচের চেহারা অন্যরকমও হতে পারত। তাই শুধু স্কোরলাইন দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ভুল হবে।
তিনি আরও জানান, তখন থেকেই বেলজিয়ামের কোচিং স্টাফের ধারণা ছিল বিশ্বকাপে আবার যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হতে হতে পারে। সেই কারণেই মার্চের ম্যাচ বিশ্লেষণ করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন, দুই দলেই এখন অনেক নতুন ফুটবলার রয়েছেন এবং কৌশলেও এসেছে পরিবর্তন। তাই পুরনো ম্যাচকে একমাত্র ভিত্তি করা যাবে না।
এবারের ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধাক্কা খেয়েছে তাদের অন্যতম নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানকে হারিয়ে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিরুদ্ধে বিতর্কিত লাল কার্ড দেখায় তিনি নির্বাসিত। গোটা টুর্নামেন্টে মার্কিন আক্রমণের অন্যতম ধারালো অস্ত্র ছিলেন বালোগান। তাঁর অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণভাগে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বালোগান না খেললেও বেলজিয়াম কোনও আত্মতুষ্টিতে ভুগছে না। ডে কুইপার বলেন, প্রতিপক্ষের দলে অনেক বিপজ্জনক ফুটবলার রয়েছেন। কে খেলবেন বা কে খেলবেন না, তা নিয়ে প্রকাশ্যে বেশি কিছু বলতে চান না তিনি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে বিকল্পের অভাব নেই।
অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার অ্যাক্সেল উইটসেল অবশ্য কৌশলগত দিক নিয়ে কিছুটা বিস্তারিত কথা বলেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন তিন ডিফেন্ডারের রক্ষণভাগ নিয়ে খেলছে। ফলে বেলজিয়ামকে নিজেদের আক্রমণের ধরন বদলাতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, এই রক্ষণভাগ ভাঙার মতো অস্ত্র তাদের দলে রয়েছে।
উইটসেল স্মরণ করিয়ে দেন, মার্চের প্রীতি ম্যাচেও বেলজিয়াম সেই রক্ষণব্যূহের বিরুদ্ধে সফল হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। এবার প্রতিটি ভুলের মূল্য অনেক বেশি। উপরন্তু, পুরো স্টেডিয়াম যখন প্রতিপক্ষের সমর্থনে মুখর থাকবে, তখন মানসিক দৃঢ়তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এই ম্যাচে তাই শুধু কৌশল বা দক্ষতার লড়াই নয়, মানসিক শক্তিরও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। একদিকে থাকবে ঘরের মাঠে উচ্ছ্বসিত মার্কিন সমর্থকদের প্রবল আবেগ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞ বেলজিয়ামের স্থিরতা। দুই দলেরই জানা, শেষ ষোলোয় দ্বিতীয় সুযোগ নেই। নব্বই মিনিটের লড়াই কিংবা অতিরিক্ত সময়—যেখানেই হোক, সামান্য ভুলও বিদায়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সিয়াটলের গর্জন শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি শক্তি দেবে, নাকি সেই চাপই উল্টে তাদের কাঁধে অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়াবে—তার উত্তর মিলবে সোমবার রাতেই। তবে বেলজিয়ামের বার্তা পরিষ্কার: গ্যালারির আওয়াজ নয়, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করবে মাঠের ফুটবল এবং স্নায়ুর দৃঢ়তা।