বাংলাস্ফিয়ার: ১৭৮৭ সালে ফিলাডেলফিয়ার স্বাধীনতা ভবনের বাইরে দাঁড়িয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন—সদ্য সমাপ্ত সাংবিধানিক সম্মেলনে প্রতিনিধিরা শেষ পর্যন্ত কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা বেছে নিলেন? বাস্তববাদী রাজনীতিক ও মার্কিন প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের অন্যতম বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন নাকি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিলেন, “একটি প্রজাতন্ত্র—যদি তোমরা সেটিকে টিকিয়ে রাখতে পারো।”
এই একটি বাক্য দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
প্রায় আড়াই শতক ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সামনে একটি রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এর মূল শক্তি ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষাকারী জটিল সাংবিধানিক কাঠামো। ক্ষমতার তিনটি শাখা—আইনসভা, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগ—এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সহজে পুরো রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে না পারে।
মার্কিন লেখক গোর ভিডাল একসময় বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো এমনভাবে নির্মিত যে “কোনো সিজার, এমনকি কোনো উন্মত্ত জনতাও সহজে এটিকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।” তিনি প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ-এর সময়ে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের কঠোর সমালোচক ছিলেন। কিন্তু ২০১২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়, অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানের আগেই। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি দেখে তিনি কী বলতেন, তা কেবল অনুমানই করা যায়।
আজ অনেক সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞের মতে, মার্কিন রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট হলো ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আর আগের মতো কার্যকর নেই। প্রতিষ্ঠাতা নেতারা যে “পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য” বা চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস-এর ধারণা তৈরি করেছিলেন, সেটিই এখন প্রশ্নের মুখে।
আইনজীবী ও আইন অধ্যাপক ইরউইন ক্র্যামারের মতে, প্রতিষ্ঠাতা নেতারা একটি বিষয় কল্পনাই করতে পারেননি। তিনি বলেন, “তাঁরা ভাবেননি যে ক্ষমতার ওপর নজরদারির জন্য নির্ধারিত তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি একসঙ্গে ব্যর্থ হতে পারে।”
ক্র্যামারের অভিযোগ, মার্কিন কংগ্রেস ধীরে ধীরে নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা ছেড়ে দিয়েছে। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ক্রমাগত বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাঁর ভাষায়, “মাগা আন্দোলনের সামনে প্রচলিত সাংবিধানিক ভারসাম্য কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।”
প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা কেন বার্নস একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠাতা নেতারা হয়তো অবাক হতেন না যদি দেখতেন কোনো রাষ্ট্রপতি রাজতান্ত্রিক ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁরা গভীরভাবে হতাশ হতেন এই দেখে যে সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইনসভাই স্বেচ্ছায় নিজের ক্ষমতার বড় অংশ নির্বাহী বিভাগের হাতে তুলে দিয়েছে।
ওহাইওর ইউনিভার্সিটি অব টলেডো-র সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ পল ফিঙ্কেলম্যানের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন শুধু প্রচলিত রাজনৈতিক রীতিনীতি ভাঙেনি, বরং দীর্ঘদিনের অলিখিত সাংবিধানিক সংস্কৃতিকেও নাড়িয়ে দিয়েছে।
তাঁর কথায়, “ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত প্রতিটি ফেডারেল আইনকে সবচেয়ে চরম ব্যাখ্যায় পড়েছে।”
ফিঙ্কেলম্যান উদাহরণ দেন, যুক্তরাষ্ট্রে জীবিত কোনো ব্যক্তির ছবি কখনও নোট, ডাকটিকিট বা সরকারি প্রতীকে ব্যবহার করা হয়নি। জীবিত রাষ্ট্রপতির নামে সরকারি ভবনের নামকরণও প্রচলিত ছিল না। এগুলোর বিরুদ্ধে কোনো লিখিত আইন ছিল না। এগুলো ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অলিখিত নিয়ম এবং সামাজিক প্রত্যাশা।
কিন্তু ট্রাম্প যুগে অনেক আমেরিকান উপলব্ধি করেছেন যে তাঁদের বহু প্রতিষ্ঠিত রীতি আসলে আইনের শক্ত ভিত্তির ওপর নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। একজন রাজনৈতিক নেতার ইচ্ছাতেই সেই কাঠামো কেঁপে উঠতে পারে।
ফিঙ্কেলম্যানের ভাষায়, “এখন সংবিধান কীভাবে আবার সেই নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনবে, তা কল্পনা করাও কঠিন।”
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। দেশটি কি মূলত একটি প্রজাতন্ত্র, নাকি একটি গণতন্ত্র?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। স্বাধীনতার আড়াই শতক পরও এর কোনো সর্বসম্মত উত্তর নেই।
ডেমোক্র্যাটরা বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, জনপ্রিয় ভোটে এগিয়ে থেকেও একাধিকবার তাঁদের প্রার্থী রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি, কারণ নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করে ইলেক্টোরাল কলেজ ব্যবস্থা। মার্কিন ইতিহাসে পাঁচবার এমন হয়েছে, যার মধ্যে গত দুই দশকে দু’বার রিপাবলিকান প্রার্থীরা এই ব্যবস্থার সুবিধা পেয়েছেন।
এর জবাবে রক্ষণশীলদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র একটি গণতন্ত্র নয়; এটি একটি প্রজাতন্ত্র।
তাঁদের দাবি, প্রতিষ্ঠাতা নেতারাও ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন ব্যবস্থা গড়েছিলেন, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বেচ্ছাচারিতা রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
ইলেক্টোরাল কলেজ ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক যত বেড়েছে, রিপাবলিকানদের অবস্থানও তত কঠোর হয়েছে। কারণ বর্তমান কাঠামো থেকে রাজনৈতিক সুবিধা মূলত তারাই পায়। তুলনামূলক কম জনসংখ্যার গ্রামীণ অঙ্গরাজ্যগুলোর বেশির ভাগই রিপাবলিকানদের ঘাঁটি। ফলে ভোটারের সংখ্যার তুলনায় তাদের প্রতিনিধিত্ব অনেক বেশি। সেই ভারসাম্য ভাঙতে তারা মোটেই আগ্রহী নয়।
এই কারণেই কয়েকটি রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যে বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেমন উটাহে এখন শিক্ষার্থীদের শেখানো বাধ্যতামূলক যে যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র নয়। এই শিক্ষার মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিচয় নিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
এই বিতর্কের মধ্যেই ২০২১ সালে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে চলা বিরোধ প্রশমিত করার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে এডুকেটিং ফর আমেরিকান ডেমোক্র্যাসি ইনিশিয়েটিভ। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রায় ৩০০ জন ইতিহাসবিদ, আইনজ্ঞ, শিক্ষক ও গবেষক এতে অংশ নেন। দীর্ঘ আলোচনার পর দুই সপ্তাহের মাথায় তারা একটি অভিন্ন ভাষা খুঁজে পান।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতন্ত্র পুনর্গঠন গবেষণাগারের প্রধান এবং এই প্রকল্পের নেতৃত্বদানকারী ড্যানিয়েল অ্যালেন জানান, শেষ পর্যন্ত সবাই একমত হন যে যুক্তরাষ্ট্রকে “সাংবিধানিক গণতন্ত্র” বলা সবচেয়ে যথার্থ। অর্থাৎ এটি একই সঙ্গে একটি প্রজাতন্ত্রও, আবার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও—দুটি ধারণাকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখা উচিত।
ইতিহাসবিদ ও পুলিৎজারজয়ী লেখক জিল লেপোর দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের প্রায় ধর্মীয় মর্যাদা দেওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে আসছেন।
তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয় যেন সেটি কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। এর ফলে রাজনৈতিক মতভেদও এক ধরনের ধর্মদ্রোহিতায় পরিণত হয়।
তিনি বলেন, যখন সংবিধানকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন সেটিকে পরিবর্তনের বা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার আলোচনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত মার্কিন ইতিহাসবিদদের বার্ষিক সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে লেপোরের বক্তব্য ছিল, গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে সংবিধান সংশোধনের ঐতিহ্যকে আবার সক্রিয় করতে হবে।
১৭৮৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কংগ্রেসে প্রায় বারো হাজার সাংবিধানিক সংশোধনীর প্রস্তাব জমা পড়েছে। অথচ তার মধ্যে গৃহীত হয়েছে মাত্র ২৭টি।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক সংশোধনী কার্যকর হয়েছিল ১৯৯২ সালে। সেখানে বলা হয়, কংগ্রেস নিজেদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও তা পরবর্তী নির্বাচনের আগে কার্যকর করা যাবে না।
এত কম সংশোধনী গৃহীত হওয়ার প্রধান কারণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠিন। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন পাওয়ার পরও দেশের চার ভাগের তিন ভাগ অঙ্গরাজ্যের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। আজকের তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগে এমন ঐকমত্য প্রায় অসম্ভব।
লেপোরের মতে, শুধু সংবিধান সংশোধন করলেই হবে না। গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে মানুষের মধ্যে নিয়মিত রাজনৈতিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের সংস্কৃতিও ফিরিয়ে আনতে হবে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে এনবিসি বেতার প্রতি সপ্তাহে “আমেরিকার টাউন মিটিং” নামে এক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করত।
মহামন্দার সময় প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট বলেছিলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ভয়।
কিন্তু সেই সময় বহু নাগরিকের আশঙ্কা ছিল আরও গভীর। তারা ভাবছিলেন, হয়তো গণতন্ত্রই একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
এই উদ্বেগ থেকেই শুরু হয় জনপরিসরের সেই আলোচনা। সেখানে নাগরিকরা মুখোমুখি বসে বিতর্ক করতেন—
- আমেরিকার ভবিষ্যৎ কোন পথে—ফ্যাসিবাদ, সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র নাকি গণতন্ত্র?
- নতুন সংবিধান কি প্রয়োজন?
- জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা চালু হওয়া উচিত কি না?
এমনকি আমেরিকান পরিবারব্যবস্থার সংকট নিয়েও আলোচনা হতো। রেডিও অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরও বিতর্ক থেমে থাকত না। মানুষ নিজেদের পাড়া, ক্লাব, চার্চ ও কমিউনিটি হলে একই বিষয় নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেত। বিপরীত মতের মানুষের সঙ্গে যুক্তি বিনিময়ই ছিল সেই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
লেপোরের বিশ্বাস, আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও চাইলে সেই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে তা বিভাজন, ক্ষোভ ও বিদ্বেষ বাড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
তাঁর নতুন বইয়ে তিনি আরও সতর্ক করেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের জন্য নতুন ধরনের বিপদ তৈরি করতে পারে।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যদি সংবিধান সংশোধন কার্যত অসম্ভব হয়, তবে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।
কেউ প্রস্তাব করছেন সিনেটে সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর। কেউ প্রতিনিধি পরিষদের আসন বাড়ানোর কথা বলছেন। আবার কেউ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধির পক্ষে। আইনবিশেষজ্ঞ সাইমন বার্নিকল আরও এক ধাপ এগিয়ে “৫৩ অঙ্গরাজ্যের সমাধান” নামে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন।
তাঁর পরিকল্পনায় পুয়ের্তো রিকো এবং ওয়াশিংটন ডিসিকে পূর্ণাঙ্গ অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হবে। পাশাপাশি নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডকে আলাদা অঙ্গরাজ্য করা এবং ক্যালিফোর্নিয়াকে দুই ভাগে বিভক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। তাঁর যুক্তি, জনসংখ্যা ও প্রতিনিধিত্বের বর্তমান অসামঞ্জস্য দূর করতে এমন কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে অন্তত আলোচনা শুরু হওয়া উচিত।
আজকের যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—অষ্টাদশ শতকে লেখা একটি সংবিধান কি একবিংশ শতকের বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে?
এই প্রশ্নই তুলেছেন বিশিষ্ট আইনবিদ জেফরি রোজেন। তাঁর মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল যুগের রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন এক নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার কথা সংবিধান প্রণেতারা কল্পনাও করতে পারেননি।
তবু আজও মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় দিতে গিয়ে ফিরে যায় সংবিধান প্রণেতা জেমস ম্যাডিসনের হাতে লেখা নোটের কাছে।
আধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধতা, টিকটকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন—এসবের বিচারও শেষ পর্যন্ত করা হচ্ছে এমন একটি সাংবিধানিক ভাষার আলোকে, যা লেখা হয়েছিল ঘোড়ার গাড়ি, পালতোলা জাহাজ আর হাতে লেখা চিঠির যুগে।
এই বৈপরীত্য অনেক গবেষকের কাছেই গভীর উদ্বেগের কারণ।
ফরাসি আইনজ্ঞ ও সাবেক বিচারমন্ত্রী রবার্ট বাদাঁতের বহু বছর আগে লিখেছিলেন, গত দুই শতকে ফ্রান্স ষোলোটি সংবিধান, দুটি সাম্রাজ্য এবং পাঁচটি প্রজাতন্ত্র দেখেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সেই আঠারো শতকের একই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।
অনেকের কাছে এটি স্থিতিশীলতার প্রতীক। আবার অনেকের কাছে এটি পরিবর্তনের অক্ষমতারও প্রতীক।
স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির উৎসব যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—উচ্ছ্বাসের বদলে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা।
অনেক আমেরিকান মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ঐতিহাসিক উদ্যাপনকেও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত করেছেন। ফলে জাতীয় উৎসবের পরিবর্তে তা হয়ে উঠছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রদর্শনী।
নৈরাশ্যবাদীদের মতে, সবচেয়ে বড় সংকট অন্য কোথাও। তাদের বিশ্বাস, আমেরিকা আজ আর নিজের গল্পে নিজেই বিশ্বাস করে না। মন্তব্যকার ডেভিড ব্রুকস বলেন, একসময় আমেরিকানদের একটি অভিন্ন জাতীয় কাহিনি ছিল। সেটি ছিল মুক্তির গল্প। নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের গল্প। অজানা ভূমি পেরিয়ে প্রতিশ্রুত ভবিষ্যতের সন্ধানে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। প্রতিটি নতুন অভিবাসী সেই কাহিনির মধ্যেই নিজের পরিচয় খুঁজে পেত। কিন্তু আজ সেই জাতীয় বর্ণনাই ভেঙে পড়ছে।
ব্রুকসের ভাষায়, “আমরা একসময় জানতাম আমাদের জাতীয় গল্প কী। এখন সেই ঐকমত্য আর নেই।”
খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ অ্যানেট গর্ডন-রিড মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তাঁর প্রশ্ন—দেশটি কি ভবিষ্যতেও আদর্শ, আকাঙ্ক্ষা ও নাগরিক সমতার ভিত্তিতে টিকে থাকবে? নাকি বংশপরিচয়, জাতিগত পরিচয় এবং বর্ণই হয়ে উঠবে আমেরিকান পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি?
এই প্রশ্নের উত্তর আজ আর স্পষ্ট নয়। তিনি মনে করিয়ে দেন, অভিবাসীবিরোধী মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে সমতার আদর্শ ঘোষণা করা হয়েছিল, সমাজের একটি অংশ কখনওই তা আন্তরিকভাবে মেনে নেয়নি।তবু অতীতে অন্তত একটি সামাজিক চাপ কাজ করত। যারা অন্তরে সেই আদর্শে বিশ্বাস করতেন না, তারাও প্রকাশ্যে এমন আচরণ করতেন যেন বিশ্বাস করেন। আজ, তাঁর ভাষায়, “মুখোশ খুলে গেছে।”
ইতিহাসবিদ রবার্ট পার্কিনসন মনে করেন, বর্তমান সংকটের আরেকটি কারণ দেশপ্রেমের ধারণাকেই সংকীর্ণ করে ফেলা। একসময় আমেরিকার মানুষ অসম্পূর্ণতা স্বীকার করেও সমতা, স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের আদর্শকে সম্মিলিতভাবে ধারণ করতে পারত।এখন সেই ধারণা এতটাই ভঙ্গুর হয়ে গেছে যে সামান্য চাপেই তা ভেঙে পড়ছে। তাঁর মতে, প্রকৃত দেশপ্রেম মানে নিজের দেশের ভুল স্বীকার করার সাহসও থাকা।
স্বাধীনতার আড়াই শতক পূর্তিকে সামনে রেখে সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্যগুলোর একটি করেছেন এডি গ্লড।
তিনি তাঁর নতুন বইয়ের প্রথম লাইনেই লিখেছেন— “আমি আমেরিকাকে ভালোবাসি না, কখনও ভালোবাসিনি—বিশেষ করে এখন নয়।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, রাষ্ট্রকে পূজার বস্তু বানানোর কোনো আগ্রহ তাঁর নেই। গ্লডের মতে, আমেরিকার জন্মলগ্ন থেকেই দুটি বিপরীত স্বপ্ন পাশাপাশি চলেছে।
একদিকে স্বাধীনতা, সমতা ও মানবাধিকারের আদর্শ। অন্যদিকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের ধারণা। এই দুই প্রবণতার মধ্যে কখনও প্রকৃত সমঝোতা হয়নি। তাঁর ভাষায়, আমেরিকা একই সঙ্গে নিজেকে স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা এবং শ্বেতাঙ্গদের প্রজাতন্ত্র হিসেবে কল্পনা করতে চায়। কিন্তু এই দুই পরিচয় একসঙ্গে টিকে থাকতে পারে না। এই দ্বন্দ্বই আজকের রাজনৈতিক বিভাজনের গভীরে কাজ করছে।
তবে আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে সবাই যে হতাশ, তা নয়। একদল ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও গবেষক এখনও বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার নিজেকে সংশোধন করার ক্ষমতা। তাদের মতে, আমেরিকার গণতন্ত্র কোনো সমাপ্ত প্রকল্প নয়; এটি একটি চলমান পরীক্ষা। প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের রেখে যাওয়া আদর্শকে আরও বাস্তব করে তোলা।
তাঁরা স্মরণ করিয়ে দেন, সংবিধানের ভূমিকায় বলা হয়েছে—একটি “আরও পরিপূর্ণ ইউনিয়ন” গড়ে তোলার কথা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাতারাও স্বীকার করেছিলেন, তাঁদের নির্মিত রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পূর্ণ নয়। একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সুখকে কোনো নিশ্চিত অর্জন বলা হয়নি; বলা হয়েছে সুখের অন্বেষণের অধিকার। অর্থাৎ আমেরিকার প্রতিশ্রুতি ছিল একটি অবিরাম যাত্রা, কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।
এই কারণেই ২০২৫ সালে স্বাধীনতার আড়াই শতক উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে দ্য আটলান্টিক। সংখ্যাটির শিরোনাম ছিল—”অসমাপ্ত বিপ্লব”। এর অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল স্পষ্ট—দুই শতকের অপূর্ণতা বা ভঙ্গ প্রতিশ্রুতির মধ্যেও আমেরিকার গণতান্ত্রিক প্রকল্প শেষ হয়ে যায়নি। বরং সেটি এখনও বিকাশমান।
অনেক আশাবাদী ইতিহাসবিদ বলেন, বর্তমান সংকটকে বোঝার জন্য ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসর দেখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এর আগে আরও ভয়াবহ সময় অতিক্রম করেছে। গৃহযুদ্ধে প্রায় সাত লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ দেশকে গভীরভাবে বিভক্ত করেছিল। চারজন রাষ্ট্রপতি আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। তবু রাষ্ট্র টিকে গেছে।
ডরিস কার্নস গুডউইন, যিনি আব্রাহাম লিংকনের অন্যতম জীবনীকার, বলেন, ১৮৬২ সালে গৃহযুদ্ধ চলাকালে মানুষ জানত না যুদ্ধের পরিণতি কী হবে। তাদের উদ্বেগও আজকের আমেরিকানদের মতোই গভীর ছিল। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত অন্য পথ দেখিয়েছে।
তাঁর বক্তব্য, “আমরা অতীতের সংকট পার হয়েছি। এবারও পারব। ইতিহাস আমাদের সেই আশাই দেয়।”
একই ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা কেন বার্নস। তাঁর মতে, আমেরিকার জন্মের সময়ও সাফল্যের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য ছিল। ১৭৭৫ সালে লেক্সিংটন ও কনকর্ডের যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে উপনিবেশগুলোর জয়ের সম্ভাবনা খুব কম ছিল। তবু তারা সফল হয়েছিল।
বার্নস আরও মনে করিয়ে দেন, মহামন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্র এমন দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়েছিল যে অনেক চিড়িয়াখানায় প্রাণী হত্যা করে মানুষের খাদ্য হিসেবে বিতরণ করতে হয়েছিল। সেই দেশও আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তাঁর মতে, বর্তমানে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি পরিস্থিতিকে একটি ঝড়ের সঙ্গে তুলনা করেন।
“এখন ঝড় বইছে। ঝড় থামার আগে কী হবে, আমরা জানি না। কিন্তু আমাদের বাড়িটি যথেষ্ট মজবুত ভিত্তির ওপর তৈরি।”
এরপর তিনি প্রতিষ্ঠাতা নেতা টমাস জেফারসনের একটি বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করেন—“যে অমঙ্গল কখনও ঘটেইনি, তার ভয়েই মানুষ কত কষ্ট ভোগ করেছে।”
ডানপন্থী গবেষণা প্রতিষ্ঠান হুভার ইনস্টিটিউশনের গবেষক মাইকেল অসলিন আরও দৃঢ়ভাবে বলেন, আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো আত্মসংশোধনের ক্ষমতা।
তাঁর ভাষায়, “ধীরে, কষ্টে, কখনও রক্তের বিনিময়ে, কখনও অসম্পূর্ণভাবে—তবু আমরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের সমস্যার সমাধান করি। অন্য অনেক দেশের তুলনায় এটিই আমাদের বিশেষত্ব।”
অন্যদিকে ডেভিড ব্লাইটের বক্তব্যে যেমন আশঙ্কা আছে, তেমনি আশা-ও আছে। তিনি বলেন, “আমরা গণতন্ত্র ধ্বংসের বিপজ্জনক কিনারায় দাঁড়িয়ে।” কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সংশোধন করে যোগ করেন, “অতীতের প্রতিটি বড় সংকটেও আমরা টিকে গেছি। পৃথিবীতে আর কতটি প্রজাতন্ত্র আছে, যারা আড়াই শতাব্দী ধরে টিকে থাকতে পেরেছে?”
আরেক ইতিহাসবিদ ওয়াল্টার আইজ্যাকসন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বলেন, যদি আমেরিকা এই সংকটও অতিক্রম করতে পারে, তাহলে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম সত্যিকারের বহুত্ববাদী গণতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে—যেখানে ভিন্ন জাতি, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সমঅধিকার নিয়ে বসবাস করবে।
উপসংহার
স্বাধীনতার ২৫০ বছরে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে দুটি বিপরীত ছবি একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে। একদল মনে করেন, ক্ষমতার ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি অভূতপূর্ব সংকটে। অন্যদল বিশ্বাস করেন, আমেরিকার ইতিহাসই প্রমাণ করে—এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের ক্ষমতা।
বেনজামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের সেই আড়াই শতাব্দী আগের সতর্কবাণী—”একটি প্রজাতন্ত্র, যদি তোমরা সেটিকে টিকিয়ে রাখতে পারো”—আজও যেন সমান প্রাসঙ্গিক। প্রশ্নটি আর কেবল ইতিহাসের নয়; এটি বর্তমান এবং ভবিষ্যতেরও। আমেরিকা কি তার প্রজাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে পারবে? নাকি ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সামাজিক বিভাজন সেই ঐতিহাসিক পরীক্ষাকে ব্যর্থ করে দেবে?
উত্তর এখনও অমীমাংসিত। কিন্তু স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীতে এসে এতটুকু স্পষ্ট—এই প্রশ্নের গুরুত্ব হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আগে কখনও এত গভীর ছিল না।