প্রথমবার পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছল ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের বিশাল রকেট স্টারশিপ। সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, টেক্সাসের স্টারবেস উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে যাত্রা করে এই সাফল্য অর্জন করে মহাকাশযানটি। তবে অভিযান সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ছিল না। উড্ডয়নের সময় একটি ইঞ্জিন অপ্রত্যাশিতভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সেই সমস্যার জেরে দশ ঘণ্টার পরিকল্পিত অভিযান প্রায় তিন ঘণ্টায় শেষ করতে হয়। তা সত্ত্বেও কক্ষপথে পৌঁছনো সংস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

এটি ছিল স্টারশিপের চতুর্দশ পরীক্ষামূলক উড়ান। ১২০ মিটারের বেশি উঁচু এই উৎক্ষেপণযানের নীচের অংশে থাকে সুপার হেভি বুস্টার এবং উপরে মূল স্টারশিপ মহাকাশযান। উৎক্ষেপণের পরে দুটি অংশ আলাদা হয়ে যায়। যাত্রা শুরুর প্রায় ২৬ মিনিট পরে উপরের অংশটি পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে। নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সেই সাফল্যের ঘোষণা আসতেই উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। চাঁদ ও মঙ্গলে ভবিষ্যৎ অভিযানের প্রস্তুতিতে এই অগ্রগতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

কক্ষপথে প্রবেশের আগের মুহূর্তগুলিতে অবশ্য অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। স্টারশিপের ছয়টি র‍্যাপ্টর ইঞ্জিনের একটি বন্ধ হওয়ায় প্রথমে কক্ষপথে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিলের কথাও জানানো হয়। পরে পরিস্থিতি বিচার করে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নিয়ন্ত্রকেরা। মহাকাশে আবার একটি ইঞ্জিন চালিয়ে প্রয়োজনীয় গতি অর্জন করে যানটি। অন্যদিকে, সুপার হেভি বুস্টার উৎক্ষেপণের প্রায় সাত মিনিট পরে মেক্সিকো উপসাগরে নিয়ন্ত্রিতভাবে নেমে আসে। ফলে উৎক্ষেপণের দুটি অংশের গতিপথও আলাদা হয়ে যায়।

এই অভিযানে ২৬টি নতুন প্রজন্মের স্টারলিঙ্ক ভি৩ উপগ্রহ কক্ষপথে স্থাপন করেছে স্পেসএক্স। উৎক্ষেপণের আধ ঘণ্টার কিছু পরে উপগ্রহগুলি ছাড়ার কাজ শুরু হয়। স্টারশিপের ক্ষেত্রে এই প্রথম বাস্তবে পরিষেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্টারলিঙ্ক উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠানো হল। আগের পরীক্ষাগুলিতে উপগ্রহের অনুকৃতি অথবা পরে বায়ুমণ্ডলে পুড়ে যাওয়া উপগ্রহ ব্যবহার করা হয়েছিল। এবারের সাফল্য তাই রকেটটির পরীক্ষামূলক উন্নয়নের সঙ্গে সংস্থার উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবসার সরাসরি যোগসূত্র তৈরি করল।

আগের উড়ানগুলির সঙ্গে এবারের পার্থক্য বোঝাও জরুরি। স্টারশিপ এর আগেও মহাকাশে পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই পরীক্ষাগুলি এমন গতিপথে পরিচালিত হয়েছিল, যাতে যানটি পৃথিবীকে সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করার জন্য কক্ষপথে থেকে না যায়। সেগুলি ছিল উপকক্ষীয় উড়ান। সোমবার প্রথমবার কক্ষপথে প্রবেশের লক্ষ্য পূরণ হল। অর্থাৎ শুধু আরও উঁচুতে ওঠা নয়, পৃথিবীর চারদিকে ঘোরার উপযোগী অবস্থায় পৌঁছনোই এবারের মূল অর্জন। সেই সঙ্গে উপগ্রহ স্থাপনের ক্ষমতাও বাস্তবে দেখাতে পারল যানটি।

প্রায় তিন ঘণ্টা পরে স্টারশিপ উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে নেমে আসে। তবে শেষ পর্যায়ের অবতরণ আগের অভিযানের মতো মসৃণ হয়নি। জলে নামার সময় আগুন দেখা যায়, যদিও যানটির অন্তত কিছু অংশ অক্ষত ছিল বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বোঝা গিয়েছে। ফলে কক্ষপথে পৌঁছনো এবং উপগ্রহ ছাড়ার সাফল্যের পাশাপাশি পৃথিবীতে ফেরার পর্বটিও মূল্যায়নের বিষয় হয়ে থাকছে। এই উড়ানকে তাই সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত অভিযান বলা যাচ্ছে না।

২০২৩ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ স্টারশিপের উড়ান পরীক্ষা চালাচ্ছে স্পেসএক্স। একাধিক বিস্ফোরণ, ব্যর্থতা এবং সফল পরীক্ষার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নকশায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংস্থার লক্ষ্য, এমন একটি সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণব্যবস্থা তৈরি করা, যা বারবার মহাকাশে পাঠানো যাবে। মাস্কের বৃহত্তর পরিকল্পনায় রয়েছে চাঁদ ও মঙ্গলে অভিযান। তবে সোমবারের সাফল্য সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি ধাপ; সব প্রযুক্তিগত বাধা পেরিয়ে যাওয়ার প্রমাণ নয়।

এর পরের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে রয়েছে কক্ষপথে জ্বালানি ভরার পরীক্ষা এবং নির্ভরযোগ্য পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা। দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের জন্য এই দক্ষতাগুলি প্রয়োজন। সোমবারের উড়ান দেখাল, পথে যান্ত্রিক সমস্যা তৈরি হলেও স্টারশিপ কক্ষপথে পৌঁছে কার্যকর উপগ্রহ স্থাপন করতে পারে। এখন সেই সামর্থ্যকে নিয়মিত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থায় পরিণত করার কাজ বাকি। প্রথম কক্ষপথযাত্রার ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি সেই অসমাপ্ত কাজও সামনে আনল এই অভিযান।