হাইলাইটস:
- প্রয়াত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর শেষকৃত্য ঘিরে মন্তব্য করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
- দাবি, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একই জায়গায় উপস্থিত ছিল এবং চাইলে সামরিক হামলা চালানো সম্ভব ছিল।
- তবে কূটনৈতিক আলোচনার স্বার্থে সেই পথ বেছে নেওয়া হয়নি বলেই জানান তিনি।
- শোকাহত মানুষের আবেগ নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘হয়তো এগুলো মিথ্যা কান্না।’
- ট্রাম্পের এই মন্তব্য নতুন করে ওয়াশিংটন–তেহরান সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে
বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর শেষকৃত্য অনুষ্ঠান ঘিরে ফের উত্তেজনা ছড়াল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানে অনুষ্ঠিত শেষকৃত্যের সময় ইরানের প্রায় সমগ্র শীর্ষ নেতৃত্ব এক জায়গায় উপস্থিত ছিল। সেই পরিস্থিতিকে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে বড় সুযোগ বলে উল্লেখ করলেও তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবেই কোনও হামলার পথ বেছে নেয়নি, কারণ তাতে ভবিষ্যতে আলোচনার জন্য ইরানের নেতৃত্বই অবশিষ্ট থাকত না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি খামেনেইর শেষকৃত্যের সমস্ত আয়োজন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর কথায়, “ওরা সবাই সেখানে ছিল। এক আঘাতেই সবাইকে সরিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু আমরা তা করব না, কারণ তাহলে আলোচনার জন্য আর কাউকে পাওয়া যেত না।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য কার্যত ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারত, কিন্তু কূটনৈতিক বিবেচনাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর প্রশাসন সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায়। তাঁর মতে, কোনও দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছতে হলে সেই দেশের কার্যকর নেতৃত্বের অস্তিত্ব থাকা জরুরি। সেই কারণেই সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
শুধু সামরিক প্রসঙ্গই নয়, তেহরানের রাস্তায় লক্ষ লক্ষ মানুষের শোকমিছিল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। শেষকৃত্যে অংশ নেওয়া মানুষের কান্না ও আবেগের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, “হয়তো ওগুলো মিথ্যা কান্না।” তাঁর এই মন্তব্য ইরানের জনগণের অনুভূতিকে খাটো করে দেখার চেষ্টা বলে অনেকেই মনে করছেন। একই সঙ্গে এটি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতাকেও আরও প্রকট করে তুলেছে।
খামেনেইর শেষকৃত্যে ইরানের রাষ্ট্রপতি, সংসদের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিচার বিভাগের প্রধান, সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। বিপুল জনসমাগমে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানকে ইরান সরকার জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এমন এক সময়ে এই অনুষ্ঠান হয়, যখন দেশটি সাম্প্রতিক যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট যে ওয়াশিংটন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে একসঙ্গে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে উল্লেখ করা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না, তবু তাঁর বক্তব্য নতুন করে সামরিক উত্তেজনা এবং কূটনৈতিক বার্তা—দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।
পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্পের মন্তব্য মূলত শক্তির প্রদর্শন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সামরিক সক্ষমতা থাকলেও তা সব সময় ব্যবহার করা হয় না। বরং আলোচনার দরজা খোলা রাখাই তাঁর প্রশাসনের অগ্রাধিকার। তবে একই সঙ্গে এই বক্তব্য ইরানের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পের মন্তব্যের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের মন্তব্যকে তেহরান সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। ফলে আগামী দিনে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগে এর প্রভাব পড়তে পারে বলেই আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক একদিকে যেমন উত্তেজনাপূর্ণ, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে আলোচনার সম্ভাবনাও বারবার সামনে এসেছে। ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই দ্বৈত অবস্থানেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। একদিকে তিনি সম্ভাব্য সামরিক শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অন্যদিকে বলেছেন আলোচনার জন্য প্রতিপক্ষের নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখাও প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য শুধু ইরানের উদ্দেশেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রতিও একটি রাজনৈতিক বার্তা। যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক বিকল্পকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছে না, আবার প্রয়োজনে কূটনীতিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে—ট্রাম্প সেই অবস্থানই তুলে ধরতে চেয়েছেন।
খামেনেইর শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের এই বিস্ফোরক মন্তব্য ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে “এক আঘাতেই সবাইকে সরিয়ে দেওয়া যেত” এবং “হয়তো ওগুলো মিথ্যা কান্না” — এই দুটি মন্তব্য ভবিষ্যতেও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।