দৃষ্টিভঙ্গি

‘প্রতি বছর ছেলেকে একটি করে ফেরারি উপহার দিই’: কঠোর শৈশব কীভাবে বদলে দিয়েছে ললিত মোদীর সন্তান পালনের ধরন

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: কঠোর অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতাই নিজের সন্তানদের সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে মানুষ করতে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে—এমনটাই জানিয়েছেন ললিত মোদী।
  • তবে সন্তানকে চাওয়া মাত্র সব কিছু দিয়ে দেওয়া কি সত্যিই দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব, না কি তা শৈশবের বঞ্চনা পুষিয়ে দেওয়ার অতিরিক্ত চেষ্টা—তাঁর মন্তব্য সেই প্রশ্নও…
  • নিজের বাবা ও পরিবারের পরিবেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ললিত বলেন, “আমার বাবা সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: কঠোর অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতাই নিজের সন্তানদের সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে মানুষ করতে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে—এমনটাই জানিয়েছেন ললিত মোদী। তবে সন্তানকে চাওয়া মাত্র সব কিছু দিয়ে দেওয়া কি সত্যিই দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব, না কি তা শৈশবের বঞ্চনা পুষিয়ে দেওয়ার অতিরিক্ত চেষ্টা—তাঁর মন্তব্য সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।

নিজের বাবা ও পরিবারের পরিবেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ললিত বলেন, “আমার বাবা সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি যে দুনিয়ার অন্যতম বড় আমুদে মানুষ ছিলেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আমি খুব খোলাখুলিই এ কথা বলি। সম্ভবত তাঁর কিছু বৈশিষ্ট্য আমার মধ্যেও এসেছে, আর আমি সেটাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

দাদু-ঠাকুমার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমার দাদু রায়বাহাদুর এবং ঠাকুমা অত্যন্ত রক্ষণশীল ছিলেন।” যদিও সামাজিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে তাঁর বাবা ও কাকারা একেবারেই রক্ষণশীল ছিলেন না। ললিতের কথায়, “আমার বাবা ও কাকারা ছিলেন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পার্টিপ্রেমীদের অন্যতম। দিল্লির সমস্ত বড় পার্টিতে তাঁরাই ছিলেন মূল আকর্ষণ। দিল্লির সবচেয়ে জমকালো পার্টিগুলির আয়োজন তাঁরাই করতেন।”

ললিতের দাবি, তাঁর আচরণের কারণেই পরিবারের তরফে তাঁর উপরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আসলে সবটাই ছিল নিয়ন্ত্রণের ব্যাপার। তাঁরা নিজেরা যা করতেন, অন্য কেউ একই কাজ করুক, সেটা তাঁরা সহ্য করতে পারতেন না।”

তাঁর ভাইবোনদের ক্ষেত্রেও কি একই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল? উত্তরে ললিত বলেন, “নিয়মগুলি আমার ক্ষেত্রেই বেশি কঠোর ছিল। কারণ তাঁদের মতে, আমি সব নিয়ম ভেঙেছিলাম। তাঁরা নিজেরাও নিয়ম ভাঙতেন, কিন্তু আমি আরও অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলাম। ফলে আমি নিয়ম ভাঙার পরে তাঁরা আমার ভাইবোনদের ক্ষেত্রে আরও কঠোর হয়ে ওঠেন।”

এই কঠোরতার প্রভাব তাঁর ভাইবোনদের জীবনেও পড়েছিল। ললিত বলেন, “আমার বোনের খুব অল্প বয়সে ভারতিয়া পরিবারে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর আমার কারণে দুর্ভাগ্যবশত আমার ভাইকে বিদেশে পড়তে যেতে দেওয়া হয়নি। সে আমার চেয়ে আট বছরের ছোট। তাকে ভারতেই পড়াশোনা করতে হয়েছিল এবং খুব তাড়াতাড়ি পারিবারিকভাবে ঠিক করা বিয়ে করতে হয়েছিল।”

নিজের সন্তানদের কি তিনি নিজের মতো হওয়া থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন? ললিতের উত্তর, “আমি ছিলাম পরিবারের বখে যাওয়া ছেলে। বাবা আমার সঙ্গে যে ধরনের আচরণ করতেন, নিজের সন্তানদের অভিভাবক হিসেবে আমি তার ঠিক বিপরীত হয়েছি।”

এর উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি ফেরারির প্রতি নিজের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার কথা বলেন। “আমি সব সময় একটি ফেরারি চাইতাম। আমাদের পক্ষে যা খুশি কেনা সম্ভব ছিল। কিন্তু বাবা বলতেন, ‘আমি তোমাকে কখনও ফেরারি দেব না।’ এর ফলে গাড়িটি পাওয়ার ইচ্ছা আমার আরও বাড়ত। শেষ পর্যন্ত আমার ৪০তম জন্মদিনে একজন আমাকে ফেরারি উপহার দিয়েছিলেন।”

ললিত জানান, সেই গাড়িটি তাঁকে দিয়েছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি। তাঁর কথায়, “সত্যিই কেউ আমাকে ফেরারি উপহার দিয়েছিল। কে কাকে ফেরারি উপহার দেয়? এ আবার কেমন জীবন! কিন্তু যা হওয়ার, তা-ই হয়েছে।”

নিজের ছেলেকে উপহার দেওয়া এবং বস্তুগত চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে তিনি ঠিক উল্টো পথ বেছে নিয়েছেন। ললিত বলেন, “আমার ছেলের ২১তম জন্মদিন থেকে ৩১ বছর বয়স পর্যন্ত আমি প্রতি বছর তাকে একটি করে ফেরারি উপহার দিয়েছি। এখন তার কাছে ১২টি ফেরারি রয়েছে। আমার বাবা আমাকে কখনও একটি ফেরারিও দেননি বলেই আমি প্রতি বছর ছেলেকে একটি করে দিয়েছি। আমার যদি সেই সামর্থ্য থাকে, তা হলে দেব না কেন? আমি চাইনি, আমার ছেলেকে কখনও হেঁটে যেতে হোক।”

এটিকে কি তিনি দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব বলে মনে করেন? ললিত জানান, নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর কথায়, “আমি এমন একটি জীবন কাটিয়েছি, যেখানে সব সময় কিছু না কিছু চাইতাম এবং সেটা পাওয়ার জন্য কোনও না কোনও উপায় বার করতাম। কখনও ঠাকুমাকে খুশি করে, কখনও কাকার মন জুগিয়ে, আবার কখনও সংস্থার কাউকে ধরে—কোনও না কোনও ব্যবস্থা করতাম।”

সন্তানদের ক্ষেত্রে তিনি সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে দিতে চাননি। ললিত বলেন, “আমি ঠিক করেছিলাম, আমার সন্তানরা যা চাইবে, আমি তাদের তা দেব। আজ আমার ছেলের বয়স ৩১ বছর। ওই বয়সে আমি পাগলের মতো টাকা খরচ করতাম। অথচ এখন সেই ছেলেই আমাকে বলে, ‘বাবা, তোমার ক্রেডিট কার্ডের বিল খুব বেশি হচ্ছে। একটু খরচ কমাও।’”

ললিতের দাবি, সন্তানদের বেশি স্বাধীনতা এবং বস্তুগত সুযোগসুবিধা দেওয়ার ফলে তারা আরও লোভী হয়ে ওঠেনি। বরং তাদের চাহিদা কমেছে। তিনি বলেন, “আমি যখন তাদের সব কিছু দিয়েছি, তখন আর কোনও কিছুর জন্য তাদের আকাঙ্ক্ষা থাকেনি। আমার ছেলে অপচয় করে না। ওরা নিজেদের কাজ ভালোবাসে। যা কেনে, সবচেয়ে ভালো জিনিসটাই কেনে। কিন্তু আমি অন্য রকম ছিলাম। আমি সব সময় আরও বেশি পাওয়ার উপায় খুঁজতাম।”

শৈশবের অভিজ্ঞতা কীভাবে অভিভাবকত্বকে প্রভাবিত করে

মনোবিদ এবং মন্ধ্যান কেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর সাক্ষী মন্ধ্যান বলেন, শৈশবের অভিজ্ঞতা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় না। আমরা কোন ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক অভিভাবকত্ব বলে মনে করব, সেই ধারণাকেও তা নীরবে প্রভাবিত করে।

শৈশবে খুব কম স্বাধীনতা পাওয়া কোনও ব্যক্তি নিজের সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারেন। তিনি ভাবতে পারেন, “আমি জানি এই নিয়ন্ত্রণ কতটা কষ্টকর। আমার সন্তানকে সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে দেব না।”

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ক্ষতিকর পারিবারিক আচরণের ধারা ভাঙার চেষ্টা বলা যায়। কিন্তু সমস্যাটি হল, সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটতে গিয়ে অনেক সময় অতিরিক্ত সংশোধনের প্রবণতা তৈরি হয়। যে ব্যক্তি শৈশবে অত্যধিক বিধিনিষেধের মধ্যে বড় হয়েছেন, তিনি নিজের সন্তানকে কোনও কিছুতেই ‘না’ বলতে অসুবিধা বোধ করতে পারেন।

ডক্টর মন্ধ্যানের মতে, “স্বাস্থ্যকর লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের শৈশবকে আবার তৈরি করা বা সেটিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা নয়। বরং কোন বিষয়গুলি আমাদের আঘাত দিয়েছিল, তা বুঝতে হবে। তারপর সচেতনভাবে ঠিক করতে হবে, কোন মূল্যবোধগুলি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং কোন ক্ষতিকর অভ্যাস আমাদের প্রজন্মেই শেষ হবে।”

সন্তানকে সব কিছু দিলে কি অধিকারবোধ তৈরি হয়?

একটি শিশু যা চাইছে, সঙ্গে সঙ্গে তা দিয়ে দিলে সে সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট হতে পারে। কিন্তু তাতে ভবিষ্যতে তার চাহিদা কমে যাবে—এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। শিশুকে যদি কখনও অপেক্ষা করতে না হয় কিংবা ‘না’ শুনতে না হয়, তা হলে যা চাইছে তা পাওয়া ধীরে ধীরে তার কাছে আনন্দ বা কৃতজ্ঞতার বিষয় না হয়ে স্বাভাবিক অধিকার বলে মনে হতে পারে।

ডক্টর মন্ধ্যান উদারতা ও অতিরিক্ত প্রশ্রয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তাঁর কথায়, “সন্তানকে তার পছন্দের জিনিস দেওয়ার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিকভাবে কোনও ভুল নেই। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন বস্তুগত উপহারই ভালোবাসা প্রকাশ, আচরণ নিয়ন্ত্রণ, হতাশা এড়ানো কিংবা সন্তানকে বাধ্য করার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।”

নিজের শৈশবের অভাব পূরণ করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি এড়াবেন কীভাবে?

কঠিন শৈশবের অভিজ্ঞতার প্রতিক্রিয়ায় বিপরীত ধরনের অভিভাবকত্ব বেছে নেওয়ার আগে বাবা-মায়ের নিজেদের একটি প্রশ্ন করা দরকার—এই মুহূর্তে তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেটি কি সত্যিই সন্তানের বর্তমান প্রয়োজনের ভিত্তিতে, না কি তাঁদের নিজেদের শৈশবের কষ্ট ও অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা সেই সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করছে?

সন্তানকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া, কখনও ‘না’ না বলা কিংবা ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি থেকে সব সময় তাকে রক্ষা করা স্বাস্থ্যকর অভিভাবকত্বের লক্ষণ নয়। ভালোবাসা ও উদারতার পাশাপাশি সীমারেখা, অপেক্ষা করার শিক্ষা এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায় নেওয়ার অভ্যাসও শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য জরুরি।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles