ফুটবলের বিশ্বকাপ শুধু ট্রফি জেতার গল্প নয়; এটি অসংখ্য আবেগ, বিতর্ক, বিস্ময় এবং মানবিক মুহূর্তের সমষ্টি। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপও তার ব্যতিক্রম ছিল না। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে, যা আগামী বহু বছর ধরে ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে রয়ে যাবে। সেই রকমই ২৬টি স্মরণীয় মুহূর্ত তুলে ধরা হল।
১. কুরাসাওয়ের ঐতিহাসিক প্রথম গোল
বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলা কুরাসাও জার্মানির কাছে ৭-১ ব্যবধানে হারলেও ইতিহাস গড়ে লিভানো কোমেনেনসিয়া। কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যারের বিরুদ্ধে গোল করে তিনি দেশের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা হন।
২. ‘কেবলগেট’ বিতর্ক
নরওয়ের বিরুদ্ধে জুড বেলিংহ্যামের গোলের আগে বলটি স্টেডিয়ামের ওপরের কেবলে লেগেছিল কি না, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ফিফা অভিযোগ উড়িয়ে দিলেও নরওয়ের কোচ স্তোলে সোলবাকেন দাবি করেন, ঘটনাটি স্পষ্ট ছিল।
৩. জেসি মার্শের আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য
মরক্কোর কাছে ৩-০ হারের পরও কানাডার কোচ জেসি মার্শ বলেন, “আমি ওদের চেয়ে আমাদের দলকেই বেছে নেব।” পরে মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ উয়াহবি এই মন্তব্যের কড়া জবাব দেন।
৪. দুর্দান্ত গোল্ডেন বুটের লড়াই
লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, আর্লিং হালান্ড এবং হ্যারি কেন—সবাই গোলের বন্যা বইয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে এমবাপে গোল্ডেন বুট জেতেন।
৫. বোস্টন দখল স্কটিশ সমর্থকদের
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে স্কটল্যান্ডের দল খুব বেশি সাফল্য না পেলেও সমর্থকেরা বোস্টন শহরকে নিজেদের উৎসবে মাতিয়ে দেন। গান, পতাকা, এমনকি শহরের ভাস্কর্যেও ট্র্যাফিক কন বসিয়ে তাঁরা আলোচনায় আসেন।
৬. রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ
নকআউটে প্রথমবার গোল করার স্বপ্ন পূরণ করলেও স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। সেটিই হয়ে থাকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।
৭. এমবোলোর ‘ভুল পরিচয়’ বিতর্ক
আর্জেন্টিনা-সুইৎজারল্যান্ড ম্যাচে প্রথমে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখানো হলেও পরে ভিএআরের সাহায্যে বোঝা যায় ব্রিল এমবোলো ডাইভ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে।
৮. ইরানের সংগ্রামী বিশ্বকাপ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের আবহে নানা প্রশাসনিক বাধার মুখেও ইরান শেষ পর্যন্ত গোল ব্যবধানে নকআউটের সুযোগ হারায়। কোচ আমির গালেনোয়ি বলেন, “আমাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।”
৯. হালান্ডের ইন্টারনেট ঝড়
মাঠে গোলের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও ভাইরাল হন আর্লিং হালান্ড। ইরাকের গোলরক্ষককে তাড়া করার দৃশ্য লক্ষ লক্ষ মানুষ শেয়ার করেন।
১০. তুরস্কের ব্যর্থতা
‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে বিবেচিত তুরস্ক গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। অস্ট্রেলিয়া ও ১০ জনের প্যারাগুয়ের কাছে হেরে হতাশ করেন আর্দা গুলেররা।
১১. মিশরের ক্ষোভ
আর্জেন্টিনার কাছে বিতর্কিত হারের পর মিশরের কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেন, তাঁর দল পেনাল্টি থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং বৈধ গোলও বাতিল করা হয়েছে।
১২. ‘ওয়ান্ডারওয়াল’-এর জাদু
ওয়েসিসের বিখ্যাত গান Wonderwall ইংল্যান্ডের সমর্থকদের অনানুষ্ঠানিক সংগীতে পরিণত হয়। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের সঙ্গে সমর্থকদের একসঙ্গে গান গাওয়া বিশ্বকাপের অন্যতম আবেগঘন দৃশ্য হয়ে ওঠে।
১৩. লামিন ইয়ামালের ভাইয়ের জনপ্রিয়তা
মাত্র তিন বছরের কেইনে ইয়ামাল টিভি ক্যামেরায় দাদার খেলা দেখে যে আনন্দ প্রকাশ করেছিল, তা বিশ্বজুড়ে মানুষের মন জয় করে নেয়।
১৪. মেক্সিকোর ‘মার্লিন’ হাঁস
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে জয়ের পর দলের উদ্যাপনে দেখা যায় ‘মার্লিন’ নামের একটি হাঁসকে। এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে পরে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হয়।
১৫. মিকেল মেরিনোর শেষ মুহূর্তের নায়কোচিত গোল
পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে বদলি হিসেবে নেমে গুরুত্বপূর্ণ জয়সূচক গোল করেন স্পেনের মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো। স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ে তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ।
১৬. আগিরে বনাম অ্যান্টনি গর্ডন
ইংল্যান্ড-মেক্সিকো ম্যাচে মেক্সিকোর কোচ হাভিয়ের আগিরের রসিক মন্তব্য অ্যান্টনি গর্ডনের উদ্দেশে ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
১৭. ভোজিনিয়ার আবেগঘন গল্প
৪০ বছর বয়সি কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া ম্যাচসেরা হওয়ার পর কেঁদে ফেলেন, কারণ তাঁর মা ভিসা সমস্যায় খেলা দেখতে আসতে পারেননি। পরে বিশেষ উদ্যোগে তিনি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হতে সক্ষম হন।
১৮. নেদারল্যান্ডস-মরক্কোর নাটকীয় টাইব্রেকার
একাধিক মিস, পোস্টে বল লাগা এবং দুর্দান্ত গোলরক্ষণের পর অবশেষে মরক্কো টাইব্রেকারে জিতে পরের রাউন্ডে ওঠে।
১৯. ফটোগ্রাফারদের বিরুদ্ধে টুখেলের ক্ষোভ
জাতীয় সংগীতের সময় অসংখ্য ফটোগ্রাফার সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় নিজের খেলোয়াড়দেরই দেখতে পাচ্ছিলেন না ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল। প্রকাশ্যেই তিনি ফিফার কাছে নিয়ম বদলের আবেদন জানান।
২০. উদ্বোধনী ম্যাচেই তিনটি লাল কার্ড
মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা উদ্বোধনী ম্যাচে তিনটি লাল কার্ড দেখানো হয়, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকে।
২১. ‘ওভারটার্ন দিস’
যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে বিতর্কের পর বেলজিয়াম ৪-১ ব্যবধানে জিতে সামাজিক মাধ্যমে লেখে—“Overturn this”। পোস্টটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
২২. প্যারাগুয়ের নায়ক থেকে খলনায়ক
জার্মানিকে হারিয়ে প্রশংসা কুড়ালেও পরে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময় নষ্ট ও রুক্ষ ফুটবলের জন্য তীব্র সমালোচিত হয় প্যারাগুয়ে।
২৩. দেশঁর পাশে ফরাসি দল
মায়ের মৃত্যুর পরও দলের সঙ্গে থাকা কোচ দিদিয়ের দেশঁকে গোল করার পর জড়িয়ে ধরেন কিলিয়ান এমবাপে ও সতীর্থরা। মানবিক এই দৃশ্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়।
২৪. রেফারিরই চোট
যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে রেফারি ফেলিক্স জোয়েয়ার শেষ মুহূর্তে পায়ে টান ধরায় খেলা থামিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। খেলোয়াড়রাই তাঁকে স্ট্রেচিংয়ে সাহায্য করেন।
২৫. চুলের স্পর্শে বাতিল গোল
পর্তুগালের বিরুদ্ধে ক্রোয়েশিয়ার শেষ মুহূর্তের গোল ভিএআরে বাতিল হয়, কারণ সেন্সর প্রযুক্তিতে ধরা পড়ে ক্রসটি ইগর মাতানোভিচের মাথায় সামান্য ছুঁয়ে গিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন কোচ জ্লাতকো দালিচ।
২৬. জেডেন অ্যাডামসকে শ্রদ্ধাঞ্জলি
বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার জেডেন অ্যাডামসের মৃত্যু ফুটবল বিশ্বকে শোকাহত করে। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।