সংখ্যার সীমানা ছাড়িয়ে ফুটবলের শাশ্বত আসনে মেসি

যা জানা জরুরি
- আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল তাঁর অতুলনীয় কীর্তির সাক্ষ্য দেয়।
- কিন্তু লিয়োনেল মেসির মহত্ত্বের সম্পূর্ণ হিসাব কোনও পরিসংখ্যানেই ধরা সম্ভব নয় শোভন সুন্দর মিত্র: লিয়োনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সঙ্গে কেবল এক…
- আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে ২১ বছরের সেই যাত্রার শেষে তাঁর নামের পাশে লেখা থাকবে ২০৭টি ম্যাচ এবং ১২৫টি গোল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল তাঁর অতুলনীয় কীর্তির সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু লিয়োনেল মেসির মহত্ত্বের সম্পূর্ণ হিসাব কোনও পরিসংখ্যানেই ধরা সম্ভব নয়
শোভন সুন্দর মিত্র: লিয়োনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের সঙ্গে কেবল এক জন মহাতারকার দীর্ঘ যাত্রাই শেষ হল না, অবসান ঘটল বিশ্বফুটবলের এক অনন্য যুগের। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে ২১ বছরের সেই যাত্রার শেষে তাঁর নামের পাশে লেখা থাকবে ২০৭টি ম্যাচ এবং ১২৫টি গোল। থাকবে ছয়টি বিশ্বকাপ, একটি বিশ্বকাপ জয়, দু’টি কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমা। কিন্তু এই সংখ্যাগুলি মেসির কীর্তির আয়তন বোঝায়, তাঁর মহত্ত্বের গভীরতা নয়।
৩৯ বছর বয়সে বিদায় জানানো মেসি আর্জেন্টিনার সর্বাধিক ম্যাচ খেলা এবং সর্বাধিক গোল করা ফুটবলার। তাঁর ১২৫টি গোল দেশের পূর্বতন সর্বোচ্চ গোলদাতা গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার ৫৪ গোলের দ্বিগুণেরও বেশি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোল ও ম্যাচ—দুই তালিকাতেই তাঁর আগে রয়েছেন শুধু ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। কিন্তু মেসির পরিচয় কখনও নিছক গোলদাতা ছিল না। সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, বিপক্ষের রক্ষণকে নিজের দিকে টেনে অন্যের জন্য মাঠ খুলে দেওয়া—সব মিলিয়ে তিনি একই সঙ্গে স্রষ্টা ও সমাপ্তিকারী। তাই তাঁর কাহিনির কেবল দৃশ্যমান অংশটুকুই বলে।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে মেসির আন্তর্জাতিক অভিষেক ছিল অদ্ভুত সংক্ষিপ্ত। পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নামার এক মিনিটের মধ্যেই কনুই চালানোর অভিযোগে লাল কার্ড দেখেছিলেন ১৮ বছরের কিশোর। সেই হতাশাজনক সূচনা থেকে দেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ফুটবল-প্রতীকে উত্তরণ কোনও সরল বিজয়যাত্রা ছিল না।
ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার হয়ে যখন তিনি একের পর এক বিস্ময় সৃষ্টি করছেন, আর্জেন্টিনায় তখন তাঁর জাতীয়তাবোধ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বলা হয়েছে, মেসি বার্সেলোনার হয়ে যতটা স্বচ্ছন্দ, দেশের জার্সিতে ততটা নন; তিনি মারাদোনার মতো আবেগপ্রবণ নন; এমনকি তাঁর উচ্চারণ ও স্বভাবও নাকি যথেষ্ট ‘আর্জেন্টিনীয়’ নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্যর্থতা সেই সমালোচনাকে আরও তীব্র করেছিল।
২০১৬ সালের কোপা ফাইনালে পেনাল্টি নষ্ট করার পরে ক্লান্ত ও ভেঙে পড়া মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা করেছিলেন। দেশবাসীর অনুরোধে ফিরে আসেন। সেই প্রত্যাবর্তনই শেষ পর্যন্ত তাঁর কাহিনিকে ট্র্যাজেডি থেকে মহাকাব্যে বদলে দেয়।
পরিবর্তনের প্রথম বড় মুহূর্ত ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা। মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ২৮ বছর পরে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা জেতে। দেশের হয়ে সেটিই ছিল মেসির প্রথম বড় জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের শিরো, সেই জয় দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছিল। পরের বছর ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা এবং কাতারে বিশ্বকাপ জয় তাঁর আন্তর্জাতিক জীবনের সমস্ত অপূর্ণতা মুছে দেয়।
২০২২ বিশ্বকাপে মেসি শুধু অধিনায়ক বা গোলদাতা ছিলেন না, ছিলেন দলের মানসিক কেন্দ্র। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে পরাজয়ের পরে আর্জেন্টিনাকে ঘুরে দাঁড়াতে হয়েছিল। মেক্সিকোর বিরুদ্ধে তাঁর গোল যেন দলটির পুনর্জন্ম ঘটায়। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে উত্তপ্ত লড়াই, ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে যোস্কো গভার্দিওলকে অসহায় করে দেওয়া সেই অবিশ্বাস্য দৌড় এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনাল—প্রতিটি পর্যায়েই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দক্ষতা ও স্থৈর্যের মিশেলে।
২০২৪ সালে আরও এক বার কোপা আমেরিকা জেতার পরে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ–কোপা–কোপার এক অসাধারণ ত্রিমুকুট সম্পূর্ণ করে। শেষ পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন মেসি। স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয় অধরা থেকে গেলেও তাতে তাঁর অবস্থান সামান্যও নড়েনি। আন্তর্জাতিক জীবনে তিনি জ্যেষ্ঠ দলের হয়ে চারটি শিরোপা নিয়ে বিদায় নিলেন। , বিশ্বকাপে ৩৪ ম্যাচে তাঁর ২১ গোল; সর্বাধিক ম্যাচ, জয় এবং অধিনায়কত্ব-সহ বহু নজিরও তাঁর দখলে।
মেসির শ্রেষ্ঠত্ব ছিল সৌন্দর্য ও কার্যকারিতার বিরল মিলনে। বলটি যেন তাঁর বাঁ পায়ের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা থাকত। ছোট ছোট পদক্ষেপে দিক বদল, মুহূর্তের মধ্যে গতিবৃদ্ধি এবং সামান্য ফাঁক দিয়ে এমন পাস—যা অন্যরা দেখতে পাওয়ার আগেই তিনি দেখে ফেলতেন। তিনি উচ্চকণ্ঠ নেতা ছিলেন না; তাঁর নেতৃত্ব প্রকাশ পেত বল চাওয়ার সাহস এবং বিপদের মুহূর্তে দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যে।
মারাদোনার সঙ্গে তুলনা বহু বছর তাঁকে অনুসরণ করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেসিকে কারও ছায়ায় রেখে বিচার করার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। মারাদোনা এক প্রজন্মের বিদ্রোহ ও আবেগের প্রতীক; মেসি দীর্ঘস্থায়ী উৎকর্ষ, নীরব অধ্যবসায় এবং প্রায় অসম্ভব ধারাবাহিকতার নাম। দু’জনের স্থানই ফুটবলের নিজস্ব আকাশে স্বতন্ত্র।
মেসি চলে গেলেন এমন এক আর্জেন্টিনা রেখে, যে দলটি আর সম্পূর্ণ ভাবে তাঁর উপর নির্ভরশীল নয়—সম্ভবত এটিও তাঁর উত্তরাধিকারের অংশ। তরুণদের জন্য জায়গা করে দেওয়ার কথা জানিয়ে বিদায় নিয়েছেন তিনি। কনমেবলও তাঁকে একটি অবিস্মরণীয় যুগের নাম হিসেবে অভিহিত করেছে।
গোলের সংখ্যা এক দিন কেউ অতিক্রম করতে পারেন। ম্যাচের নজিরও ভাঙতে পারে। কিন্তু একটি দেশের সঙ্গে মেসির সম্পর্ক—প্রত্যাখ্যান থেকে গ্রহণযোগ্যতা, ব্যর্থতা থেকে মুক্তি, অশ্রু থেকে বিশ্বজয়—পুনর্নির্মাণ করা অসম্ভব। ফুটবলের সর্বকালের শ্রেষ্ঠদের আসনে তাঁর অবস্থান এখন পাথরে খোদাই করা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



