হাইলাইটস
- টেক্সাসের পোর্ট আর্থার শহরের পাশে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহত্তম তেল শোধনাগার, যার মালিক সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত আরামকো।
- বিশ্বকাপের একমাত্র জ্বালানি অংশীদার হিসেবে ফিফার সঙ্গে আরামকোর চুক্তি ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
- স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্যানসার, হাঁপানি, হৃদরোগসহ নানা অসুখের পেছনে দীর্ঘদিনের শিল্পদূষণ বড় কারণ।
- শহরের অধিকাংশ বাসিন্দা দরিদ্র, অথচ তাদের চারপাশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল সম্পদ উৎপন্ন হচ্ছে।
- পরিবেশকর্মীদের দাবি, ফিফা ও আরামকো সামাজিক দায়িত্বের কথা বললেও পোর্ট আর্থারের মানুষ কার্যত উপেক্ষিত।
বিশ্বকাপের মাঠে যখন কোটি কোটি দর্শক রঙিন বিজ্ঞাপনে মোড়া স্টেডিয়ামে ফুটবলের উৎসব উপভোগ করছেন, তখন সেই উৎসবের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক আরামকোর আরেকটি পরিচয় উঠে এসেছে টেক্সাসের পোর্ট আর্থার শহরে। এই ছোট শহরের মানুষ বলছেন, ফুটবলের ঝলমলে বিজ্ঞাপনের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে প্রতিদিন বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকার লড়াই করতে হয়।
পোর্ট আর্থারের পশ্চিম প্রান্তে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বিশালাকার ধাতব পাইপ, চিমনি, ট্যাঙ্ক আর ধোঁয়া উগরে দেওয়া শিল্প কমপ্লেক্স। এটি মোটিভা তেল শোধনাগার, যা বিভিন্ন পরিমাপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শোধনাগার হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত আরামকো এর পূর্ণ মালিকানা গ্রহণ করে। প্রতিদিন এখানে প্রায় ৬ লাখ ৫৪ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ হয়।
কিন্তু শিল্পের এই বিপুল উৎপাদনের পাশে বসবাসকারী মানুষের জীবন অন্যরকম। স্থানীয় বাসিন্দা জামাল জনসনের ভাষায়, তাঁর পরিবারে একের পর এক মানুষ ক্যানসারে মারা গেছেন। এক আত্মীয় মোটর নিউরন রোগে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, বছরের পর বছর বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর কথায়, “প্রায় প্রতিদিনই বিষাক্ত গন্ধে ভরে থাকে বাতাস।”
পোর্ট আর্থারকে ২০২১ সালের এক সমীক্ষায় টেক্সাসের সবচেয়ে দরিদ্র শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এখানে গড় পারিবারিক আয় অত্যন্ত কম এবং প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। অথচ শহরটিকে ঘিরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ তেল ও পেট্রোরসায়ন শিল্প।
স্বাস্থ্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এই এলাকায় ক্যানসারে মৃত্যুহার টেক্সাসের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। শিশুদের হাঁপানির হার জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। হৃদরোগ, ত্বকের রোগ এবং শ্বাসকষ্টও এখানে অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
বাসিন্দা গ্রেগ রিচার্ডের কথায়, “এখানে রাস্তাগুলো সোনায় মোড়া থাকার কথা ছিল। কারণ এত বড় শিল্প আমাদের চারপাশে। কিন্তু বাস্তবে আমরা শুধু দূষণ আর দারিদ্র্য পেয়েছি।”
পরিবেশবিদ হিলটন কেলি, যিনি এই শহরেই বড় হয়েছেন, বহু বছর ধরে দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। তাঁর স্মৃতিতে আজও ভাসে স্কুলজীবনের অসংখ্য সহপাঠীর অকালমৃত্যু। ক্যানসারে একের পর এক বন্ধুকে হারানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিবেশ আন্দোলনে যুক্ত করেছে। তাঁর অভিযোগ, শিশুদের বিদ্যালয়ে গেলে নার্সদের কক্ষে সারি সারি শ্বাসপ্রশ্বাসের যন্ত্র দেখা যায়। অনেক শিশু নিয়মিত শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা নিচ্ছে।
অনেক পরিবার বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষও ছেড়ে দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ফলন হওয়ার পর সবজির গায়ে কালো ধুলোর আস্তরণ পড়ে যায়। ফলে সেই খাদ্য খাওয়া নিরাপদ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
রাজ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার নথি বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও মোটিভা একাধিকবার দূষণ সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘনের জন্য জরিমানার মুখে পড়েছে। সালফার ডাই-অক্সাইড নির্গমন, দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়া এবং অন্যান্য পরিবেশগত ত্রুটির জন্য বিভিন্ন সময়ে আর্থিক দণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশের ভ্যালেরো শোধনাগার থেকেও সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা সামনে আসে।
স্থানীয়দের অভিযোগ শুধু দূষণ নয়, কর্মসংস্থান নিয়েও। তাঁদের দাবি, এত বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও এলাকার মানুষ পর্যাপ্ত কাজ পান না। বাইরে থেকে শ্রমিক আনা হয়, অনেকেই সপ্তাহ শেষে নিজ নিজ শহরে ফিরে যান। ফলে শিল্প থেকে উৎপন্ন সম্পদের খুব সামান্য অংশই স্থানীয় অর্থনীতিতে থেকে যায়।
জন বিয়ার্ড জুনিয়র, যিনি আগে শোধনাগারে কাজ করতেন এবং এখন পরিবেশ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, একে “পরিবেশগত বর্ণবৈষম্য” বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, অতীতে বর্ণবৈষম্যের কারণে কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারগুলো এই এলাকায় বসতি গড়েছিল। এখন দূষণের কারণে তাদের বাড়ির মূল্য কমে গেছে। অনেকেই চাইলেও ন্যায্য দামে বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র যেতে পারছেন না।
বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কম দামে বাড়ি কিনে ভবিষ্যতে নিজেদের এলাকা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। ফলে মানুষ একদিকে দূষণে আক্রান্ত, অন্যদিকে সম্পত্তিরও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না।
২০১৭ সালে হার্ভে ঘূর্ণিঝড়ের সময় বহু বাড়িতে তেলমিশ্রিত দূষিত পানি ঢুকে পড়ে। অনেক পরিবার মাসের পর মাস অন্যত্র ভাড়া বাড়িতে থাকতে বাধ্য হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণ বাস্তব ক্ষতির তুলনায় খুবই কম।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বকাপে আরামকোর উপস্থিতি নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে ফিফার সঙ্গে চুক্তির পর থেকে বিশ্বকাপের মাঠে, সম্প্রচার, স্টেডিয়াম এবং সমর্থক উৎসবের সর্বত্র আরামকোর বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু পোর্ট আর্থারের মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে কোম্পানির সবচেয়ে বড় শিল্পঘাঁটি রয়েছে, সেখানে খেলাধুলা বা সামাজিক উন্নয়নে তাদের দৃশ্যমান অবদান কোথায়?
জন বিয়ার্ডের প্রশ্ন, যদি আরামকো সত্যিই ফুটবলের উন্নয়নে আগ্রহী হয়, তাহলে পোর্ট আর্থারের শিশুদের জন্য মাঠ, প্রশিক্ষণ বা অবকাঠামো তৈরিতে তারা কেন এগিয়ে আসছে না? তাঁর মতে, “শুধু বিশ্বকাপে বিজ্ঞাপন দিলেই সামাজিক দায়িত্ব পালন হয় না।”
হিলটন কেলি অবশ্য স্বীকার করেন, অতীতের তুলনায় দূষণ কিছুটা কমেছে এবং শহরের কয়েকটি ঐতিহাসিক ভবন সংস্কারে মোটিভা এগিয়ে এসেছে। তবে তাঁরও মত, এখনও অনেক পথ বাকি। অন্যদিকে বিয়ার্ডের বক্তব্য আরও কঠোর। তাঁর ভাষায়, “আগে যদি এক গ্যালন বিষ খেতে হতো, এখন আধা গ্যালন খেতে হচ্ছে। কিন্তু বিষ তো এখনও বিষই।”
ফিফার টেকসই উন্নয়ন নীতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশ সুরক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় আইন মেনে চলতে হবে। কিন্তু পোর্ট আর্থারের পরিস্থিতি সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, ফিফা এ বিষয়ে কার্যত নীরব।
বিশ্বকাপের আলো ঝলমলে স্টেডিয়াম থেকে মাত্র কয়েকশো কিলোমিটার দূরে পোর্ট আর্থারের মানুষ আজও ধোঁয়া, রাসায়নিক গ্যাস, অসুস্থতা এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস করছেন। বিশ্বের অন্যতম ধনী জ্বালানি কোম্পানির বিশাল শিল্পঘাঁটির পাশেই এমন বৈপরীত্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে। ফুটবলের বৈশ্বিক উৎসবের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকের সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি তাই পোর্ট আর্থারের এই নীরব আর্তনাদও এখন ক্রমশ বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।