হাইলাইটস

  • ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলির জন্য ইরান দলকে একই দিনে প্রবেশ ও প্রস্থান করতে হবে।
  • খেলোয়াড়দের জন্য ক্রীড়া ভিসা মঞ্জুর হলেও মার্কিন প্রশাসন কঠোর নজরদারির নীতি গ্রহণ করেছে।
  • ইরানের মূল পরিকল্পনা ছিল আমেরিকাতেই প্রশিক্ষণ শিবির গড়া, কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে তা বাতিল করা হয়।
  • এখন দলটি মেক্সিকোকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে এবং সেখান থেকেই ম্যাচ খেলতে আমেরিকায় যাতায়াত করবে।
  • ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও ভূ-রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।

বাংলাস্ফিয়ার: ফুটবল বিশ্বকাপ সাধারণত জাতিগুলিকে কাছাকাছি আনার উৎসব হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ইরানের জাতীয় ফুটবল দলকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে মাঠের বাইরের রাজনীতি অনেক সময় মাঠের খেলাকেও ছাপিয়ে যেতে পারে।

ইরানের জাতীয় ফুটবল দলকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আমেরিকায় অনুষ্ঠিত তাদের বিশ্বকাপ ম্যাচগুলির জন্য খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ম্যাচের দিনই দেশে প্রবেশ করতে হবে এবং খেলা শেষ হওয়ার পরপরই ফিরে যেতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকার মাটিতে রাত কাটানোর বা দীর্ঘ সময় অবস্থান করার সুযোগ থাকবে না।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন নজির অত্যন্ত বিরল। সাধারণত অংশগ্রহণকারী দলগুলি টুর্নামেন্ট চলাকালীন আয়োজক দেশের মধ্যেই প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করে, সেখান থেকে বিভিন্ন ভেন্যুতে যাতায়াত করে এবং খেলোয়াড়দের বিশ্রাম, প্রস্তুতি ও পুনরুদ্ধারের জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো ব্যবহার করে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে সেই প্রচলিত ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রদূত এবং ফুটবল প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলি জানিয়েছে, দলটি এখন মেক্সিকোকে তাদের কার্যত অস্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। সেখান থেকেই খেলোয়াড়রা নির্দিষ্ট ম্যাচের দিন বিমানে করে যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আবার মেক্সিকোয় ফিরে আসবেন।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের মার্কিন-ইরান বৈরিতা। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ এবং সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ফলে বিশ্বকাপের মতো একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন নিরাপত্তা এবং অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, ইরানি খেলোয়াড়দের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রীড়া ভিসা প্রদান করা হয়েছে এবং বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনও বাধা সৃষ্টি করা হবে না। তবে একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করেছে যে ভিসা ব্যবস্থার কোনও ধরনের অপব্যবহার তারা বরদাস্ত করবে না।

মার্কিন প্রশাসনের উদ্বেগ শুধু খেলোয়াড়দের ঘিরে নয়। দলীয় কর্মকর্তা, সহায়ক কর্মী এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, ইরান দলের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।

একটি বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে সাধারণত দলগুলি কয়েকদিন ধরে ম্যাচ ভেন্যুর কাছাকাছি অবস্থান করে। খেলোয়াড়রা আবহাওয়া, মাঠের অবস্থা এবং সময় অঞ্চলের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ সীমিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যাচের দিন ভ্রমণ করে মাঠে নামা শারীরিক ও মানসিকভাবে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ দল ইতিমধ্যেই স্থানীয় পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়।

ইরানের প্রথম ম্যাচ ১৫ জুন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ক্যালিফোর্নিয়ার ইনগলউডে। এরপর আরও কয়েকটি ম্যাচ আমেরিকার বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই ধরনের প্রবেশ-প্রস্থান নীতি কার্যকর থাকবে বলে জানা গেছে।

তবে সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও ইরান দল নিজেদের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের আগে তারা তুরস্কের আনতালিয়ায় প্রশিক্ষণ শিবির করেছে এবং একটি প্রীতি ম্যাচে মালিকে ২-০ গোলে হারিয়েছে। দলের কোচিং স্টাফের দাবি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, খেলোয়াড়রা নিজেদের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন না।

কিন্তু এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল যে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কখনওই পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে নয়।

একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য নীতি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার অলিম্পিক বয়কট, যুগোস্লাভিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা কিংবা রাশিয়ার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ক্রীড়া নিষেধাজ্ঞা—সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে ভূ-রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্রীড়াঙ্গনেও প্রবেশ করে।

২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের জন্য নির্ধারিত এই ‘সকালে ঢোকো, রাতে বেরিয়ে যাও’ ব্যবস্থা সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই নতুন অধ্যায়।

ফুটবল মাঠে ইরানকে গোল করতে হবে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। কিন্তু মাঠের বাইরে তাদের লড়াইটা আরও কঠিন—সেটি কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল গোলকধাঁধার বিরুদ্ধে।